সরিষার তেলের ব্যবসা: এক লিটারে লোকসান কেন, আর লাভ আসে কোথা থেকে
সরিষার তেলের ব্যবসায় এক লিটারের বোতলে কেন লোকসান হয় আর লাভটা আসলে কোথা থেকে আসে, টাকায় হিসাব করে দেখিয়েছি। সাথে ঘানির তেল কার কাছ থেকে কিনবেন, ভেজাল ধরতে ল্যাবে কোন টেস্ট করাবেন, BSTI-র নিয়ম আর ৫ লিটারের জার লিক ছাড়া পাঠানোর উপায়।

এই লেখায় যা আছে
সরিষার তেলের ব্যবসা অনলাইনে ভালো চলতে পারে, কারণ তেল প্রতি মাসেই ফুরায়, আর যে পরিবার একবার ভালো ঘানির তেল পায় সে সাধারণত একই জায়গা থেকে আবার নিতে চায়। তবে লাভটা প্রথম অর্ডারে আসে না। তেলের পার্সেল ভারী, প্রতিটা নতুন অর্ডারের পেছনে অ্যাডের টাকা যায়, আর একটা লিক করা পার্সেল পুরো লাভ খেয়ে ফেলে। যাঁরা এই ব্যবসায় টিকে যান, তাঁরা তেলটা কোথা থেকে আসছে নিজের চোখে দেখেন আর ল্যাবের রিপোর্ট হাতে রাখেন। পাঠানোর আগে বোতল লিক করে কি না নিজে পরীক্ষা করেন। আর কাস্টমারের তেল ফুরানোর আগেই একটা ফোন দেন।
ধরুন শুক্রবার সকালে চা হাতে ফোনটা খুললেন। সিলেট থেকে এক কাস্টমারের মেসেজ, সাথে একটা ছবি। কার্টনের এক কোনা ভিজে কালো হয়ে আছে, বোতলের গায়ে তেল লেপ্টে আছে। নিচে লেখা, "ভাই, অর্ধেক তেল তো রাস্তাতেই পড়ে গেছে।" চা-টা তখনও শেষ হয়নি, আরেকজন লিখলেন, "আগেরবারের মতো ঝাঁঝ নাই কেন, কিছু মিশাইলেন নাকি?" প্রথম মেসেজে গেল একটা পার্সেলের টাকা। দ্বিতীয়টায় গেল এমন একজনের বিশ্বাস, যিনি তিন মাস ধরে আপনার কাছ থেকেই তেল নিচ্ছিলেন। এই দুটো ভয় থেকে কীভাবে বাঁচবেন, তেল কেনা থেকে রিফিলের ফোন পর্যন্ত, নিচে একটা একটা করে বলছি।
সরিষার তেলের ব্যবসা কেমন, লাভ কোথায়?
অনলাইনে সরিষার তেলের কাস্টমার বেশিরভাগ সময় শহরের কোনো পরিবার। ভর্তা, মাছ বা আচারের জন্য তাঁরা গ্রামের ঘানির তেলের সেই চেনা গন্ধটা খোঁজেন, কিন্তু পাড়ার দোকানের খোলা তেলে ভরসা পান না। এই ভরসার জায়গাটাই আপনার ব্যবসা। আপনি যদি দেখাতে পারেন তেলটা কোন ঘানিতে, কোন সরিষা থেকে ভাঙানো, তাহলে কাস্টমার সুপারশপের বোতলের চেয়ে একটু বেশি দাম দিতেও রাজি হন।
ফেসবুক গ্রুপে প্রায়ই দেখবেন কেউ জিজ্ঞেস করছেন, "ভাই, সরিষার তেলের ব্যবসায় লাভ কেমন?" সত্যি উত্তরটা একটু অস্বস্তির। প্রথম অর্ডারে লাভ প্রায় থাকে না। একজন নতুন কাস্টমার আনতে ফেসবুকে ডলার স্পেন্ড করতে হয়, আর সেই টাকা একটা ১ লিটারের বোতলের অর্ডারে উঠে আসা কঠিন। নিচে দামের অংশে টাকায় দেখাচ্ছি। কিন্তু সেই কাস্টমার যখন তিন সপ্তাহ পরে আবার তেল চান, তখন অ্যাডের এক টাকাও লাগে না। তেল এমন জিনিস যেটা মানুষ শখে কেনে না, দরকারে কেনে। তাই প্রথম অর্ডারকে লাভের জায়গা না ভেবে একজন কাস্টমার পাওয়ার খরচ ভাবুন, আর আসল লাভ খুঁজুন দ্বিতীয় অর্ডার থেকে।
একটা সত্যি কথা শুরুতেই বলে রাখি। বড় কোম্পানির বোতলের সাথে দামে পাল্লা দিতে চাইলে এই ব্যবসা আপনার জন্য না। তারা হাজার হাজার লিটার একসাথে বানায়, তাদের লিটারপ্রতি খরচ আপনার চেয়ে অনেক কম। আপনার জোর হলো তেলের উৎস, তার স্বাদ, আর কাস্টমারের সাথে আপনার সম্পর্ক। আর সরিষার দাম মৌসুম ভেদে ওঠানামা করে, তাই সারা বছর একই দামে বেচবেন, এমন কথা কাস্টমারকে দেবেন না।
ঘানি ভাঙা তেল কোথা থেকে কিনবেন, নিজে ঘানি বসাবেন কি?
