অনলাইন ব্যবসায়ীর আয়কর রিটার্ন, ই-রিটার্নে ব্যবসার আয় দেখাবেন যেভাবে
ফেসবুকে বা ওয়েবসাইটে ব্যবসা করেন, TIN আছে, রিটার্ন দিতে হবে কি? NBR-এর ২০২৬-২৭ সালের নির্দেশিকা আর ই-রিটার্নের FAQ ধরে কারা দেবেন, কবে দিলে কী হয়, ব্যবসার আয় কোন ঘরে যায়, কোন কাগজ রাখবেন আর কখন আয়কর আইনজীবীর কাছে যাবেন।

এই লেখায় যা আছে
অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিলের নিয়ম ফেসবুক বা ওয়েবসাইটের সেলারের জন্যও দোকানদারের মতোই। বছরে আয় করমুক্ত সীমার বেশি হলে রিটার্ন দিতে হয়, আর ২০২৬-২৭ করবর্ষ থেকে স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতাদের প্রায় সবাইকে সেটা অনলাইনে, etaxnbr.gov.bd-র ই-রিটার্নে দিতে হবে। ব্যবসার লাভ সেখানে যায় "ব্যবসা বা পেশা হতে আয়" ঘরে। এখানের প্রতিটা নিয়ম ১২ অক্টোবর ২০২৬-এ NBR-এর নিজের ওয়েবসাইটে থাকা নির্দেশিকা, প্রেস রিলিজ আর FAQ থেকে নেওয়া। শুরুতেই একটা কথা। এটা নিয়ম বোঝার গাইড, আপনার কত কর হবে সেই হিসাব না। নিজের রিটার্নের শেষ কথা একজন আয়কর আইনজীবী বা কর পরামর্শক বলবেন।
ধরুন বছরের মাঝামাঝি ব্যাংকে লোনের কথা বলতে গেলেন। ম্যানেজার জিজ্ঞেস করলেন, "রিটার্ন দেন?" আপনার TIN আছে, কিন্তু রিটার্ন কখনো দেননি, ভেবেছেন ফেসবুকের ব্যবসায় এসব লাগে না। এই মুহূর্তটা অনেক সেলারের জীবনে আসে, কখনো লোনের টেবিলে, কখনো ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের লাইনে।
অনলাইন ব্যবসা করলে কি রিটার্ন দিতেই হবে
NBR-এর "আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২৭" দুই রকম মানুষের কথা বলে। যাঁদের করযোগ্য আয় আছে, আর যাঁদের কিছু কাজের জন্য আবশ্যিকভাবে রিটার্ন দিতে হয়।
প্রথম দলের সীমা নির্দেশিকায় এভাবে লেখা। সাধারণ স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতার আয় বছরে ৪,০০,০০০ টাকার বেশি হলে। নারী এবং ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী করদাতার ৪,৫০,০০০ টাকার বেশি হলে। তৃতীয় লিঙ্গের আর প্রতিবন্ধী করদাতার ৫,২৫,০০০ টাকার বেশি হলে। আর গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই যোদ্ধার ৫,৫০,০০০ টাকার বেশি হলে। খেয়াল করুন, এখানে "আয়" মানে বিক্রি না, লাভ, সাথে অন্য সব আয় মিলিয়ে। বছরে ২০ লাখ টাকার অর্ডার নিলেও লাভ ৪ লাখের নিচে হতে পারে।
দ্বিতীয় দলের লিস্ট লম্বা, ৪৬টা কাজ। সেলারের কাজে লাগে এমন কয়েকটা হলো, আগের তিন বছরের কোনো বছরে কর নির্ধারণ হয়ে থাকলে বা আয় করযোগ্য হয়ে থাকলে, সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভা এলাকায় ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করতে, করযোগ্য আয় না থাকলেও ২০ লাখ টাকার বেশি ঋণ নিতে, কোনো কোম্পানির এজেন্সি বা ডিস্ট্রিবিউটরশিপ নিতে বা রাখতে, আর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ই-কমার্স ব্যবসার লাইসেন্স নবায়ন করতে। মানে লাভ কম হলেও শহরে ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করতে গেলে রিটার্নের প্রমাণ লাগবে। ট্রেড লাইসেন্স কোথা থেকে, কত টাকায় আর কোন কাগজে করবেন, সেটা অনলাইন ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্সের লেখায় আছে।

