চকবাজার পাইকারি মার্কেট, কোথায় কী পাবেন আর কবে বন্ধ থাকে
পুরান ঢাকার চকবাজারে কসমেটিকস, ইমিটেশন জুয়েলারি, খেলনা আর প্যাকেজিংয়ের মাল কোথায় পাবেন, কবে বন্ধ থাকে, কীভাবে যাবেন, আর নকল বা মেয়াদ পেরোনো কসমেটিকস কীভাবে চিনবেন। সবকিছু বলা হয়েছে অনলাইন সেলারের দিক থেকে।

এই লেখায় যা আছে
- চকবাজার পাইকারি মার্কেট কোথায়, কীভাবে যাবেন?
- চকবাজারে কি কি পাওয়া যায়, কোন মার্কেটে কী?
- চকবাজার মার্কেট বন্ধের দিন আর খোলার সময়
- কসমেটিকস কেনার আগে আসল-নকল আর মেয়াদ দেখবেন কীভাবে?
- জুয়েলারি, খেলনা আর প্যাকেজিংয়ের পাইকারি কোথায়?
- প্রথমবার গেলে কত টাকা নিয়ে যাবেন, ডজনের হিসাব কীভাবে করবেন?
- কেনা মাল বাসায় বা কুরিয়ারে আনবেন কীভাবে?
- চকবাজারের পাইকারের কাছ থেকে ফোনে বা অনলাইনে কেনা যায় কি?
চকবাজার পাইকারি মার্কেট পড়েছে পুরান ঢাকায়, লালবাগের পাশে। চকবাজার শাহী মসজিদের চারপাশের গলি আর মার্কেটগুলো মিলে এটা একটা বড় এলাকা। অনলাইন সেলাররা এখানে আসেন মূলত কসমেটিকস, ইমিটেশন জুয়েলারি, খেলনা, প্লাস্টিকের জিনিস আর প্যাকেজিংয়ের মাল কিনতে। মার্কেট শুক্রবার পুরো দিন বন্ধ থাকে, আর শনিবারেও কিছু পত্রিকার বন্ধের লিস্টে এই এলাকার নাম আসে। তাই যাওয়ার সবচেয়ে ভালো দিন রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার, সকাল ১০টার পরে।
এই লেখাটা চকবাজারের কাপড় ছাড়া বাকি মাল নিয়ে, আর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে কসমেটিকস কেনার সময় কীভাবে ঠকবেন না তার ওপর। থ্রি-পিস, শাড়ি বা রেডিমেড কাপড় কিনতে চাইলে ঢাকার পাইকারি কাপড়ের বাজার নিয়ে লেখাটা পড়ুন। ইসলামপুর আর কেরানীগঞ্জের পুরো খবর ওখানে আছে, আর প্রথমবার কত টাকা নিয়ে কোন হিসাবে কিনবেন সেটাও ওখানে উদাহরণ দিয়ে দেখানো আছে।
চকবাজার পাইকারি মার্কেট কোথায়, কীভাবে যাবেন?