তেল জোগাড় করার রাস্তা মোটামুটি তিনটা। সহজটা হলো নিজের এলাকার বা যেখানে সরিষা বেশি হয় সেখানকার কোনো ঘানি বা ছোট তেলের মিল থেকে বানানো তেল কিনে আনা। একটু বেশি খাটুনির রাস্তা হলো হাট থেকে নিজে সরিষা কিনে সেই ঘানিতে ভাঙিয়ে নেওয়া। আর সবচেয়ে বড় ঝুঁকির রাস্তা নিজে ঘানি বসানো। নতুন হলে মাঝেরটাই ধরুন। সরিষাটা কোথাকার আর কেমন, সেটা আপনি নিজের চোখে দেখে কিনছেন, তাই কাস্টমার "খাঁটি তো?" জিজ্ঞেস করলে আপনার কাছে বলার মতো একটা সত্যি গল্প থাকে।
একটা জিনিস পরিষ্কার রাখুন। গরু দিয়ে টানা বা মোটরে ঘোরানো কাঠের ঘানি আর লোহার এক্সপেলার মেশিন এক জিনিস না। কাস্টমার "ঘানি ভাঙা" খোঁজেন, তাই অনেকে মেশিনের তেলকেও কাঠের ঘানির তেল বলে বেচেন। এটা করবেন না। যেটায় ভাঙানো, সেটার নামই লিখুন। একদিন কেউ ভিডিও চাইলে মিথ্যাটা ধরা পড়বে, আর তখন আপনার সত্যি কথাগুলোও কেউ আর বিশ্বাস করবে না।
ঘানিওয়ালার কাছে গিয়ে শুধু লিটারের দাম জিজ্ঞেস করে চলে আসবেন না। পাশে বসে চা খেতে খেতে এই কথাগুলো জিজ্ঞেস করুন, আর উত্তর শুনে ঠিক করুন তাঁর সাথে কাজ করবেন কি না।
- "সরিষাটা কোন হাট থেকে কেনেন, কোন জাতের?" যিনি নিজে সরিষা কেনেন, তিনি হাট আর জাতের নাম সাথে সাথে বলে দেবেন। উত্তর ঘোলাটে হলে বুঝবেন তেলটা অন্য কোথাও থেকে আসছে।
- "ভাঙানোর আগে সরিষা ঝেড়ে রোদে শুকান তো?" ময়লা আর ভেজা সরিষার তেলে তলানি বেশি জমে। পরে বোতলের তলায় সেটা দেখে কাস্টমার ভয় পেয়ে যান।
- "ভাঙানোর পরে তেল কয় দিন থিতাতে দেন, ছাঁকেন কীভাবে?" সদ্য ভাঙানো তেল ঘোলা থাকে। ঘোলা তেল বোতলে ভরলে কয়েক দিনেই নিচে কাদার মতো জমে যায়।
- "আমার সরিষা আমার সামনে ভাঙাবেন?" যিনি রাজি হন না, তাঁর ঘানিতে আপনার তেলের সাথে অন্য তেল মিশল কি না, আপনি কোনোদিন জানবেন না।
- "এই ব্যাচ থেকে আগে একটু নমুনা দেবেন?" নমুনাটা ল্যাবে দিন। রিপোর্ট ভালো এলে তবেই পুরো ব্যাচ নিন।

নিজে ঘানি বসানোর কথা ভাবছেন? আগে অন্যের ঘানিতে ভাঙিয়ে ছয় মাস বেচে দেখুন মাসে আসলে কত লিটার যায়। মেশিন কিনলে টাকাটা আটকে যায়। তার ওপর জায়গা লাগে, বিদ্যুৎ বা গরু লাগে, আর রোজ একজন মানুষকে ঘানির পাশে থাকতে হয়। মাসে অল্প কয়েক মণ সরিষা ভাঙালে নিজের ঘানি সাধারণত পোষায় না। আর কতটা সরিষায় কতটা তেল আসবে, সেটা জাত ভেদে অনেক আলাদা। ২৪ এপ্রিল ২০২৪-এ সমকালের খবরে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা বলেছেন, তাঁদের নতুন জাত বাউ সরিষা-৯-এর বীজে তেল প্রায় ৪২.৫ শতাংশ, আড়াই কেজিতে এক লিটার তেল পাওয়া সম্ভব, আর দেশে চলা সাধারণ জাতে তেল এর চেয়ে কম। তাই নিজের হিসাব করার আগে যে সরিষা কিনবেন, সেটা কয়েকবার ভাঙিয়ে নিজে মেপে নিন।
