বাংলা কিউআর কি? দোকান আর মেলায় QR-এ টাকা নেওয়ার নিয়ম, চার্জসহ
বাংলা কিউআর হলো এক QR, যেটা যেকোনো ব্যাংক বা ওয়ালেটের অ্যাপ দিয়ে স্ক্যান করে টাকা দেওয়া যায়। কোথা থেকে পাবেন, কত কাটে, টাকা এল কি না দেখবেন কীভাবে আর ভুয়া QR-এর ফাঁদ থেকে বাঁচবেন কীভাবে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার ধরে।

এই লেখায় যা আছে
- বাংলা কিউআর কি, আলাদা আলাদা QR থেকে পার্থক্য কোথায়
- কারা নেবেন, আর কাদের এখনই দরকার নেই
- বাংলা কিউআর কোড কিভাবে পাবো, ব্যাংক না মোবাইল ওয়ালেট
- চার্জ কত কাটে, ১,০০০ টাকার বিক্রিতে হিসাব (উদাহরণ)
- টাকা এসেছে কি না দেখবেন যেভাবে, স্ক্রিনশটে না
- দোকানে, মেলায় আর পার্সেলের স্টিকারে QR, কোথায় কাজে লাগে
- ভুয়া QR, ক্যাশ চাওয়া আর ভুয়া SMS-এর ফাঁদ
- আজই করে ফেলুন
বাংলা কিউআর হলো একটাই QR কোড, যেটা যেকোনো ব্যাংক বা মোবাইল ওয়ালেটের অ্যাপ দিয়ে স্ক্যান করে টাকা দেওয়া যায়। আগে দোকানে bKash-এর একটা, Nagad-এর একটা, ব্যাংকের একটা QR ঝুলত। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন বলেছে সব মার্চেন্ট পয়েন্টে একটাই বাংলা কিউআর থাকবে। চার্জের কথা আগেই বলে রাখি। ২০২৬ সালের ১২ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে থাকা সার্কুলার অনুযায়ী মার্চেন্টের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ১.১৫% (ভ্যাটসহ) কাটা যায়, আর এই টাকা কাস্টমারের কাছ থেকে নেওয়া যায় না।
ধরুন শুক্রবার বিকেলে মেলার স্টলে ভিড়। একজন ক্রেতা ৮৫০ টাকার একটা পাঞ্জাবি নিয়ে বললেন, "ভাই, ক্যাশ নাই, QR দেন।" আপনার কাছে bKash-এর QR আছে, কিন্তু তাঁর ফোনে শুধু ব্যাংকের অ্যাপ। পুরনো নিয়মে এই বিক্রিটা হাতছাড়া হতো, বা আপনাকে দৌড়ে ভাংতি খুঁজতে হতো। বাংলা কিউআর ঠিক এই জায়গাটাই সারায়।
বাংলা কিউআর কি, আলাদা আলাদা QR থেকে পার্থক্য কোথায়
পুরনো নিয়মে প্রতিটা কোম্পানির QR ছিল তার নিজের। bKash-এর QR স্ক্যান করা যেত শুধু bKash অ্যাপ দিয়ে, Nagad-এর QR শুধু Nagad দিয়ে। ফলে দোকানের কাউন্টারে তিন-চারটা স্টিকার পাশাপাশি লাগানো থাকত, আর কাস্টমার খুঁজতেন কোনটা তাঁর অ্যাপে চলবে।
বাংলা কিউআর এই ঝামেলাটা কাটায়। এটা বাংলাদেশ ব্যাংকের ঠিক করা একটা জাতীয় মান, যাকে বলে ইন্টারঅপারেবল। মানে একটা QR, যেকোনো অ্যাপ। আপনার QR যে ব্যাংক বা ওয়ালেট দিয়েছে, কাস্টমার অন্য ব্যাংক বা ওয়ালেট থেকেও সেটা স্ক্যান করে টাকা পাঠাতে পারেন। টাকা যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের NPSB নামের লাইন দিয়ে।