TIN থাকলেই কি রিটার্ন দিতে হবে? নির্দেশিকার লিস্টে "TIN আছে" আলাদা কোনো কারণ হিসেবে লেখা নেই। কিন্তু TIN নিয়েছেন কোনো একটা কাজের জন্য, আর সেই কাজটা প্রায়ই ওই লিস্টের একটা। তাই TIN থাকলে রিটার্ন লাগবে ধরে নিয়েই কাগজ গোছান, আর আপনার বেলায় সত্যিই লাগবে কি না, সেটা একজন আয়কর আইনজীবীর কাছে জেনে নিন। TIN নেই এখনো? NBR-এর ই-টিআইএন ওয়েবসাইটে (secure.incometax.gov.bd) NID দিয়ে নেওয়া যায়, আর ই-রিটার্নে রেজিস্ট্রেশনের জন্য প্রথমেই TIN লাগে।
ভ্যাট আর আয়কর এক জিনিস না, এটা অনেকে গুলিয়ে ফেলেন। ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন, টার্নওভার কর আর BIN নিয়ে কথা ভ্যাট রেজিস্ট্রেশনের লেখায় আছে। এই লেখা শুধু আপনার নিজের আয়করের রিটার্ন নিয়ে, যেখানে ব্যবসার লাভ আপনার আয় হিসেবে যায়।
অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিলের নিয়ম, রেজিস্ট্রেশন থেকে জমা
২০২৬ সালের ২২ জুলাই NBR এক প্রেস রিলিজে জানায়, ২০২৬-২০২৭ করবর্ষের ই-রিটার্ন চালু হয়েছে, আর এক বিশেষ আদেশে সব স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতার জন্য অনলাইনে রিটার্ন দেওয়া বাধ্যতামূলক। কাগজে দিতে পারবেন শুধু ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী, সনদসহ প্রতিবন্ধী, বিদেশে থাকা বাংলাদেশি, মৃত করদাতার প্রতিনিধি আর বাংলাদেশে কাজ করা বিদেশিরা। বাকিরা রেজিস্ট্রেশনে আটকে গেলে অতিরিক্ত বা যুগ্ম কর কমিশনারের অনুমতি নিয়ে কাগজে দিতে পারেন। NBR-এর ২০২৬ সালের ই-রিটার্ন FAQ ধরে ধাপগুলো এমন।
প্রথমে মোবাইল নম্বর মিলিয়ে নিন। রেজিস্ট্রেশনে এমন একটা নম্বর লাগে, যার সিম আপনার নিজের NID দিয়ে বায়োমেট্রিক করে নেওয়া। ফোনে *16001# ডায়াল করে NID-র শেষ ৪ অঙ্ক দিলে মোবাইল কোম্পানি জানিয়ে দেয় আপনার NID-তে কয়টা নম্বর আছে। TIN খোলার সময়ের পুরনো নম্বর না থাকলেও সমস্যা নেই, FAQ বলছে নিজের নামের যেকোনো নম্বর দিয়ে চলবে।
তারপর রেজিস্ট্রেশন। etaxnbr.gov.bd-তে "I am not registered yet" চাপুন, TIN আর মোবাইল নম্বর দিয়ে "Verify" চাপুন। ফোনে ৬ অঙ্কের OTP আসবে, সেটা দিয়ে পাসওয়ার্ড বসান, তারপর "Register"। পাসওয়ার্ড অন্তত ৮ অক্ষরের, তাতে বড় হাতের আর ছোট হাতের ইংরেজি অক্ষর, একটা সংখ্যা আর একটা চিহ্ন (যেমন @ বা #) লাগবে। এরপর থেকে লগইন হয় TIN আর পাসওয়ার্ড দিয়ে।