খাঁটি তেল আর ভেজাল চেনার সত্যি উপায়
ইউটিউবে সরিষার তেল চেনার অনেক কায়দা দেখবেন। কেউ বলেন ঝাঁঝ শুঁকে দেখুন, কেউ হাতে ঘষে রং দেখতে বলেন, কেউ বলেন ফ্রিজে রাখলে খাঁটি তেল জমে যায়। শুনতে ভালো লাগে, কিন্তু এর কোনোটাই খাঁটি তেলের প্রমাণ না। সরিষার তেলে অল্প করে অন্য তেল মেশালে রং আর গন্ধ প্রায় একই থাকে, নাক দিয়ে সেটা ধরা যায় না। আবার ঝাঁঝ কম-বেশি হওয়ার অনেক সাধারণ কারণ আছে। সরিষার জাত আলাদা হতে পারে, তেলটা কত দিন আগে ভাঙানো সেটা একটা ব্যাপার, ভাঙানোর আগে সরিষা কতটা শুকানো ছিল সেটাও। তাই ঝাঁঝ কম মানেই ভেজাল না, আবার কড়া ঝাঁঝ মানেই খাঁটি না।
ভেজালের ভয়টা অবশ্য বানানো না। ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ বাংলা ট্রিবিউনের খবরে খাদ্যমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ১,২১০টা খাবারের নমুনা পরীক্ষা করেছে। তার মধ্যে ৫৪টা ভোজ্যতেলের নমুনায় ট্রান্সফ্যাট, আয়োডিন ভ্যালু আর স্যাপোনিফিকেশন ভ্যালু মাপা হয়েছে। মানে সরকার নিজেও তেল পরীক্ষা করে ল্যাবের এই মাপ দিয়ে, নাক দিয়ে না।
এই মাপগুলো আসলে কী বলে, সহজ করে বলি। প্রতিটা তেলের আয়োডিন ভ্যালু আর স্যাপোনিফিকেশন ভ্যালুর নিজের একটা সীমা আছে, অনেকটা আঙুলের ছাপের মতো। আন্তর্জাতিক খাদ্যমানের সংস্থা Codex-এর ভোজ্যতেলের স্ট্যান্ডার্ডে (CXS 210-1999) সরিষার তেলের আয়োডিন ভ্যালু লেখা ৯২ থেকে ১২৫, আর পাম তেলের মাত্র ৫০ থেকে ৫৫। স্যাপোনিফিকেশন ভ্যালুতে ছবিটা উল্টো, সরিষার তেলে ১৬৮ থেকে ১৮৪, পাম তেলে ১৯০ থেকে ২০৯। তাই সরিষার তেলে পাম তেল মেশালে প্রথম সংখ্যাটা নেমে যায়, দ্বিতীয়টা উঠে যায়। চোখে যেটা দেখা যায় না, ল্যাবের কাগজে সেটা ধরা পড়ে।
আরেকটা মাপ আছে, ইরুসিক অ্যাসিড। একই স্ট্যান্ডার্ডে সরিষার তেলে এটা ২২ থেকে ৫০ শতাংশ, অথচ সয়াবিন তেলে ০.৩ শতাংশের বেশি না, আর পাম তেলে মাপার মতো থাকেই না। অন্য তেল মেশালে এই সংখ্যাটাও কমে যায়। এটা মাপাতে খরচ বেশি, তাই প্রতিটা ব্যাচে না করালেও চলে।
টেস্ট করাবেন কোথায়? সরকারি প্রতিষ্ঠান BCSIR-এর Institute of Food Science and Technology (IFST)-এর ফির লিস্টে তেলের জন্য আয়োডিন ভ্যালু ২,০০০ টাকা, স্যাপোনিফিকেশন ভ্যালু ১,৩০০ টাকা আর ইরুসিক অ্যাসিড ৬,৫০০ টাকা লেখা আছে, ভ্যাট ছাড়া। রিপোর্ট আসতে লেখা ৭ থেকে ১০ কর্মদিবস। লিস্টের ফাইলটা পুরনো হতে পারে, তাই নমুনা নিয়ে যাওয়ার আগে ফোন করে রেটটা মিলিয়ে নিন।