নিয়মটা কতটা কড়া, সেটা সার্কুলারেই লেখা আছে। ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট-১ একটা সার্কুলার লেটার দেয়। সেখানে সব তফসিলি ব্যাংক, মোবাইল ওয়ালেট আর পেমেন্ট কোম্পানিকে বলা হয়েছে, ৩০ জুন ২০২৬-এর মধ্যে সব মার্চেন্ট পয়েন্টের নিজস্ব QR বদলে বাংলা কিউআর বসাতে হবে। খেয়াল করুন, কাজটা চাপানো হয়েছে ব্যাংক আর ওয়ালেটের ওপর। আপনাকে নতুন করে আবেদন করতে হবে কি না, সেটা নির্ভর করে আপনার ব্যাংক বা ওয়ালেট আপনার পুরনো QR বদলে দিয়েছে কি না, তার ওপর।

একটা জিনিস চিনে রাখুন। বাংলা কিউআর হলে স্টিকারে বা স্ট্যান্ডে Bangla QR-এর লোগো থাকে। আপনার কাছে যে QR আছে, তাতে লোগো না থাকলে নিজের ব্যাংক বা ওয়ালেটের হেল্পলাইনে জিজ্ঞেস করুন, এটা বাংলা কিউআর কি না, না হলে নতুনটা কবে পাবেন।
কারা নেবেন, আর কাদের এখনই দরকার নেই
বাংলা কিউআর আসলে সামনাসামনি টাকা নেওয়ার জিনিস। কাস্টমার আপনার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, ফোন বের করে স্ক্যান করছেন, আর আপনি নিজের ফোনে দেখছেন টাকা এল কি না। এই কাজটা যেখানে হয়, সেখানে QR দরকার।
তিন রকম সেলারের কাজে লাগে। যাঁর একটা ছোট দোকান বা শোরুম আছে, যেখানে কাস্টমার এসে কেনেন। যিনি মাঝে মাঝে মেলা, পপ-আপ স্টল বা হাটে বসেন। আর যিনি ঢাকার ভেতরে নিজের লোক দিয়ে ডেলিভারি দেন, যেখানে কাস্টমার দরজায় দাঁড়িয়ে টাকা দেন। শেষেরটায় ডেলিভারিম্যানের হাতে QR-এর একটা কার্ড থাকলে ভাংতির ঝামেলা কমে।
এবার কাদের এখনই দরকার নেই, সেটা পরিষ্কার করি। আপনার সব অর্ডার যদি Steadfast বা Pathao দিয়ে ক্যাশ অন ডেলিভারিতে যায়, তাহলে কাস্টমার টাকা দেন কুরিয়ারের রাইডারকে, আপনাকে না। অগ্রিম নিলেও সেটা আসে bKash বা Nagad-এর মার্চেন্ট নম্বরে বা পেমেন্ট লিংকে। এমন দোকানে QR ছাপিয়ে রাখার কোনো কাজ নেই। শুধু ফেসবুকে বিক্রি করেন বলে আইন আপনাকে আলাদা করে QR নিতে বলছে, এমন কিছু সার্কুলারে দেখা যায়নি। সার্কুলারগুলো মার্চেন্ট পয়েন্টের কথা বলে।
মেলার স্টলে ক্যাশ কীভাবে ধরবেন, ভাংতি কত রাখবেন আর রাতে কীভাবে হিসাব মেলাবেন, সেটা মেলার স্টলের লেখায় আলাদা করে আছে। এখানে শুধু QR-এর অংশটা।
বাংলা কিউআর কোড কিভাবে পাবো, ব্যাংক না মোবাইল ওয়ালেট