চকবাজার পড়েছে পুরান ঢাকার চকবাজার থানায়, লালবাগ কেল্লা থেকে খুব দূরে না। The Business Standard ২০২০ সালের নভেম্বরের একটা রিপোর্টে চকবাজারকে দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি হাব বলেছে। একই রিপোর্টে বলা আছে, আশপাশে ৫০ হাজারের মতো ব্যবসায়ী আছেন। মানে আপনি একটা মার্কেটে ঢুকছেন না, অনেকগুলো মার্কেটের একটা জালের মধ্যে ঢুকছেন। প্রথম দিন এটা মাথায় না রাখলে দুই ঘণ্টা ঘুরেও মনে হবে কিছুই দেখা হয়নি।
যাওয়ার রাস্তা নিয়ে প্রথম আলো জুন ২০২৬-এ একটা কাজের কথা লিখেছে। চকবাজারের ভেতর পর্যন্ত সরাসরি কোনো বাস যায় না। বাসে বকশীবাজার বা বাবুবাজার ব্রিজে নেমে সেখান থেকে রিকশা নিন। ভেতরের গলিগুলো সরু, ভ্যান আর ঠেলাগাড়িতে প্রায় সবসময় জট লেগে থাকে। তাই মূল রাস্তায় নেমে বাকিটা হেঁটে ঘোরাই ভালো। ফোনের ম্যাপে "Chawkbazar Shahi Mosque" দিয়ে একটা পিন রাখুন, পথ হারালে ওখানে ফিরে আসা সহজ হবে।
সাথে কী নেবেন, সেটা আগে থেকে গুছিয়ে নিন। পিঠে একটা খালি ব্যাগ রাখুন, কারণ হাতে প্যাকেট নিয়ে ভিড়ের গলিতে ঘোরা কষ্টের। টাকা এক পকেটে না রেখে দুই-তিন জায়গায় ভাগ করে রাখুন, ভিড়ের মধ্যে এটাই নিরাপদ। আর একটা ছোট খাতা রাখুন। প্রতিটা দোকানের নাম, গলি, কী দেখলেন আর কত দাম বলল, সেটা ওখানে লিখবেন। বিকেল হতে হতে সব দোকান মাথায় গুলিয়ে যায়, তখন এই খাতাই কাজে আসে।
চকবাজারে কি কি পাওয়া যায়, কোন মার্কেটে কী?
চকবাজারে প্রায় সব কিছুর পাইকারি পাওয়া যায়, তবে অনলাইন সেলারের কাজের জিনিসগুলো কয়েকটা জায়গায় বেশি জমা। প্রথম আলো ২০২৩ সালের মার্চে চকবাজারের ব্যবসা নিয়ে একটা লেখা ছেপেছিল। সেখানে এখানকার মালের লিস্টে কসমেটিকস, ইমিটেশন গয়না, চুলের ক্লিপ আর ব্যান্ড, জুতা, টয়লেট্রিজ, খেলনা, আর জায়নামাজ-তসবির মতো জিনিসের নাম আছে। The Business Standard-এর ২০২১ সালের একটা রিপোর্টে এর সাথে মেহেদি, চুড়ি, ব্যাগ, তালা, টুথব্রাশ, সাবান আর কটন বাডের কথাও আছে।
নিচের টেবিলে শুধু সেই জায়গাগুলো রাখলাম, যেগুলোর নাম পত্রিকার রিপোর্টে পেয়েছি। দোকান সরে যায়, নতুন মার্কেট হয়, তাই টেবিলটাকে শুরু করার একটা ম্যাপ হিসেবে দেখুন।
| কী কিনবেন | কোথায় খুঁজবেন | কোথা থেকে জানা |
|---|---|---|
| ইমিটেশন জুয়েলারি, চুড়ি | হাজী সেলিম টাওয়ার আর আশপাশ | New Age-এর রিপোর্ট |
| খেলনা | চকবাজারের ১ নম্বর গলি, ফ্রেন্ডশিপ মার্কেট, মদিনা আশিক টাওয়ার, বিসমিল্লাহ টাওয়ার | প্রথম আলো, জুন ২০২৬ |
| কসমেটিকস, সাবান-শ্যাম্পু | চকবাজার আর পাশের বেগমবাজার এলাকা | প্রথম আলো ২০২৩, TBS ২০২০ |