প্রতিটা ব্যাচে প্রথম দুটো টেস্ট করান, ভ্যাট বাদে ৩,৩০০ টাকা। ইরুসিক অ্যাসিড করান মাঝে মাঝে, ধরুন নতুন ঘানিওয়ালার সাথে কাজ শুরুর সময় বা নতুন সরিষার মৌসুমে একবার। প্রথমবার শুনলে টাকাটা বেশি মনে হয়, বুকের ভেতর একটু খচখচও করে। কিন্তু ১৫০ লিটারের একটা ব্যাচে ভাগ করলে লিটারে পড়ে ২২ টাকা। এই ২২ টাকাই কাস্টমারের "মিশাইলেন নাকি?" প্রশ্নের সামনে আপনাকে শান্ত রাখে। মধুর ব্যবসাতেও ঠিক এভাবেই ল্যাবের রিপোর্ট দিয়ে ভরসা বানাতে হয়, সেটা মধুর ব্যবসার লেখায় বিস্তারিত আছে।

রিপোর্ট হাতে এলে নমুনার নম্বর আর বোতলের লেবেলের ব্যাচ নম্বর মিলিয়ে রাখুন। পেজে রিপোর্টের ছবি দিন, আর "ল্যাব টেস্টেড" কথাটা শুধু সেই ব্যাচের বোতলে লিখুন, যার নমুনা সত্যিই টেস্ট হয়েছে। কেউ ঝাঁঝ নিয়ে প্রশ্ন তুললে তর্কে যাবেন না। ওই ব্যাচের রিপোর্টটা পাঠান, তারপর ঝাঁঝ কেন একটু কম-বেশি হতে পারে, সেটা শান্তভাবে বুঝিয়ে বলুন।
লাইসেন্স, BSTI আর লেবেলে কী লাগবে?
কাগজের পুরো ধাপ, ফি আর কোন অফিসে যাবেন, সেটা অনলাইনে খাবার বেচার লাইসেন্সের লেখায় আছে। এখানে শুধু তেলের বেলায় যা আলাদা, সেটুকু বলছি।
সবার আগে জেনে রাখুন, সরিষার তেল BSTI-র বাধ্যতামূলক লিস্টে আছে। BSTI-র ওয়েবসাইটের ৩১৫টা জিনিসের লিস্টে কৃষি আর খাবারের ভাগে ২ নম্বরেই Mustard Oil লেখা। তার মানে খোলা তেল কিনে নিজের ব্র্যান্ডের লেবেল লাগালে আপনিই প্যাকেটকারী, আর তখন BSTI-র CM লাইসেন্স আপনার নামে লাগবে। যে কোম্পানির নিজের CM আছে, তাদের সিল করা বোতল তাদের নামে বেচলে দায়টা তাদের। শুরুতে নিজের ব্র্যান্ড না করে এভাবে কয়েক মাস বাজার বোঝা যায়, শুধু লাভ কম থাকে।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নতুন নিয়মেও তেল একটু কড়া দলে পড়তে পারে। জুলাই ২০২৬-এর খবর অনুযায়ী বেশিরভাগ ছোট খাবারের ব্যবসার রেজিস্ট্রেশনই যথেষ্ট, কিন্তু ভোজ্যতেল সেই কয়েকটা জিনিসের মধ্যে, যেগুলোতে লাইসেন্স লাগবে বলে বলা হয়েছে। তাই জেলার নিরাপদ খাদ্য অফিসে ফোন করে সোজা জিজ্ঞেস করুন, "আমি ঘানির সরিষার তেল বোতলে ভরে অনলাইনে বেচি, আমার রেজিস্ট্রেশন লাগবে নাকি লাইসেন্স?" উত্তরটা তারিখ আর অফিসারের নামসহ লিখে রাখুন।

লেবেলে কী কী থাকতেই হবে, তার পুরো লিস্ট ওই লেখাতেই আছে। তেলের বোতলে সবচেয়ে বেশি ভুল হয় পরিমাণ লেখায়। Codex-এর ওই স্ট্যান্ডার্ডে সরিষার তেলের আপেক্ষিক ঘনত্ব ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ০.৯১০ থেকে ০.৯২১, মানে এক লিটার তেলের ওজন মোটামুটি ৯১০ থেকে ৯২১ গ্রাম। তাই এক লিটারের বোতলে "১ কেজি" লিখলে আপনি আসলে কাস্টমারকে কম দিচ্ছেন। যেভাবে মাপছেন, সেভাবেই লিখুন। ব্যাচ নম্বরটাও দিন। এক দিনে যত সরিষা একসাথে ভাঙালেন, সেটা একটা ব্যাচ, তারিখ দিয়ে তার নম্বর দিন, যাতে কেউ অভিযোগ করলে ঠিক কোন দিনের তেল সেটা বের করতে পারেন। আর লেবেলে বা পোস্টে "অর্গানিক", "কোলেস্টেরল কমায়" বা "চুল পড়া বন্ধ করে" ধরনের কথা লিখবেন না। প্রমাণ ছাড়া এমন দাবি আইনেও আটকায়, ফেসবুকের অ্যাডেও।