QR দেয় সেই প্রতিষ্ঠান, যেখানে আপনার টাকা জমা হবে। তাই প্রশ্নটা আসলে এই, আপনার ব্যবসার টাকা কোথায় রাখতে চান।
ছোট সেলারের জন্য সবচেয়ে সহজ রাস্তা হলো bKash বা Nagad-এর মার্চেন্ট একাউন্ট। বেশিরভাগ সেলারের এগুলোর একটা আগে থেকেই থাকে, আর কাউন্টারের জন্য QR ওরাই দেয়। ৩০ জুনের পরে ওদের দেওয়া QR-ও বাংলা কিউআর হওয়ার কথা। কোন কাগজ লাগে, ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া কী করবেন আর ক্যাশ আউটে কত কাটে, সেটা bKash মার্চেন্ট একাউন্টের লেখায় বিস্তারিত আছে, Nagad-এর জন্যও আলাদা একটা লেখা আছে। কাস্টমারদের অনেকে Rocket চালালে DBBL-এর মার্চেন্ট দিকটা কতটা খোলা, সেটা রকেট মার্চেন্ট একাউন্টের লেখায় দেখুন।
দ্বিতীয় রাস্তা নিজের ব্যাংক। যে ব্যাংকে ব্যবসার কারেন্ট একাউন্ট আছে, তার শাখায় গিয়ে মার্চেন্ট QR চাইতে পারেন। টাকা সরাসরি ব্যাংক একাউন্টে ঢুকলে মাস শেষে স্টেটমেন্টে সব একসাথে পাওয়া যায়, যা পরে লোন বা ট্যাক্সের কাগজে কাজে লাগে। তবে ব্যাংকে সাধারণত ট্রেড লাইসেন্স আর ব্যবসার নামে একাউন্ট চায়। অনলাইন ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্সের লেখায় সেটা কীভাবে করবেন, দেওয়া আছে।
কোনটা নেবেন? আমি বলব, যে জায়গায় আপনার টাকা এখনই জমা হয়, সেখান থেকেই QR নিন। নতুন একটা একাউন্ট খোলার চেয়ে পুরনোটায় QR চালু করা দ্রুত, আর এক জায়গায় টাকা থাকলে হিসাব সহজ। দুই জায়গা থেকে দুটো QR নিয়ে টেবিলে রাখার দরকার নেই, কারণ বাংলা কিউআর-এর পুরো মানেই হলো একটা QR-এ সবার টাকা।
QR হাতে পেলে প্রথম কাজ পরীক্ষা। দুটো আলাদা অ্যাপ দিয়ে স্ক্যান করুন, যেমন বন্ধুর ফোনের একটা ব্যাংকের অ্যাপ আর আরেকজনের Nagad। দুটো থেকেই ১০ টাকা করে পাঠিয়ে দেখুন আপনার একাউন্টে আসে কি না, আর স্ক্যান করার পর পেমেন্টের স্ক্রিনে আপনার দোকানের নামটা ঠিক দেখায় কি না। মেলার প্রথম দিন সকালে এই পরীক্ষা করতে গেলে দেরি হয়ে যায়, আগের দিনই সেরে রাখুন।
চার্জ কত কাটে, ১,০০০ টাকার বিক্রিতে হিসাব (উদাহরণ)
চার্জ নিয়ে খবরে অনেক রকম সংখ্যা এসেছে, তাই এখানে শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজের সার্কুলার ধরে বলছি, যা ২০২৬ সালের ১২ অক্টোবর ওদের ওয়েবসাইটে আছে।