কাজটা কম্পিউটারে করুন। FAQ নিজেই বলছে, অনেক ফিচার মোবাইলে পাওয়া যায় না, তাই ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ। লগইনের পর বাঁ দিকে তিনটা মেনু, Home, Submission আর Tax record। Submission থেকে Regular e-Return খুললে সাতটা ধাপ আসে, Assessment, Income, Rebate, Expenditure, Asset & liabilities, Tax & payment আর Return view। মাঝপথে সেভ করে রেখে পরে আবার শুরু করা যায়, তাই এক বসায় শেষ করতে হবে না।
জমা দিলে সাথে সাথে প্রমাণ। সাবমিট করলে Acknowledgement slip (প্রাপ্তিস্বীকারপত্র) আর ট্যাক্স সার্টিফিকেট তখনই তৈরি হয়, Tax record মেনু থেকে যেকোনো সময় প্রিন্ট করা যায়। কর দিতে হলে Tax & payment থেকেই ব্যাংক, কার্ড, bKash, Rocket বা Nagad দিয়ে দেওয়া যায়। কোথাও আটকালে NBR-এর কল সেন্টার ০৯৬৪৩ ৭১৭১৭১, ছুটির দিন বাদে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা।
ব্যবসার আয় কোথায় লিখবেন, লাভ বের করবেন কীভাবে (উদাহরণ)
ই-রিটার্নের প্রথম ধাপ Assessment-এ আয়ের খাতগুলো থেকে নিজেরটা টিক দিতে হয়, যেমন চাকরি, ভাড়া, কৃষি, ব্যবসা বা পেশা, মূলধনী লাভ। ফেসবুক বা ওয়েবসাইটের ব্যবসা নিজের নামে চালালে "ব্যবসা বা পেশা হতে আয়" টিক দিন। নিয়মিত আয়ের জন্য FAQ যে ঘরের কথা বলে, সেটা Regular Business Income। আর Asset & liabilities ধাপে "ব্যবসার মূলধন" নামে আলাদা ঘর আছে, যেখানে ব্যবসায় খাটানো টাকা দেখাতে হয়।
ব্যবসার আয় মানে বিক্রির টাকা না, লাভ। আর লাভ গুনতে হয় সেই অর্ডার থেকে, যেগুলো সত্যি ডেলিভারি হয়ে টাকা এসেছে। নেওয়া অর্ডার, ফেরত আসা পার্সেল বা কুরিয়ারে আটকে থাকা টাকা আয় না। এই নিয়মে মাসে মাসে খাতা কীভাবে রাখবেন, সেটা অনলাইন ব্যবসার হিসাব রাখার লেখায় কলাম ধরে দেওয়া আছে। এখানে বছরের হিসাবটা দেখাই।

একটা উদাহরণ ধরি। সংখ্যাগুলো বোঝানোর জন্য বানানো, কোনো দোকানের খাতা থেকে না। আয়বর্ষ ধরা হয় ১ জুলাই থেকে পরের বছরের ৩০ জুন, তাই ২০২৬-২৭ করবর্ষের রিটার্নে যায় ১ জুলাই ২০২৫ থেকে ৩০ জুন ২০২৬-এর আয়।
এই বারো মাসে ডেলিভারি হওয়া অর্ডারের বিক্রি ১৮,০০,০০০ টাকা। সেই প্রোডাক্টগুলোর কেনা দাম ১০,৮০,০০০ টাকা। কুরিয়ারের ডেলিভারি চার্জ আর COD চার্জ ১,৫০,০০০ টাকা। ফেসবুক অ্যাডে গেছে ২,০০০ ডলার, ১ ডলার = ১২২ টাকা ধরে ২,৪৪,০০০ টাকা। প্যাকেজিং আর ছোটখাটো খরচ ৬০,০০০ টাকা। ফেরত আসা পার্সেলের চার্জ ৪০,০০০ টাকা।
লাভ = ১৮,০০,০০০ − ১০,৮০,০০০ − ১,৫০,০০০ − ২,৪৪,০০০ − ৬০,০০০ − ৪০,০০০ = ২,২৬,০০০ টাকা।