বোতল না জার, লিক ছাড়া কুরিয়ারে পাঠাবেন যেভাবে
সবার আগে কড়া সত্যিটা জেনে রাখুন। ২০২৬ সালের অক্টোবরে Steadfast-এর টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনসে লেখা আছে, মধু, তেল আর কোমল পানীয়ের মতো তরল জিনিস নষ্ট হলে তারা টাকা দেয় না। ঠিকমতো প্যাক না করলে ক্ষতির দায়ও তাদের না। মানে বোতল চুইয়ে তেল পড়লে তেলের টাকাও যায়, কুরিয়ার চার্জও যায়। আর যেটা সবচেয়ে বেশি গায়ে লাগে, সেই কাস্টমার পরের বার আর আপনার কাছে আসেন না।
তেল মধুর চেয়ে পাতলা, ঢাকনার সামান্য ফাঁক পেলেই বের হয়ে আসে। এজন্য কাচের বোতল দিয়ে শুরু করবেন না। কাচ ভারী, তাতে কুরিয়ার চার্জ বাড়ে, আর ভাঙলে বাকি পার্সেলও নষ্ট করে। মোটা ফুড-গ্রেড প্লাস্টিকের বোতল আর জার হালকা, ভাঙে না। এক লিটার পর্যন্ত বোতল নিন, আর দুই থেকে পাঁচ লিটারে হাতলওয়ালা জার।
প্যাকিংয়ের সাধারণ নিয়ম, মানে মুখে সিল, আলাদা পলি আর ফাঁক ভরা শক্ত কার্টন, সেটা কুরিয়ারের প্যাকেজিংয়ের লেখায় ধাপে ধাপে আছে। তেলে সেই নিয়মের সাথে আরেকটু যত্ন লাগে। ঢাকনার নিচে এমন একটা ভেতরের সিল দিন, যেটা না ছিঁড়ে খোলা যায় না, আর ঢাকনার জোড়ায় দুই পাক টেপ পেঁচিয়ে দিন। বোতল কানায় কানায় ভরবেন না। মুখের নিচে একটু জায়গা রাখুন, কারণ গরমে তেল একটু ফোলে, আর রাস্তার ঝাঁকুনিতে সেই চাপটা গিয়ে পড়ে ঢাকনায়। বোতল আলাদা পলিতে ভরে মুখ বেঁধে দিলে চুইয়ে পড়লেও তেলটা পলির ভেতরেই থাকে, কার্টন ভেজে না। শেষে কার্টনে বোতলটা খাড়া করে বসিয়ে চারপাশ কাগজে এমনভাবে ভরুন, যাতে ভেতরে কিছু না নড়ে।

ওজনের হিসাবটাও মাথায় রাখুন। পাঁচ লিটার তেলের ওজনই প্রায় সাড়ে চার কেজি, জার আর কার্টন মিলে পার্সেল দাঁড়ায় পাঁচ কেজির কাছাকাছি। ২০২৬ সালের অক্টোবরে Steadfast-এর রেট ক্যালকুলেটরে ঢাকা থেকে অন্য জেলায় ১ কেজি পর্যন্ত ১৩৫ টাকা, আর তারপর প্রতি কেজিতে ২০ টাকা যোগ হয়। তাহলে পাঁচ কেজির পার্সেলে পড়ে ১৩৫ + ৪ × ২০ = ২১৫ টাকা। শুনতে বেশি লাগে, কিন্তু লিটারে ভাগ করলে ৪৩ টাকা, যেখানে এক লিটারের একটা বোতল একা পাঠালেও কমপক্ষে ১৩৫ টাকা লাগে। কোন কুরিয়ার ভারী পার্সেলে কত নেয়, পাঠানোর আগে নিজের ওজন আর জেলা বসিয়ে ক্যালকুলেটরে একবার মিলিয়ে নিন।