এই চার্জের নাম MDR, মানে মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট। কাস্টমার যত টাকা দিলেন, তার একটা ভাগ কেটে বাকিটা আপনার কাছে আসে। ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এর পিএসডি সার্কুলার নং ০২/২০২৫-এ বাংলা কিউআর পেমেন্টে MDR-এর সর্বোচ্চ হার লেখা আছে ১.১৫%, ভ্যাটসহ। কাস্টমার ব্যাংক একাউন্ট বা ডেবিট কার্ড থেকে দিন, অথবা ক্রেডিট কার্ড বা মোবাইল ওয়ালেট থেকে, সীমা একই। আর সেই সার্কুলারেই লেখা, এই ফি কোনোভাবেই কাস্টমারের কাছ থেকে আদায় করা যাবে না।
তারপর দুটো বদল এসেছে। ১ জুলাই ২০২৬-এর একটা সার্কুলার লেটারে বাংলা কিউআর-এ MDR-এর সর্বনিম্ন হার ১% (ভ্যাটসহ) করা হয়। খবরে যে "১% চার্জ" দেখেছেন, সেটা এখান থেকে। কিন্তু ১০ আগস্ট ২০২৬-এর সার্কুলার লেটার নং ০৬ বলছে, ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে বাংলা কিউআর লেনদেনে ব্যাংকে-ব্যাংকে যে ফি ভাগ হতো (ইন্টারচেঞ্জ ফি) সেটা শূন্য, আর ১ জুলাইয়ের নির্দেশনা ওই দিন থেকে বাতিল। তাহলে ১২ অক্টোবরের হিসাবে দাঁড়ায় এই, ন্যূনতম ১%-এর নিয়ম আর নেই, সর্বোচ্চ ১.১৫% রয়ে গেছে। আপনার ব্যাংক বা ওয়ালেট এর মধ্যে আসলে কত নেবে, সেটা ওদের নিজের রেট।

এবার একটা উদাহরণ। বিক্রির অঙ্কগুলো আমার বানানো, শুধু হারটা সার্কুলারের সর্বোচ্চ হার।
একজন কাস্টমার ১,০০০ টাকার জিনিস কিনে QR-এ দিলেন। সর্বোচ্চ ১.১৫% কাটলে কাটে ১,০০০ × ১.১৫% = ১১.৫০ টাকা। আপনার হাতে আসে ৯৮৮.৫০ টাকা।
এবার মেলার একটা দিন। ধরুন ৪০টা বিক্রি হলো, গড়ে ৬৫০ টাকা করে, সবাই QR-এ দিলেন। মোট বিক্রি ৪০ × ৬৫০ = ২৬,০০০ টাকা। সর্বোচ্চ হারে কাটবে ২৬,০০০ × ১.১৫% = ২৯৯ টাকা। পাঁচ দিনের মেলায় একই রকম বিক্রি হলে ২৯৯ × ৫ = ১,৪৯৫ টাকা।
টাকাটা কম না, তবে ক্যাশেরও খরচ আছে। ভাংতির জন্য সকালে ব্যাংকে দৌড়ানো, জাল নোটের ভয়, সন্ধ্যার ভিড়ে ভুল ফেরত, আর রাতে ক্যাশবক্স নিয়ে বাড়ি ফেরা। তাই QR-এর খরচকে লোকসান না ধরে দামের ভেতরে ধরুন। ৬৫০ টাকার জিনিসে এক কাস্টমারের চার্জ প্রায় সাড়ে সাত টাকা, যা প্রোডাক্টের দাম ঠিক করার সময়েই মাথায় রাখা যায়।
আর একটা ভুল করবেন না। "QR-এ দিলে ১০ টাকা বেশি" এই কথা বলবেন না, টেবিলে লিখেও রাখবেন না। সার্কুলারে কাস্টমারের কাছ থেকে এই ফি নিতে মানা করা আছে, আর কাস্টমারও এটা ভালোভাবে নেন না।
টাকা এসেছে কি না দেখবেন যেভাবে, স্ক্রিনশটে না
QR-এ সবচেয়ে বেশি টাকা যায় এক জায়গায়। কাস্টমার ফোনের স্ক্রিন দেখিয়ে বলেন "দিয়ে দিয়েছি ভাই", আর আপনি ভিড়ের মধ্যে মেনে নেন। পরে দেখেন টাকা আসেনি। স্ক্রিনটা ছিল পুরনো কোনো পেমেন্টের, বা পেমেন্ট অর্ধেক পথে আটকে ছিল।