| জুতা, ব্যাগ, মেহেদি, ছোটখাটো জিনিস | চকবাজারের মূল গলি, উর্দু রোড আর শাহী মসজিদের আশপাশ | TBS ২০২১ |
| খাতা, কলম, কাগজ | পাশের নয়াবাজার | TBS ২০২০ |
জুতার পাইকারিও চকবাজারে পাওয়া যায়, তবে ঢাকার অন্য মার্কেটের দাম না মিলিয়ে শুধু এখান থেকে কিনবেন না। আর কোন প্রোডাক্ট বেচবেন সেটা এখনো ঠিক না হলে, আগে উইনিং প্রোডাক্ট খোঁজার লেখাটা পড়ে নিন। মার্কেটে কোন জিনিস টেস্ট করার মতো, সেটা কীভাবে চিনবেন তা ওখানে ধাপে ধাপে বলা আছে। চকবাজারে সব দেখে "এটাও ভালো, ওটাও ভালো" মনে হওয়াটা খুব সাধারণ, আর বাড়তি মাল কেনা শুরু হয় ওখান থেকেই।
চকবাজার মার্কেট বন্ধের দিন আর খোলার সময়
শুক্রবার চকবাজার পুরো দিন বন্ধ থাকে। desh.tv-র শুক্রবারের বন্ধ মার্কেটের লিস্টে চকবাজারের নাম আছে। প্রথম আলোর জুন ২০২৬-এর খেলনার বাজার নিয়ে লেখাতেও বলা আছে, শুক্রবার এখানকার মূল মার্কেটগুলো পুরো বন্ধ থাকে।
শনিবার নিয়ে একটু সাবধান থাকুন, কারণ খবরগুলো এক রকম না। প্রথম আলোর ওই লেখায় খোলার সময় লেখা আছে শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার। আবার Star News ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ শনিবারের বন্ধের যে লিস্ট দিয়েছে, তাতে চকবাজার আর লালবাগের নাম আছে, আর অন্য কয়েকটা পত্রিকার শনিবারের লিস্টেও চকবাজার থাকে। Daily Bangladesh-এর ২০২১ সালের একটা লিস্টে চকবাজারকে আধা বেলা বন্ধের মার্কেটের মধ্যে রাখা হয়েছিল। তাই শনিবার গেলে দিনের একটা অংশ কিছু দোকান বন্ধ পেতে পারেন। পুরো দিন ঘুরে কিনতে চাইলে রবিবার থেকে বৃহস্পতিবারের মধ্যে একটা দিন বেছে নিন।
খোলার সময় নিয়ে প্রথম আলোর ওই লেখায় আছে, দোকান খোলা থাকে সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। ভিড় এড়িয়ে আরাম করে দেখার জন্য সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে যেতে বলেছে ওই লেখা। দুপুরের পরে ভিড় বাড়ে, আর পাইকারের হাতে নতুন কাস্টমারের সাথে কথা বলার সময় কমে যায়। ঈদের আগের কয়েক সপ্তাহে ভিড় আরও বেশি থাকে, কারণ তখন সারা দেশের দোকানদাররা মাল তুলতে আসেন। প্রথমবার গেলে ঈদের মৌসুম এড়িয়ে যান। আর যে দোকানে যাবেন তার নম্বর থাকলে আগের দিন একবার ফোন করে নিন।
কসমেটিকস কেনার আগে আসল-নকল আর মেয়াদ দেখবেন কীভাবে?
চকবাজারে কসমেটিকসের পাইকারি পাওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু এই মালেই সবচেয়ে বেশি সাবধান থাকতে হয়। The Business Standard ২০২০ সালের মে মাসে লিখেছে, BSTI-র একটা মোবাইল কোর্ট চকবাজার আর বেগমবাজার থেকে দুই ট্রাক নকল কসমেটিকস ধরেছিল। মালের দাম বলা হয়েছিল প্রায় ২ কোটি টাকা, আর দুইজন ব্যবসায়ীকে এক বছরের জেল দেওয়া হয়েছিল। ধরা পড়া মালের মধ্যে নামি ব্র্যান্ডের নারকেল তেল, চুলের তেল আর পারফিউমের নকল ছিল।