এই দোকানের মালিকের অন্য আয় না থাকলে তাঁর মোট আয় ৪,০০,০০০ টাকার সীমার নিচে। তবু তিনি যদি সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভায় ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করেন, নির্দেশিকার লিস্ট অনুযায়ী রিটার্নের প্রমাণ লাগবে, আর সেই রিটার্নে আয়ের ঘরে আসবে তাঁর আসল লাভ, শূন্য না। কর কত হবে বা হবে কি না, কোন খরচ বাদ দেওয়া যাবে আর কোনটা যাবে না (যেমন ডলার কার্ডে দেওয়া অ্যাডের খরচ কোন কাগজে প্রমাণ করবেন), সেটা এই লেখার বাইরে। আইনজীবী এখানেই সবচেয়ে বেশি কাজে আসেন।
WinningSeller-এ এই কাজের একটা সুবিধা আছে। হিসাব-নিকাশের "সারাংশ" ট্যাবে লাভ গোনা হয় শুধু ডেলিভারড অর্ডার থেকে, আর "কোন সময়ের হিসাব"-এ "তারিখ বাছুন" দিয়ে ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত পুরো আয়বর্ষ বেছে নেওয়া যায়। তবে সীমাটাও জেনে রাখুন। WinningSeller রিটার্ন জমা দেয় না, আর হিসাবের এই রিপোর্ট এখনো অ্যাকাউন্ট্যান্টের জন্য CSV বা Excel-এ নামানো যায় না, শুধু অর্ডারের লিস্টের CSV নামানো যায়। সংখ্যাগুলো স্ক্রিন থেকে দেখে লিখতে হবে। হিসাব-নিকাশের বাকি অংশ কী কী করে, সেটা WinningSeller-এর ফিচারের পেজে দেখতে পারেন।
কোন কাগজ আর হিসাব রেখে দেবেন
ই-রিটার্নে এ বছর কোনো কাগজ আপলোড করতে হয় না, NBR-এর FAQ এটা পরিষ্কার বলেছে। কিন্তু এর মানে কাগজ লাগবে না, তা না। রিটার্নে যা লিখছেন, পরে কেউ জিজ্ঞেস করলে তার প্রমাণ আপনাকেই দেখাতে হবে। NBR ২৮ এপ্রিল ২০২৬-এর একটা প্রেস রিলিজে ৭২,৩৪১টা রিটার্ন ঝুঁকি দেখে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অডিটে বাছাইয়ের কথা জানিয়েছে, তাই "কেউ তো দেখবে না" ভাবার দিন শেষ।
অনলাইন সেলারের জন্য যে কাগজগুলো আসল, সেগুলো বারো মাসের, আয়বর্ষ ধরে। কুরিয়ারের প্রতিটা পেমেন্ট ইনভয়েস বা স্টেটমেন্ট, যেখানে কত তুলেছে আর কত দিয়েছে লেখা। ব্যাংকের স্টেটমেন্ট। bKash, Nagad বা অন্য ওয়ালেটের মার্চেন্ট স্টেটমেন্ট। পাইকারের মেমো বা পারচেজের রসিদ। অ্যাডের বিল আর ডলার কেনার রসিদ। দোকান বা গুদামের ভাড়ার রসিদ। আর ডেলিভারড অর্ডারের একটা লিস্ট।

কাজটা সহজ রাখার নিয়ম একটা। প্রতি মাসের রসিদ সেই মাসেই একটা খামে বা ফোল্ডারে রাখুন, খামের ওপরে মাসের নাম। ফোনের ছবি হলে একটা ফোল্ডারে মাসের নামে সাবফোল্ডার। বছর শেষে বারোটা খাম মানে বারোটা জায়গা, একটা বস্তা না। WinningSeller-এর হিসাব-নিকাশে "আয়-খরচ" ট্যাবে প্রতিটা খরচ লেখার সময় রসিদ বা মেমোর ছবিও রেখে দেওয়া যায়, তাতে কাগজ হারালেও ছবিটা থাকে।
সবচেয়ে বড় ঝামেলা হয় যখন ব্যবসার টাকা আর সংসারের টাকা একই bKash বা একই ব্যাংক একাউন্টে চলে। তখন স্টেটমেন্টের প্রতিটা লাইন দেখে বলতে হয় কোনটা কাস্টমারের টাকা আর কোনটা ভাইয়ের পাঠানো। এর সমাধান ব্যবসার জন্য আলাদা একাউন্ট, যেটা কীভাবে খুলবেন তা ব্যবসার কারেন্ট একাউন্টের লেখায় আছে। এ বছর না পারলেও আগামী জুলাই থেকে আলাদা করুন, পরের রিটার্ন অর্ধেক সময়ে হবে।
"জিরো রিটার্ন" কেন ঝুঁকির