নিয়ম একটাই। টাকা এসেছে কি না দেখবেন নিজের ফোনে, কাস্টমারের ফোনে না। bKash বা Nagad-এর মার্চেন্ট অ্যাপে বা ব্যাংকের অ্যাপে নোটিফিকেশন আসবে, সাথে টাকার অঙ্ক আর কে পাঠাল তার একটা অংশ। সেটা না আসা পর্যন্ত জিনিস হাতে দেবেন না। কথাটা হাসিমুখে বলুন, "এক সেকেন্ড ভাই, আমার ফোনে আসুক।" যিনি সত্যি দিয়েছেন, তাঁর এতে খারাপ লাগে না।
এখানে একটা ভালো খবর আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর সার্কুলার নং ০৫ বলছে, ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে বাংলা কিউআর পেমেন্টের টাকা সাথে সাথে মার্চেন্টের হিসাবে দিতে হবে। মানে নিয়ম অনুযায়ী অপেক্ষা কয়েক সেকেন্ডের। তবু নেটওয়ার্ক খারাপ থাকলে নোটিফিকেশন দেরিতে আসে, মেলার মাঠে প্রায়ই এমন হয়। তখন অ্যাপের লেনদেনের লিস্টে ঢুকে দেখুন।

ভিড়ের দিনে দুজন থাকলে কাজ ভাগ করুন। একজন কাস্টমারকে জিনিস দেখাবেন, আরেকজন শুধু টাকা নেবেন আর ফোনে মিলিয়ে খাতায় লিখবেন। প্রতিটা QR পেমেন্টের পাশে অঙ্ক আর সময় লিখে রাখুন। সন্ধ্যায় অ্যাপের দিনের মোটের সাথে খাতার মোট মেলালেই বোঝা যায় কোনো পেমেন্ট বাদ পড়ল কি না।
আরেকটা কথা জানা থাকলে পরে কাজে লাগে। বাংলা কিউআর পেমেন্ট নিয়ে কাস্টমার আর দোকানের মধ্যে গোলমাল মেটানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ একটা আলাদা গাইডলাইন দিয়েছে, যা ১ ডিসেম্বর ২০২৬ থেকে চালু হবে। কাস্টমারের টাকা দুবার কেটে গেলে নিজের হাতে ক্যাশ ফেরত দেবেন না। তাঁকে তাঁর ব্যাংক বা ওয়ালেটে অভিযোগ করতে বলুন, আর আপনার অ্যাপে ফেরত দেওয়ার অপশন থাকলে সেখান থেকে দিন, যাতে দুই দিকেই রেকর্ড থাকে।
দোকানে, মেলায় আর পার্সেলের স্টিকারে QR, কোথায় কাজে লাগে
দোকান আর মেলায় QR রাখুন বড় করে, ছাপিয়ে, ল্যামিনেট করে। ফোনের স্ক্রিনে QR দেখানো সবচেয়ে দুর্বল উপায়। রোদে স্ক্রিন দেখা যায় না, ফোনের আলো কমে যায়, আর ফোনটা আপনার হাতে আটকে থাকে। কাউন্টারে একটা স্ট্যান্ড রাখুন, যাতে কাস্টমার নিজেই ঝুঁকে স্ক্যান করতে পারেন। ভাঁজ বা ভেজা দাগ পড়লে QR পড়া যায় না, তাই একটা বাড়তি কপি ব্যাগে রাখুন।
নিজের লোক দিয়ে ডেলিভারি দিলে ডেলিভারিম্যানের হাতে পকেটে রাখার মতো ছোট একটা ল্যামিনেট কার্ড দিন। কাস্টমার দরজায় "ভাংতি নাই" বললে কার্ডটা বের করলেই হয়। তবে তিনি টাকা দিলেন কি না, সেটা দোকানের ফোনে দেখে ডেলিভারিম্যানকে ফোন করে জানাতে হবে। নইলে একই স্ক্রিনশটের খেলা দরজায় হবে।