এর মানে এই না যে চকবাজারের সব দোকান নকল বেচে। কিন্তু আপনি অনলাইনে যে ক্রিম বা শ্যাম্পু বেচবেন, কাস্টমার সেটা নিজের মুখে বা চুলে লাগাবেন। নকল বা মেয়াদ পেরোনো জিনিসে কারও স্কিনে সমস্যা হলে দোষটা পড়বে আপনার পেজের ওপর, পাইকারের ওপর না। আর নতুন পেজের বিক্রি থামিয়ে দিতে এক-দুইটা খারাপ রিভিউই যথেষ্ট।

দোকানে দাঁড়িয়েই প্রতিটা জিনিসের এই কয়েকটা বিষয় দেখে নিন।
- মেয়াদের তারিখ আর ব্যাচ নম্বর। তারিখ না থাকলে বা ঘষে তোলা মনে হলে নেবেন না। মেয়াদ শেষ হতে অল্প কয়েক মাস বাকি থাকলেও নেবেন না, কারণ আপনার স্টক শেষ হওয়ার আগেই মেয়াদ পেরিয়ে যেতে পারে।
- বিদেশি জিনিসে আমদানিকারকের নাম। আমদানি নীতি আদেশে বলা আছে, বিদেশ থেকে আনা প্যাকেটের গায়ে আমদানিকারকের নাম-ঠিকানা আর কোন দেশে তৈরি সেটা লেখা থাকতে হয়। এই স্টিকার না থাকলে মালটা কোন পথে এসেছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
- দেশি জিনিসে BSTI-র চিহ্ন। BSTI-র ওয়েবসাইটে জুন ২০২৫-এর ৩১৫টা বাধ্যতামূলক জিনিসের লিস্টে স্কিন ক্রিম, স্কিন লোশন, শ্যাম্পু, ফেস ওয়াশ, লিপস্টিক, কাজল, নেইল পলিশ, চুলের তেল, পেট্রোলিয়াম জেলি, মেহেদি আর সাবানের নাম আছে। জানুয়ারি ২০২৬-এ এই লিস্টে আরও কিছু জিনিস যোগ হয়েছে। এগুলো দেশে বানানো হলে প্যাকেটে BSTI-র সার্টিফিকেশন চিহ্ন থাকার কথা।
- সিল, বানান আর ছাপা। ঢাকনার সিল ভাঙা কি না দেখুন। ব্র্যান্ডের নামের বানান, লোগোর রং আর লেখার ছাপা আসল প্যাকেটের সাথে মিলিয়ে দেখুন। ফোনে ব্র্যান্ডের নিজের পেজ খুলে ছবির সাথে মেলালেই অনেক কিছু ধরা পড়ে।
- দাম অস্বাভাবিক কম কি না। কোনো নামি ব্র্যান্ডের জিনিস তার ডিস্ট্রিবিউটরের দামের চেয়ে অনেক কমে পেলে খুশি না হয়ে আগে সন্দেহ করুন।
আরেকটা কথা জেনে রাখুন। ২০২৩ সালের ঔষধ ও কসমেটিকস আইনের পর কসমেটিকস দেখভালের দায়িত্ব ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (DGDA) হাতে, আর এই আইনে নকল বা ভেজাল কসমেটিকস বেচা অপরাধ। তাই "পাইকার দিয়েছে, আমি জানতাম না" বললে আপনি খুব একটা পার পাবেন না।
জুয়েলারি, খেলনা আর প্যাকেজিংয়ের পাইকারি কোথায়?
ইমিটেশন জুয়েলারি
New Age-এর একটা রিপোর্টে বলা আছে, চকবাজারের হাজী সেলিম টাওয়ারে ১০০-র বেশি গয়নার দোকান আছে। গাউছিয়া আর নিউমার্কেটের অনেক দোকানদারও তাঁদের গয়না এখান থেকেই তোলেন। একই রিপোর্ট বলছে, এই গয়নার একটা অংশ বানানো হয় সাভার, কামরাঙ্গীরচর আর পুরান ঢাকায়, বাকিটা আসে ভারত আর চীন থেকে। ডিজাইন আর মান ধরে পাইকারি দাম ৩০ টাকা থেকে ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত।