ফেসবুকে প্রায়ই পোস্ট ঘোরে, "সব ঘরে শূন্য লিখে পাঁচ মিনিটে রিটার্ন দিন।" NBR ১০ আগস্ট ২০২৫-এ একটা প্রেস রিলিজে এ নিয়ে পরিষ্কার করে বলেছে। আয়কর আইন, ২০২৩-এ "জিরো রিটার্ন" নামে কোনো রিটার্নের বিধান নেই। আসল আয়, খরচ, সম্পদ আর দায় না দেখিয়ে কোনো একটা বা সবগুলো ঘর শূন্য দেখানো বেআইনি, আর এটা ফৌজদারি অপরাধ। মিথ্যা তথ্যের জন্য আইনের ৩১২ ও ৩১৩ ধারায় ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান আছে।
একই প্রেস রিলিজে আরেকটা কথাও আছে, যেটা অনেকের ভয় কমাবে। আয় যদি আইন অনুযায়ী করযোগ্য না হয়, তাহলে কোনো কর দিতে হবে না। মানে রিটার্ন দেওয়া মানেই কর দেওয়া না। ওপরের উদাহরণের দোকানদারের মতো যাঁর লাভ সীমার নিচে, তিনি আসল আয় দেখিয়ে রিটার্ন দেবেন, আর কর শূন্য আসতে পারে। শূন্য লেখা আর শূন্য কর আসা, দুটো আলাদা জিনিস।
সেলারের জন্য জিরো রিটার্ন আরও বেশি ঝুঁকির একটা কারণে। আপনার টাকা চলাচল কাগজে থাকে, কুরিয়ারের পেমেন্ট, ওয়ালেটের স্টেটমেন্ট, ব্যাংকের লেনদেন। কেউ মেলাতে বসলে বছরে কয়েক লাখ টাকা ঢুকেছে, অথচ রিটার্নে আয় শূন্য, এই গরমিল চোখে পড়তে সময় লাগে না।
দেরি করলে বা না দিলে কী হয়
অনেকের মাথায় রিটার্নের শেষ দিন মানে ৩০ নভেম্বর। ২০২৬-২৭ করবর্ষে নিয়মটা বদলেছে, আর এটা NBR-এর নির্দেশিকা আর FAQ দুটোতেই লেখা। স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতা আয়বর্ষ শেষের পরের পুরো করবর্ষ জুড়ে, মানে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত রিটার্ন দিতে পারবেন, কিন্তু কখন দিচ্ছেন তার ওপর কর কমে বা বাড়ে।
১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দিলে দেয় করের ৫% বা ২৫,০০০ টাকা, যেটা কম, প্রণোদনা। এই সময় পার হয়ে গেছে। ১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দিলে কোনো প্রণোদনা নেই, বাড়তি করও নেই। ১২ অক্টোবর ২০২৬-এ এই সময়টাই চলছে। ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ দিলে দেয় করের ২% বা ৩,০০০ টাকা, যেটা বেশি, বাড়তি কর। আর ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন দিলে দেয় করের ৫% বা ৫,০০০ টাকা, যেটা বেশি। মানে ডিসেম্বরের পর থেকে দেরির দাম আছে।
যেদিনই দিন, জমা দেওয়ার পরের কাজটা সেদিনই সারুন। Acknowledgement slip আর ট্যাক্স সার্টিফিকেট PDF করে নামিয়ে ফোনে আর ইমেইলে রাখুন। ব্যাংক, ট্রেড লাইসেন্স অফিস বা কেউ রিটার্নের প্রমাণ চাইলে এটাই দেখাতে হয়। কেউ আপনার রিটার্ন যাচাই করতে চাইলে etaxnbr.gov.bd-র "Return Verify/PSR" অংশ থেকে করতে পারেন।

শেষ সপ্তাহের জন্য অপেক্ষা না করার আরেকটা কারণ আছে, যেটা নিয়মে লেখা নেই কিন্তু শেষ দিকে প্রায়ই হয়। শেষ দিকে পোর্টালে চাপ বাড়ে, OTP দেরিতে আসে, পেজ আটকে যায়। ব্যবসার খাতা মেলাতে এমনিতেই দু-তিন দিন লাগে। তাই ডিসেম্বরের প্রথম দুই সপ্তাহের মধ্যে দেওয়ার লক্ষ্য রাখুন, যাতে কিছু আটকালে হাতে সময় থাকে।