পার্সেলের স্টিকারে বা ফেসবুক পোস্টে পেমেন্টের QR দেওয়ার কথা অনেকে ভাবেন। এখানে সাবধান হওয়ার কারণ আছে। কুরিয়ারে যাওয়া পার্সেলের টাকা কাস্টমার দেন রাইডারকে, তাই স্টিকারের QR-এ কেউ টাকা পাঠালে সেটা হয় দ্বিগুণ পেমেন্ট, পরে ফেরত দেওয়ার ঝামেলা। আর অনলাইনের অগ্রিম নেওয়ার জন্য পেমেন্ট লিংক ভালো, কারণ লিংকে অর্ডার নম্বর আর অঙ্ক বাঁধা থাকে। QR-এ কাস্টমার নিজে অঙ্ক লেখেন, ভুলও করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৭ সেপ্টেম্বরের সার্কুলারে আছে, ৩১ অক্টোবর ২০২৬-এর মধ্যে অ্যাপগুলোতে QR-এর ছবি আপলোড করেও পেমেন্ট করা যাবে। তাতে ইনবক্সে QR-এর ছবি পাঠিয়ে টাকা নেওয়া সহজ হবে, কিন্তু অঙ্ক মেলানোর কাজটা তখনো আপনার।
বাংলা কিউআর আপনার ব্যাংক বা ওয়ালেটের জিনিস, দোকানের কোনো সফটওয়্যারের না। WinningSeller-ও বাংলা কিউআর দেয় না। তবে মেলা বা দোকানে বিক্রি হলে "নতুন অর্ডার" দিয়ে অর্ডারটা হাতে লিখে রাখা যায়, তাতে কাস্টমারের নাম আর নম্বর আপনার কাস্টমার লিস্টে থেকে যায়, পরে আবার বিক্রির কাজে লাগে। আর হিসাব-নিকাশের "আয়-খরচ" ট্যাবে "দোকানের বাইরের বিক্রি" খাতে দিনের মোট লিখে রাখা যায়। দোকানের বাকি কাজগুলো WinningSeller-এর ফিচারের পেজে সাজানো আছে।
ভুয়া QR, ক্যাশ চাওয়া আর ভুয়া SMS-এর ফাঁদ
কাউন্টারে QR নিয়ে সবচেয়ে পরিচিত চালাকি হলো স্টিকারের ওপর স্টিকার। কেউ চুপচাপ আপনার QR-এর ওপর নিজের একটা QR লাগিয়ে চলে যায়। দেখতে একই রকম, কিন্তু টাকা যায় তার একাউন্টে। কাস্টমার ভাবেন দিয়ে দিয়েছেন, আর আপনি দেখেন আপনার ফোনে কিছু আসেনি। তখন দুজনেই সত্যি বলছেন, শুধু টাকাটা নেই।
এর থেকে বাঁচার উপায় দুটো। QR রাখুন এমন জায়গায় যেখানে আপনার চোখ পড়ে, দোকানের বাইরের দেয়ালে না। প্রতিদিন দোকান খোলার সময় একবার আঙুল বুলিয়ে দেখুন, ওপরে আরেকটা স্টিকার উঠে আছে কি না। আর কাস্টমারকে স্ক্যান করার পর একটা জিনিস দেখতে বলুন। স্ক্যান করলে পেমেন্টের স্ক্রিনে মার্চেন্টের নাম দেখায়। মুখে দোকানের নামটা বলুন, "ভাই, স্ক্যান করলে 'রাকিব ফ্যাশন' দেখাবে, মিলিয়ে নিয়েন।" নাম না মিললে টাকা দেওয়ার আগেই ধরা পড়ে।

আরেকটা নিয়ম জেনে রাখুন, কারণ এটা না জেনে অনেকে নিজের ক্ষতি করেন। কেউ বলেন, "ভাই, QR-এ ৫,০০০ পাঠাই, আমাকে ক্যাশ দেন।" ১ এপ্রিল ২০২৬-এর সার্কুলারে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, মার্চেন্ট পয়েন্টে বাংলা কিউআর দিয়ে পেমেন্ট ছাড়া কোনো ক্যাশ আউট দেখা গেলে সেই মার্চেন্টের বাংলা কিউআর বাতিল করতে হবে। মানে বন্ধুত্ব করে কাউকে নগদ দিলে আপনার QR-টাই চলে যেতে পারে। বিনয়ের সাথে না বলুন।