অনলাইনে বেচার জন্য ইমিটেশন গয়না বেশ সুবিধার। ওজন কম বলে কুরিয়ার চার্জ কম পড়ে, আর ছোট জিপ পাউচেই প্যাক করা যায়। তবে কেনার সময় দুটো জিনিস দেখবেন। প্রথমত পাথরগুলো ঠিকমতো বসানো কি না, আঙুল দিয়ে একটু চাপ দিয়ে দেখুন। দ্বিতীয়ত রংটা কতদিন থাকবে, সেটা দোকানদারকে সরাসরি জিজ্ঞেস করুন। কয়েক সপ্তাহে কালো হয়ে যাওয়া গয়না নিয়েই এই ব্যবসায় কাস্টমারের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি আসে।
খেলনা
প্রথম আলো জুন ২০২৬-এ চকবাজারের খেলনার বাজার নিয়ে একটা লেখা ছেপেছে। সেখানে বলা আছে, চকবাজারের ১ নম্বর গলি, ফ্রেন্ডশিপ মার্কেট, মদিনা আশিক টাওয়ার আর বিসমিল্লাহ টাওয়ার মিলে এই বাজার। লাটিম, বাঁশি, বল, পুতুল, খেলনা গাড়ি, রিমোট কন্ট্রোল গাড়ি, পাজল, বোর্ড গেম থেকে শুরু করে ক্রিকেট ব্যাট পর্যন্ত সবই পাবেন। অনেক দোকান এক ডজন বা ৩-৬ পিসের প্যাকেটে বেচে, আর কাঠের লাটিমের মতো সস্তা জিনিস নিতে হয় অন্তত ৫০টা।
খেলনা অনলাইনে বেচার আগে ভাবুন, পার্সেলে এটা টিকবে কি না। ব্যাটারির খেলনা দোকানেই চালিয়ে দেখুন, কারণ বাসায় এসে নষ্ট পেলে পাইকার সাধারণত আর বদলে দেন না। যে খেলনা উপহার হিসেবে বিক্রি হবে, তার বক্স ছেঁড়া বা দুমড়ানো থাকলে কাস্টমার পার্সেল ফেরত দিতে পারেন। আর ছোট বাচ্চাদের খেলনায় খুব ছোট খোলা অংশ থাকলে সেটা কোন বয়সের জন্য, পেজে পরিষ্কার লিখে দিন।

প্যাকেজিং
চকবাজার আর তার আশপাশ প্লাস্টিক আর কাগজের বড় জায়গা। The Business Standard-এর ২০২০ সালের রিপোর্ট বলছে, পাশের চুড়িহাট্টায় প্লাস্টিক বানানোর মাল আর নয়াবাজারে কাগজ বিক্রি হয়। ২০২৬ সালের আগস্টে একই পত্রিকা লিখেছে, পাশের ইসলামবাগে প্লাস্টিকের ছোট কারখানার বড় একটা গুচ্ছ গড়ে উঠেছে। তবে প্যাকেজিংয়ের জন্য চকবাজারে আলাদা কোনো নামকরা মার্কেটের নাম আমরা কোনো নির্ভরযোগ্য রিপোর্টে পাইনি। তাই যে পাইকারের কাছ থেকে মাল কিনছেন, তাঁকেই জিজ্ঞেস করুন তিনি নিজে পলি আর বক্স কোথা থেকে নেন।
কোন প্রোডাক্টে কোন সাইজের পলি লাগে, কতটা পুরু নেবেন আর দোকানে গিয়ে কীভাবে সাইজ মিলিয়ে কিনবেন, সেটা কুরিয়ার পলির সাইজ আর দাম নিয়ে লেখায় আলাদা করে বলা আছে। এখানে শুধু একটা কথা বলি। প্রথমবারেই প্যাকেজিং অনেক কিনবেন না, কারণ আপনার মাল কোন পলিতে ঠিকমতো আঁটে সেটা প্রথম কয়েকটা পার্সেল পাঠিয়েই বুঝবেন।
প্রথমবার গেলে কত টাকা নিয়ে যাবেন, ডজনের হিসাব কীভাবে করবেন?