এক লিটারের দাম কত রাখবেন (উদাহরণ)
নিচের সব সংখ্যা একটা উদাহরণ, কোনো দোকানের আসল হিসাব না। ল্যাবের খরচটা ওপরের BCSIR-এর ফি থেকে ১৫০ লিটারের ব্যাচে ভাগ করা, বাকিগুলো আন্দাজ। নিজের কেনা দাম আর খরচ বসিয়ে একবার মিলিয়ে নিন। ধরুন ঘানিওয়ালার কাছ থেকে লিটার ৩২০ টাকায় তেল কিনছেন, ডেলিভারি চার্জ কাস্টমার দেন, আর একটা ডেলিভারি হওয়া অর্ডার আনতে অ্যাডে যায় ১২০ টাকা। এবার দেখুন এক লিটারের বোতল আর পাঁচ লিটারের জারে কী হয়।
| খরচের খাত | ১ লিটারের বোতল, ৪৫০ টাকায় | ৫ লিটারের জার, ২,১৫০ টাকায় |
|---|---|---|
| তেল | ৩২০ | ১,৬০০ |
| বোতল বা জার, সিল, লেবেল | ২৫ | ৬০ |
| প্যাকিং (পলি, টেপ, কার্টন) | ২০ | ৩০ |
| ল্যাব টেস্ট (লিটারে ২২) | ২২ | ১১০ |
| COD চার্জ (ধরুন ১%) | ৫ | ২২ |
| ফেরত আর লিকের লোকসান, ভাগ করে | ২৫ | ৪০ |
| অ্যাড, প্রতি ডেলিভারি হওয়া অর্ডারে | ১২০ | ১২০ |
| মোট খরচ | ৫৩৭ | ১,৯৮২ |
| হাতে থাকে | ৮৭ টাকা লোকসান | ১৬৮ টাকা লাভ |
একই তেল, একই অ্যাড। তবু এক লিটারের অর্ডারে আপনি পকেট থেকে ৮৭ টাকা দিচ্ছেন, আর পাঁচ লিটারে ১৬৮ টাকা থাকছে। কারণ অ্যাডের ১২০ টাকা অর্ডারপ্রতি একবারই যায়। সেটা এক লিটারে বসলে ভারী লাগে, পাঁচ লিটারে ভাগ হয়ে হালকা হয়ে যায়। এজন্য অ্যাডে বড় জারটাকেই সামনে রাখুন। এক লিটার রাখুন তাঁদের জন্য, যাঁরা প্রথমবার স্বাদটা দেখতে চান, তবে সেটাকে আসল বিক্রি ধরে হিসাব করবেন না।

এখানে আরেকটা জিনিস দেখুন। পুরনো কাস্টমার ফোনে আবার পাঁচ লিটার নিলে অ্যাডের ১২০ টাকা লাগে না, তখন একই জারে লাভ দাঁড়ায় ২৮৮ টাকা। দাম কমিয়ে পাল্লা দিলে কী হয়, সেটাও হিসাব করে দেখুন। পাশের পেজ ২,০০০ টাকায় বেচছে দেখে আপনিও ১৫০ টাকা কমালেন। তখন নতুন কাস্টমারের একটা জারে হাতে থাকে মাত্র ২০ টাকার মতো। এত কষ্টের প্যাকিং আর ফোনের পরে ২০ টাকা, এটা ব্যবসা না।
মাসের শেষে আসল প্রশ্নটা হলো, কোন সাইজে সত্যিই টাকা থাকছে। এটা দেখতে হলে গুনতে হবে শুধু ডেলিভারি হওয়া অর্ডার, সাথে ফেরত পার্সেলের দুই দিকের কুরিয়ার চার্জ আর অ্যাডের খরচ। খাতায় এটা করা যায়, কিন্তু ভারী পার্সেলের ফেরত আর লিকের টাকা খাতা থেকে প্রায়ই বাদ পড়ে যায়। WinningSeller-এর লাভ-ক্ষতির হিসাব ডেলিভারি হওয়া অর্ডার থেকেই চলে। প্রতিটা পার্সেলের চার্জ, COD চার্জ আর ফেরত পার্সেলের দুই দিকের খরচ নিজে থেকে বসে যায়। অ্যাডের খরচ ক্যাম্পেইনের নাম দিয়ে লিখে রাখলে, আর অ্যাডের লিংকে সেই নাম থাকলে, কোন অ্যাড থেকে কত টাকার ডেলিভারি এলো সেটাও দেখা যায়।
কাস্টমার আবার কবে কিনবেন, কখন ফোন দেবেন?