ভুয়া পেমেন্টের মেসেজও আসে। কেউ একটা সাধারণ নম্বর থেকে SMS পাঠায়, দেখতে ব্যাংক বা ওয়ালেটের মেসেজের মতো, "আপনার একাউন্টে ২,৫০০ টাকা জমা হয়েছে।" তারপর ফোন করে বলে ভুলে বেশি গেছে, ফেরত দিন। এমন SMS দেখে কখনো টাকা ফেরত দেবেন না। টাকা এসেছে কি না দেখবেন শুধু অ্যাপের ভেতরে, লগইন করে। অ্যাপে না দেখালে টাকা আসেনি।
আজই করে ফেলুন
এক ঘণ্টার মধ্যে এই কাজগুলো সেরে ফেলা যায়।
- আপনার কাছে যে মার্চেন্ট QR আছে, তাতে Bangla QR লোগো আছে কি না দেখুন। না থাকলে নিজের ব্যাংক বা ওয়ালেটের হেল্পলাইনে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করুন।
- ব্যাংক বা ওয়ালেটের কাছ থেকে লিখিত নিন, আপনার একাউন্টে QR পেমেন্টে কত শতাংশ কাটবে আর ক্যাশ আউট বা ব্যাংকে নিতে কত।
- দুটো আলাদা অ্যাপ থেকে ১০ টাকা করে পাঠিয়ে দেখুন QR কাজ করে কি না, আর স্ক্রিনে দোকানের নাম ঠিক দেখায় কি না।
- QR বড় করে প্রিন্ট করে ল্যামিনেট করুন, একটা বাড়তি কপি বানিয়ে ব্যাগে রাখুন।
- টাকা নেওয়ার খাতায় একটা কলাম যোগ করুন, "QR-এ এসেছে", আর সন্ধ্যায় অ্যাপের দিনের মোটের সাথে মেলান।
- যিনি টাকা নেবেন, তাঁকে তিনটা কথা শিখিয়ে দিন, নিজের ফোনে না আসা পর্যন্ত প্যাকেট না, QR-এ টাকা নিয়ে ক্যাশ ফেরত না, আর QR-এর জন্য বাড়তি টাকা না।
সাধারণ প্রশ্ন
বাংলা কিউআর কি?
বাংলা কিউআর হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের ঠিক করা একটা জাতীয় QR কোড। দোকানে একটা QR রাখলেই bKash, Nagad, Rocket বা যেকোনো ব্যাংকের অ্যাপ দিয়ে কাস্টমার স্ক্যান করে টাকা দিতে পারেন। আলাদা আলাদা কোম্পানির আলাদা QR আর রাখতে হয় না।
বাংলা কিউআর চার্জ কত?
বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এর সার্কুলারে বাংলা কিউআর পেমেন্টে মার্চেন্টের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ১.১৫% (ভ্যাটসহ) কাটার সীমা দেওয়া আছে। ১ জুলাই ২০২৬-এ ন্যূনতম ১% করা হয়েছিল, কিন্তু ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে সেই নির্দেশনা বাতিল। আপনার ব্যাংক বা ওয়ালেট এই সীমার মধ্যে আসলে কত নেয়, সেটা ওদের কাছ থেকে লিখিত নিয়ে নিন।
বাংলা কিউআর কোড কিভাবে পাবো?