প্রথমবার মাল তোলার উদ্দেশ্য হলো বুঝে নেওয়া, আপনার পেজে কোন জিনিসটা চলে। হাতের টাকা কীভাবে ভাগ করবেন আর কয়টা ডিজাইনে ছড়িয়ে কিনবেন, সেই নিয়ম কাপড়ের মার্কেটের লেখায় উদাহরণসহ আছে, চকবাজারেও নিয়মটা একই। এখানে শুধু চকবাজারের একটা আলাদা ঝামেলার কথা বলি, আর সেটা হলো ডজনের দাম।
চকবাজারে দোকানদার প্রায়ই ডজনের দাম বলেন, পিসের না। এতে হিসাবে ভুল হওয়া খুব সহজ। নিচের সংখ্যাগুলো উদাহরণ, কোনো দোকানের আসল দাম না। ধরুন ইমিটেশন কানের দুলের এক ডজনের দাম বলল ৮০০ টাকা। তাহলে এক জোড়ার দাম পড়ছে প্রায় ৬৭ টাকা। এবার ধরুন আপনি ৫টা ডিজাইনের ২ ডজন করে মোট ১২০ জোড়া নিলেন, আর রিকশা, সিএনজি আর নিজের ভাড়ায় গেল ৬০০ টাকা। ১২০ জোড়ায় ভাগ করলে প্রতি জোড়ায় যোগ হয় ৫ টাকা। তাহলে এক জোড়া দুলের আসল কেনা দাম ৬৭ না, ৭২ টাকার মতো। পেজে দাম বসানোর সময় এই ৭২ টাকা ধরেই হিসাব করবেন।
ডজনের কম নিতে চাইলে বেশিরভাগ দোকান পাইকারি দাম দেবে না, এটা ধরে নিয়েই যান। তবু জিজ্ঞেস করে দেখুন, একই ডজনে দুই-তিনটা রং মিশিয়ে দেবেন কি না। গয়না আর চুলের ক্লিপে অনেক দোকান এটা করে দেয়, আর তাতে একই টাকায় আপনি বেশি রং টেস্ট করতে পারেন। কোন রং চলল, সেটা বোঝার পর পরের বার ওই রংটাই পুরো ডজন ধরে আনবেন।
কেনা মাল বাসায় বা কুরিয়ারে আনবেন কীভাবে?
অল্প মাল হলে কাজটা সহজ। জুয়েলারি বা কসমেটিকসের দুই-তিনটা প্যাকেট পিঠের ব্যাগেই এঁটে যায়। মূল রাস্তা পর্যন্ত হেঁটে এসে সেখান থেকে রিকশা বা সিএনজি নিন। খেলনার মতো বড় বক্সের মাল হলে দোকান থেকেই একটা ভ্যান ঠিক করে দিতে বলুন, আর ভাড়াটা আগেই ঠিক করে নিন।
ঢাকার বাইরে থাকলে প্রতিবার মাল হাতে বয়ে নেওয়া কঠিন। সেলারদের সাধারণ অভিজ্ঞতা হলো, অনেক পাইকার তখন বাসের পার্সেল সার্ভিস বা কুরিয়ারে আপনার জেলায় মাল বুক করে দেন। এভাবে পাঠালে দুটো কাজ করবেন। বুক করার আগে দোকানেই পিস গুনে মিলিয়ে নিন, আর কার্টন কীভাবে বাঁধা হচ্ছে সেটা নিজের চোখে দেখুন। ভাঙার মতো জিনিস হলে কার্টনের ভেতরে কাগজ বা ফোম দিতে বলুন। পার্সেল হাতে পেয়ে খোলার সময় একটা ভিডিও করে রাখুন, মাল কম বা ভাঙা এলে পাইকারকে দেখাতে এটাই কাজে লাগবে।
মাল বাসায় আনার পরেই পোস্ট দেওয়া শুরু করবেন না। আগে সব প্যাকেট খুলে গুনে দেখুন, খুঁতওয়ালা পিস আলাদা করুন। কসমেটিকস হলে প্রতিটার মেয়াদ একটা খাতায় লিখে রাখুন, আর যার মেয়াদ আগে শেষ হবে সেটা আগে বেচবেন। এই পাঁচ মিনিটের কাজটা না করলে মাস দুয়েক পরে তাকের পেছনে মেয়াদ পেরোনো ক্রিম পাবেন, আর সেটা ফেলে দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।
চকবাজারের পাইকারের কাছ থেকে ফোনে বা অনলাইনে কেনা যায় কি?