তেলের রিপিট সেল নির্ভর করে একটা প্রশ্নের ওপর, কাস্টমারের বাসায় তেল কত দিনে ফুরায়। এটা নিজে আন্দাজ করবেন না, জিজ্ঞেস করুন। ডেলিভারির পাঁচ-সাত দিন পরে খোঁজ নেওয়ার ফোনে তেলটা কেমন লাগল জানুন, তারপর বলুন, "ভাই, পাঁচ লিটার তেল আপনাদের বাসায় সাধারণত কয় দিন যায়?" চারজনের পরিবার আর মেসে থাকা দুজন ছাত্রের তেল এক গতিতে ফুরায় না। তিনি যদি বলেন দেড় মাস, তাহলে ডেলিভারির প্রায় পাঁচ সপ্তাহ পরের তারিখে রিফিলের ফোনটা লিখে রাখুন, মানে তেল শেষ হওয়ার এক সপ্তাহ আগে।
এই এক সপ্তাহ আগের হিসাবটা কেন, একটু ভাবুন। তেল শেষ হয়ে গেলে কেউ অনলাইনে অর্ডার দিয়ে দুই-তিন দিন বসে থাকেন না, রান্না তো থামবে না। তিনি পাড়ার দোকান থেকে একটা বোতল কিনে আনেন। আর একবার দোকানের অভ্যাসে ফিরে গেলে আপনাকে আবার অ্যাডে টাকা দিয়ে তাঁকে ফেরাতে হয়। ঠিক সময়ের একটা ফোন এই পুরো ঘুরপথটা বাঁচায়।

রিফিলের ফোনে বেশি কিছু বলার দরকার নেই। "ভাই, হিসাব করে দেখলাম আপনার তেল শেষের দিকে, আগের মতো পাঁচ লিটার পাঠিয়ে দিই?" এই এক লাইনই অনেক সময় যথেষ্ট। আরেকটা ভালো সময় হলো নতুন সরিষা ওঠার মৌসুম। "এবারের নতুন সরিষার তেল ভাঙানো হয়েছে, রিপোর্টও হাতে চলে এসেছে" একটা সত্যিকারের খবর, তাই এমন ফোনে কেউ বিরক্ত হন না। কাকে আগে ফোন দেবেন, পুরো কল স্ক্রিপ্ট আর কেউ "ভেবে দেখি" বললে কী বলবেন, সেটা পুরনো কাস্টমারকে আবার বিক্রি করার লেখায় আছে, এখানে আর লিখছি না।
পঞ্চাশজন কাস্টমার পর্যন্ত একটা খাতা বা শিটেই চলে। দুশো হয়ে গেলে কার তেল কবে ফুরাবে, মাথায় রাখা কঠিন। WinningSeller-এর ফলোআপ কল সিস্টেমে পার্সেল ডেলিভারি হলে কাস্টমার নিজে থেকেই কলের লিস্টে চলে আসেন। ডেলিভারির কয় দিন পরে আসবেন, সেটা পুরো দোকানের জন্য একটা সংখ্যা, শুরুতে ৭ দিন দেওয়া থাকে। ফোনে কাস্টমার যদি বলেন "মাসের শেষে ফোন দিয়েন", তাহলে "পরে ফোন দিতে বলেছেন" চেপে ৬০ দিনের মধ্যে যেকোনো তারিখ আর সময় বসিয়ে রাখা যায়, আর ঠিক সেই সময়ে তিনি আবার লিস্টের ওপরে চলে আসেন। ফোন থেকে কত টাকার বিক্রি এলো, সেটা গোনা হয় শুধু ডেলিভারি হওয়া অর্ডার ধরে।
আজ থেকে শুরু করতে চাইলে প্রথম কাজটা ছোট। আপনার এলাকার দুই-তিনটা ঘানিতে একদিন ঘুরে আসুন, ওপরের প্রশ্নগুলো করুন, আর যাঁর উত্তর সবচেয়ে পরিষ্কার, তাঁর কাছ থেকে একটা নমুনা নিয়ে ল্যাবে দিন। রিপোর্ট আসতে আসতে বোতল, সিল আর কার্টন জোগাড় করুন, আর নিজেই একটা পাঁচ লিটারের জার প্যাক করে কাছের কোনো আত্মীয়ের বাসায় কুরিয়ারে পাঠিয়ে দেখুন। যেদিন সেই জার এক ফোঁটা লিক ছাড়া পৌঁছাবে, আর পাঁচ সপ্তাহ পরে প্রথম কাস্টমার নিজে থেকে বলবেন "ভাই, আরেকটা জার পাঠান", সেদিন বুঝবেন ব্যবসাটা দাঁড়িয়ে গেছে।
সাধারণ প্রশ্ন
সরিষার তেলের ব্যবসায় লাভ কেমন?
প্রথম অর্ডারে লাভ সাধারণত কম, কারণ পার্সেল ভারী আর প্রতিটা নতুন অর্ডারের পেছনে অ্যাডের টাকা যায়। আমাদের উদাহরণের হিসাবে ১ লিটারের একটা বোতল একা বেচলে উল্টো লোকসান হয়, আর ৫ লিটারের জারে কিছু লাভ থাকে। আসল লাভ আসে একই কাস্টমারের দ্বিতীয়, তৃতীয় অর্ডার থেকে, যেখানে অ্যাডের খরচ লাগে না।
ঘানি ভাঙা সরিষার তেল পাইকারি কোথায় পাওয়া যায়?