কখন আয়কর আইনজীবীর কাছে যাবেন
নিজে রিটার্ন দেওয়া যায়, ই-রিটার্নের সফটওয়্যার ধাপে ধাপে দেখিয়ে দেয়। আমি বলব, প্রথম বছরটা একজন আয়কর আইনজীবী বা কর পরামর্শকের সাথে বসে দিন, পরের বছর থেকে নিজে। প্রথমবার কোন খরচ বাদ যায়, ব্যবসার মূলধন কত দেখাবেন আর আগের বছরের সম্পদের হিসাব কীভাবে মেলাবেন, এগুলো একবার শিখে নিলে পরে সহজ হয়।
কিছু অবস্থায় নিজে দেওয়ার চেষ্টাই করবেন না, সরাসরি পেশাদারের কাছে যান। আগের কয়েক বছর রিটার্ন দেননি অথচ আয় ছিল। কর অফিস থেকে নোটিশ এসেছে। ব্যবসা অংশীদারিত্বে চলে, বা কোম্পানি করেছেন। বছরে বিক্রি অনেক বেশি, বা আমদানি করেন। বড় সম্পদ কিনেছেন, যেমন জমি বা গাড়ি। আর ব্যবসার টাকা আর পরিবারের টাকা এতটা মিশে আছে যে কোনটা কী, নিজেই বুঝতে পারছেন না।
শেষে আবার বলি, এই লেখা NBR-এর নিজের নির্দেশিকা, প্রেস রিলিজ আর FAQ পড়ে বানানো, ২০২৬ সালের ১২ অক্টোবরের অবস্থায়। এটা কর পরামর্শ না। আপনার কত কর হবে, কোন খরচ বাদ যাবে আর কোন ধারা আপনার বেলায় খাটবে, তার শেষ কথা একজন আয়কর আইনজীবীর। নিয়ম প্রতি বাজেটে বদলায়, তাই পরের বছর আবার NBR-এর নতুন নির্দেশিকা দেখে নেবেন।
আজই করে ফেলুন
- ফোনে *16001# ডায়াল করে NID-র শেষ ৪ অঙ্ক দিন, দেখুন আপনার নামে কোন মোবাইল নম্বর আছে। রেজিস্ট্রেশনে সেটাই লাগবে।
- TIN সার্টিফিকেট খুঁজে বের করুন। না থাকলে NBR-এর ই-টিআইএন ওয়েবসাইটে NID দিয়ে TIN নেওয়ার কাজটা আজই সেরে রাখুন।
- একটা ফাইল বা ফোল্ডার খুলুন "রিটার্ন ২০২৬-২৭", আর তাতে ১ জুলাই ২০২৫ থেকে ৩০ জুন ২০২৬-এর কুরিয়ার, ব্যাংক আর ওয়ালেটের স্টেটমেন্ট নামানো শুরু করুন।
- ওই বারো মাসের ডেলিভারড বিক্রি, প্রোডাক্টের কেনা দাম, কুরিয়ার, অ্যাড, প্যাকেজিং আর রিটার্নের চার্জ, এই ছয়টা সংখ্যা একটা কাগজে লিখে লাভটা মোটামুটি বের করুন।
- etaxnbr.gov.bd-তে রেজিস্ট্রেশন করে একবার লগইন করে দেখুন, ডিসেম্বরের আগে যাতে পাসওয়ার্ড বা OTP-র ঝামেলা মিটে যায়।
- একজন আয়কর আইনজীবীর সাথে কথা বলার একটা দিন ঠিক করুন, নভেম্বরের মধ্যে, আর ওপরের ছয়টা সংখ্যা সাথে নিয়ে যান।
সাধারণ প্রশ্ন
অনলাইন ব্যবসা করলে কি আয়কর রিটার্ন দিতে হয়?
আয় করমুক্ত সীমার বেশি হলে দিতে হয়, ব্যবসা অনলাইনে হোক বা দোকানে। NBR-এর ২০২৬-২৭ সালের আয়কর নির্দেশিকায় সাধারণ করদাতার সীমা বছরে ৪,০০,০০০ টাকা লেখা। আয় কম হলেও কিছু কাজে রিটার্ন লাগে, যেমন সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভায় ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন। নিজের বেলায় কী খাটে, সেটা একজন আয়কর আইনজীবী ঠিক করে বলবেন।
২০২৬-২৭ করবর্ষে রিটার্ন জমার শেষ তারিখ কবে?