যায়, আর এখন অনেক পাইকার ফেসবুক পেজ বা WhatsApp-এ ছবি দিয়ে অর্ডার নেন। The Business Standard ২০২১ সালে লিখেছিল, চকবাজারের অনেক কাস্টমার তখনো নিজে এসে দেখে আর দরদাম করে কিনতেই পছন্দ করতেন, অনলাইন বা কুরিয়ারে ভরসা করতেন না। সেই অবস্থা এখন অনেকটা বদলেছে, তবে ভরসার প্রশ্নটা রয়েই গেছে।
কসমেটিকসে এই প্রশ্নটা আরও বড়। ছবিতে কৌটা দেখে মেয়াদ, ব্যাচ নম্বর বা আমদানিকারকের স্টিকার বোঝা যায় না, অথচ ওপরের সব চেক এগুলো নিয়েই। তাই কসমেটিকস কিনতে প্রথমবার অন্তত নিজে যান। যে দোকান ভালো লাগল, তার কার্ড বা নম্বর নিয়ে আসুন। পরের বার একই জিনিস ফোনে অর্ডার দিলে ভিডিও কলে পাইকারকে কৌটার পেছনের লেবেলটা ক্যামেরার সামনে ধরতে বলুন। অচেনা পেজে প্রথমবারেই বড় অঙ্কের পুরো টাকা অগ্রিম পাঠাবেন না। অনলাইনে পাইকারের কাছ থেকে কেনার বাকি নিয়মগুলো কাপড়ের মার্কেটের লেখায় আছে, জুয়েলারি আর খেলনাতেও সেগুলো একইভাবে খাটে।
কয়েকজন পাইকার হয়ে গেলে কোন লট কার কাছ থেকে এলো, সেটা গুলিয়ে যায়। কসমেটিকসে এটা জানা জরুরি, কারণ কোনো ব্যাচ নিয়ে কাস্টমার অভিযোগ করলে আপনাকে বলতে হবে ওটা কোথা থেকে কিনেছিলেন। একটা খাতা বা Google Sheet-এ লিখলেও চলে। WinningSeller-এ সাপ্লায়ার আর পারচেজ অর্ডার রাখা যায়, তাই কোন পাইকারের কাছ থেকে কবে কী এলো আর কত টাকা দিলেন, সেটা স্টকের পাশেই খুঁজে পাবেন।
এই সপ্তাহে যেতে চাইলে আগে ঠিক করুন কোন একটা জিনিস দিয়ে শুরু করবেন। তারপর রবিবার থেকে বৃহস্পতিবারের একটা দিন বেছে নিন, সকাল ১০টার মধ্যে বকশীবাজার বা বাবুবাজার ব্রিজে পৌঁছান। খাতা, খালি ব্যাগ আর ভাগ করে রাখা টাকা নিয়ে ঢুকে পড়ুন। প্রথম ঘণ্টায় কিছু কিনবেন না, শুধু তিনটা দোকানের দাম লিখবেন।
সাধারণ প্রশ্ন
চকবাজার পাইকারি মার্কেট কবে বন্ধ থাকে?
চকবাজার শুক্রবার পুরো দিন বন্ধ থাকে। desh.tv-র শুক্রবারের বন্ধ মার্কেটের লিস্টে চকবাজারের নাম আছে, আর প্রথম আলোও লিখেছে শুক্রবার এখানকার মূল মার্কেটগুলো পুরো বন্ধ থাকে। শনিবারের বন্ধের লিস্টেও কিছু পত্রিকা এই এলাকার নাম দেয়, তাই পুরো দিন ঘুরে কিনতে চাইলে রবিবার থেকে বৃহস্পতিবারের মধ্যে যান।
চকবাজারে কি কি পাওয়া যায়?
চকবাজার আর তার আশপাশে কসমেটিকস, সাবান-শ্যাম্পু, ইমিটেশন জুয়েলারি, চুড়ি, চুলের ক্লিপ, খেলনা, ব্যাগ, জুতা, মেহেদি আর প্লাস্টিকের নানা জিনিসের পাইকারি পাওয়া যায়। পাশের নয়াবাজারে পাবেন কাগজ আর স্টেশনারি, আর ইসলামপুরে কাপড়। কোন জিনিস কোন মার্কেটে, সেটা লেখার টেবিলে দেওয়া আছে।
চকবাজার কিভাবে যাব?