সবচেয়ে ভালো হলো নিজের এলাকার বা যে এলাকায় সরিষা বেশি হয় সেখানকার কোনো ঘানি বা ছোট তেলের মিল, যেখানে নিজে গিয়ে ভাঙানো দেখতে পারবেন। অনেকে নিজে সরিষা কিনে ঘানিতে ভাঙিয়ে নেন, তাতে সরিষাটা কোথাকার সেটা নিজেই জানেন। যার উৎস আপনি দেখতে পারবেন না, এমন পাইকারের ড্রামের তেল দিয়ে শুরু করবেন না।
খাঁটি সরিষার তেল চেনার উপায় কী?
ঘরে বসে খাঁটি সরিষার তেল চেনার ভরসাযোগ্য কোনো উপায় নেই। ঝাঁঝ, রং, ফ্রিজে জমানো বা হাতে ঘষে দেখা, এর কোনোটাই অল্প করে মেশানো অন্য তেল ধরতে পারে না। ভরসা করা যায় ল্যাবের রিপোর্টে, যেখানে আয়োডিন ভ্যালু, স্যাপোনিফিকেশন ভ্যালু আর দরকার হলে ইরুসিক অ্যাসিড মাপা হয়।
সরিষার তেল বিক্রি করতে কি BSTI লাইসেন্স লাগে?
নিজের নামে বোতলে ভরে বেচলে লাগে, কারণ সরিষার তেল BSTI-র বাধ্যতামূলক লিস্টে আছে। যে কোম্পানির নিজের CM লাইসেন্স আছে, তাদের সিল করা বোতল তাদের নামেই বেচলে CM তাদের। এর সাথে ট্রেড লাইসেন্স আর নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কাগজও লাগে।
এক লিটার সরিষার তেলের ওজন কত?
এক কেজির চেয়ে একটু কম। Codex-এর ভোজ্যতেলের স্ট্যান্ডার্ডে সরিষার তেলের আপেক্ষিক ঘনত্ব ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ০.৯১০ থেকে ০.৯২১ লেখা, মানে এক লিটারে মোটামুটি ৯১০ থেকে ৯২১ গ্রাম। তাই "১ কেজি" লিখে ১ লিটারের বোতল দেবেন না, যেভাবে মাপছেন সেভাবেই লিখুন।
কুরিয়ারে তেল লিক হলে কে দায় নেবে?
সাধারণত আপনি। ২০২৬ সালের অক্টোবরে Steadfast-এর টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনসে লেখা আছে, মধু আর তেলের মতো তরল জিনিস নষ্ট হলে তারা টাকা দেয় না, আর ঠিকমতো প্যাক না করলে দায়ও তাদের না। তাই মুখে সিল, টেপ, আলাদা পলি আর শক্ত কার্টন ছাড়া তেল পাঠাবেন না।
আরও পড়ুন
খেলনা ব্যবসার আইডিয়া, কোন খেলনা অনলাইনে চলে আর নিরাপত্তার নিয়ম
বাচ্চাদের খেলনা অনলাইনে বেচতে চাইলে কোন খেলনা চলে, চকবাজার থেকে প্রথম লট কীভাবে নেবেন, ২০২৬ সালে BSTI-র তালিকায় খেলনা আসার মানে কী, ব্যাটারির খেলনা চালিয়ে দেখা, মাপ বোঝানো ছবি আর না ভাঙার প্যাকিং, একটা লটের টাকার হিসাবসহ।
থ্রিফট শপিং কি? পুরনো বিদেশি জ্যাকেট-শার্টের থ্রিফট ব্যবসার নিয়ম
থ্রিফট শপিং কি, মাল কোথা থেকে আসে আর পুরনো কাপড় আমদানির নিয়ম কী বলে, গাইট খুলে বাছাই, ধোয়া আর ছবি, কন্ডিশন সত্যি করে লেখা, আর একটা গাইট থেকে এক পিসের দাম কীভাবে বের করবেন, হিসাবসহ।
অনলাইনে শাড়ির ব্যবসা, তাঁতের শাড়ি থেকে প্রথম লট, ছবি আর ফেরত
অনলাইনে শাড়ির ব্যবসা শুরু করবেন? কোন শাড়ি চলে, টাঙ্গাইলের হাট আর পাইকার, BSTI-র ২০২৬ সালের নতুন শাড়ির নিয়ম, মডেল ছাড়া শাড়ির ছবি, মাপ আর যত্নের কথা লেখা, আর একটা লটে কত থাকে, হিসাবসহ।