NBR-এর ২০২৬-২৭ সালের নির্দেশিকা আর ই-রিটার্নের FAQ অনুযায়ী স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতা ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত রিটার্ন দিতে পারবেন, তবে সময় ধরে লাভ-ক্ষতি আছে। ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দিলে প্রণোদনা ছিল, ১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কোনো প্রণোদনা বা বাড়তি কর নেই, জানুয়ারি থেকে বাড়তি কর লাগবে।
ই-রিটার্নে রেজিস্ট্রেশন করতে কী লাগে?
NBR-এর ই-রিটার্ন FAQ অনুযায়ী লাগে একটা TIN আর এমন একটা মোবাইল নম্বর, যেটার সিম আপনার নিজের NID দিয়ে বায়োমেট্রিক করে রেজিস্টার্ড। নম্বরটা আপনার নামে কি না দেখতে *16001# ডায়াল করে NID-র শেষ ৪ অঙ্ক দিন। তারপর etaxnbr.gov.bd-তে রেজিস্ট্রেশন করুন।
জিরো রিটার্ন দিলে কি সমস্যা?
NBR ১০ আগস্ট ২০২৫-এর এক প্রেস রিলিজে বলেছে, আয়কর আইন, ২০২৩-এ "জিরো রিটার্ন" নামে কিছু নেই। আসল আয়, খরচ, সম্পদ আর দায় না দেখিয়ে সব ঘরে শূন্য লেখা বেআইনি, আর মিথ্যা তথ্যের জন্য আইনের ৩১২ ও ৩১৩ ধারায় ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান আছে। আয় করযোগ্য না হলে কর দিতে হয় না, কিন্তু তথ্য সত্যি দিতে হয়।
রিটার্ন দেওয়ার সময় কাগজ আপলোড করতে হয়?
NBR-এর ২০২৬ সালের ই-রিটার্ন FAQ বলছে, এ বছর অনলাইনে রিটার্ন দিতে কোনো কাগজ আপলোড করতে হয় না। তবে দরকারি কাগজ হাতের কাছে রেখে প্রতিটা ঘর ঠিকঠাক পূরণ করতে বলা হয়েছে। কাগজগুলো নিজের কাছে রেখে দিন, পরে প্রশ্ন এলে লাগবে।
রিটার্নে ভুল হলে ঠিক করা যায়?
যায়। NBR-এর ই-রিটার্ন FAQ অনুযায়ী জমা দেওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে অনলাইনে সংশোধিত রিটার্ন দেওয়া যায়, তবে মাত্র একবার। তাই প্রথমবারেই হিসাবগুলো মিলিয়ে নিয়ে জমা দিন।
আরও পড়ুন
উপায় মার্চেন্ট একাউন্ট লাগবে কি? খোলার নিয়ম, চার্জ আর পেমেন্ট নেওয়া
কয়েকজন কাস্টমার উপায়ে টাকা দিতে চান। উপায় মার্চেন্ট একাউন্ট খোলার নিয়ম কী, upaybd.com-এ কী লেখা আছে আর কী নেই, কোন কাগজ সাথে রাখবেন, চার্জ আর লিমিটের হিসাব, আর কখন চতুর্থ ওয়ালেট না খুলে একটা পেমেন্ট লিংক পাঠানোই ভালো।
রকেট মার্চেন্ট একাউন্ট কীভাবে খুলবেন? কাগজ, চার্জ আর কখন লাগে
কিছু কাস্টমার bKash না, Rocket-এ টাকা দিতে চান। রকেট মার্চেন্ট একাউন্ট কী, Dutch-Bangla Bank নিজে কী লিখেছে আর কী লেখেনি, শাখায় কী কাগজ আর কোন প্রশ্নগুলো নিয়ে যাবেন, ১২ অঙ্কের নম্বরের ফাঁদ আর মাসের খরচের হিসাব।
কোন প্রোডাক্টে লাভ, কোনটায় লস? প্রোডাক্টভিত্তিক লাভের হিসাব বের করুন
মাস শেষে মোট লাভ আছে, কিন্তু কোন প্রোডাক্ট টানছে আর কোনটা চুপচাপ লস দিচ্ছে, বোঝেন না? প্রোডাক্ট ধরে কোন সংখ্যা লিখবেন, কুরিয়ার, অ্যাড আর রিটার্নের খরচ কীভাবে ভাগ করবেন, তিন প্রোডাক্টের এক মাসের হিসাব আর লসের প্রোডাক্ট নিয়ে কী করবেন।