চকবাজারের ভেতর পর্যন্ত সরাসরি কোনো বাস যায় না। প্রথম আলোর জুন ২০২৬-এর একটা লেখা অনুযায়ী বাসে বকশীবাজার বা বাবুবাজার ব্রিজে নেমে সেখান থেকে রিকশা নিতে হয়। ভেতরের গলিগুলো সরু, তাই মূল রাস্তায় নেমে বাকিটা হেঁটে ঘোরাই ভালো।
চকবাজারে কি অল্প পরিমাণে কেনা যায়?
চকবাজার মূলত পাইকারি বাজার, তাই বেশিরভাগ দোকান ডজন ধরে বা ছোট প্যাকেট ধরে বেচে। প্রথম আলোর খেলনার বাজার নিয়ে লেখায় আছে, অনেক দোকান এক ডজন বা ৩-৬ পিসের প্যাকেটে বেচে, আর কাঠের লাটিম নিতে হয় অন্তত ৫০টা। আপনি অনলাইনে বেচেন আর আবার আসবেন বললে কিছু দোকান কম পিসেও দেয়, তবে দাম একটু বেশি পড়ে।
চকবাজারের কসমেটিকস কি আসল?
সব দোকান এক রকম না, তাই চোখ বন্ধ করে কিনবেন না। The Business Standard লিখেছে, BSTI-র মোবাইল কোর্ট ২০২০ সালে চকবাজার আর বেগমবাজার থেকে নামি ব্র্যান্ডের নকল কসমেটিকস ধরেছিল। কেনার আগে লেবেল, মেয়াদ, ব্যাচ নম্বর আর আমদানিকারকের স্টিকার দেখুন, আর মেমো নিন।
চকবাজারে কি পাইকারি কাপড় পাওয়া যায়?
কিছু দোকান আছে, তবে পাইকারি কাপড়ের আসল জায়গা পাশের ইসলামপুর। রেডিমেড পোশাকের জন্য যেতে হবে বুড়িগঙ্গার ওপারে কেরানীগঞ্জে। ঢাকার কাপড়ের মার্কেটগুলো নিয়ে আমাদের আলাদা একটা লেখা আছে।
আরও পড়ুন
খেলনা ব্যবসার আইডিয়া, কোন খেলনা অনলাইনে চলে আর নিরাপত্তার নিয়ম
বাচ্চাদের খেলনা অনলাইনে বেচতে চাইলে কোন খেলনা চলে, চকবাজার থেকে প্রথম লট কীভাবে নেবেন, ২০২৬ সালে BSTI-র তালিকায় খেলনা আসার মানে কী, ব্যাটারির খেলনা চালিয়ে দেখা, মাপ বোঝানো ছবি আর না ভাঙার প্যাকিং, একটা লটের টাকার হিসাবসহ।
থ্রিফট শপিং কি? পুরনো বিদেশি জ্যাকেট-শার্টের থ্রিফট ব্যবসার নিয়ম
থ্রিফট শপিং কি, মাল কোথা থেকে আসে আর পুরনো কাপড় আমদানির নিয়ম কী বলে, গাইট খুলে বাছাই, ধোয়া আর ছবি, কন্ডিশন সত্যি করে লেখা, আর একটা গাইট থেকে এক পিসের দাম কীভাবে বের করবেন, হিসাবসহ।
অনলাইনে শাড়ির ব্যবসা, তাঁতের শাড়ি থেকে প্রথম লট, ছবি আর ফেরত
অনলাইনে শাড়ির ব্যবসা শুরু করবেন? কোন শাড়ি চলে, টাঙ্গাইলের হাট আর পাইকার, BSTI-র ২০২৬ সালের নতুন শাড়ির নিয়ম, মডেল ছাড়া শাড়ির ছবি, মাপ আর যত্নের কথা লেখা, আর একটা লটে কত থাকে, হিসাবসহ।