যে ব্যাংকে আপনার একাউন্ট আছে, বা যে ওয়ালেটে মার্চেন্ট একাউন্ট আছে, তারাই QR দেয়। bKash বা Nagad-এর মার্চেন্ট একাউন্ট থাকলে ওদের দেওয়া QR-ই এখন বাংলা কিউআর হওয়ার কথা, কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক ৩০ জুন ২০২৬-এর মধ্যে সব মার্চেন্ট পয়েন্টের পুরনো QR বদলাতে বলেছে। QR-এর ওপরে বা পাশে Bangla QR লোগো আছে কি না দেখে নিন।
কাস্টমারের কাছ থেকে QR-এর চার্জ নেওয়া যায়?
না। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের সার্কুলারে লেখা আছে, এই ফি কোনোভাবেই কাস্টমারের কাছ থেকে নেওয়া যাবে না। খরচটা আপনার, তাই দাম ঠিক করার সময় সেটা মাথায় রাখুন, QR-এ দিলে বাড়তি টাকা চাইবেন না।
শুধু ফেসবুকে বিক্রি করলে কি বাংলা কিউআর লাগবে?
সার্কুলারগুলো দোকান আর মার্চেন্ট পয়েন্টের কথা বলে, আর কাজটা চাপানো হয়েছে ব্যাংক আর ওয়ালেটের ওপর। পুরো কুরিয়ারে ক্যাশ অন ডেলিভারিতে বেচলে আপনার হাতে QR-এ টাকা আসেই না। মেলা, শোরুম বা নিজে হাতে ডেলিভারি দিলে তখন একটা QR রাখা কাজে লাগে।
QR স্ক্যান করে টাকা দিলে কত সময়ে আমার একাউন্টে আসে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর সার্কুলার বলছে, ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে বাংলা কিউআর পেমেন্টের টাকা সাথে সাথে মার্চেন্টের হিসাবে দিতে হবে। তবু নিজের অ্যাপে নোটিফিকেশন না আসা পর্যন্ত কাস্টমারকে ছাড়বেন না।
আরও পড়ুন
উপায় মার্চেন্ট একাউন্ট লাগবে কি? খোলার নিয়ম, চার্জ আর পেমেন্ট নেওয়া
কয়েকজন কাস্টমার উপায়ে টাকা দিতে চান। উপায় মার্চেন্ট একাউন্ট খোলার নিয়ম কী, upaybd.com-এ কী লেখা আছে আর কী নেই, কোন কাগজ সাথে রাখবেন, চার্জ আর লিমিটের হিসাব, আর কখন চতুর্থ ওয়ালেট না খুলে একটা পেমেন্ট লিংক পাঠানোই ভালো।
রকেট মার্চেন্ট একাউন্ট কীভাবে খুলবেন? কাগজ, চার্জ আর কখন লাগে
কিছু কাস্টমার bKash না, Rocket-এ টাকা দিতে চান। রকেট মার্চেন্ট একাউন্ট কী, Dutch-Bangla Bank নিজে কী লিখেছে আর কী লেখেনি, শাখায় কী কাগজ আর কোন প্রশ্নগুলো নিয়ে যাবেন, ১২ অঙ্কের নম্বরের ফাঁদ আর মাসের খরচের হিসাব।
কোন প্রোডাক্টে লাভ, কোনটায় লস? প্রোডাক্টভিত্তিক লাভের হিসাব বের করুন
মাস শেষে মোট লাভ আছে, কিন্তু কোন প্রোডাক্ট টানছে আর কোনটা চুপচাপ লস দিচ্ছে, বোঝেন না? প্রোডাক্ট ধরে কোন সংখ্যা লিখবেন, কুরিয়ার, অ্যাড আর রিটার্নের খরচ কীভাবে ভাগ করবেন, তিন প্রোডাক্টের এক মাসের হিসাব আর লসের প্রোডাক্ট নিয়ে কী করবেন।


