পাইকারি কাপড়ের বাজার ঢাকা, কোন মার্কেটে কী পাবেন আর কবে বন্ধ
থ্রি-পিস, শাড়ি, বোরকা, শার্ট-প্যান্ট আর বাচ্চাদের কাপড় ঢাকার কোন মার্কেটে পাবেন, কোন দিন বন্ধ, প্রথমবার কত টাকা আর কত পিস নিয়ে যাবেন, আর কাপড়ের মান কীভাবে চেক করবেন, সব অনলাইন সেলারের দিক থেকে বলা।

এই লেখায় যা আছে
- পাইকারি কাপড়ের বাজার ঢাকা, কোন কাপড় কোন মার্কেটে?
- ইসলামপুরে কী পাবেন?
- কেরানীগঞ্জে কী পাবেন?
- নরসিংদী বাবুরহাট কবে বসে?
- গাউছিয়া, চাঁদনী চক আর বঙ্গবাজারে কি পাইকারি দাম পাওয়া যায়?
- কোন মার্কেট কবে বন্ধ থাকে?
- প্রথমবার গেলে কত টাকা আর কত পিস নিয়ে যাবেন?
- কাপড়ের মান আর দাম চেক করবেন কীভাবে?
- ঢাকায় না গিয়ে অনলাইনে পাইকারি কাপড় কিনলে কি ঠকার ভয় আছে?
পাইকারি কাপড়ের বাজার ঢাকায় খুঁজলে সবচেয়ে বড় দুটো নাম পাবেন, ইসলামপুর আর কেরানীগঞ্জ। থান কাপড়, শাড়ি আর আনস্টিচড থ্রি-পিস কিনতে সেলাররা যান পুরান ঢাকার ইসলামপুরে। জিন্স, শার্ট, পাঞ্জাবি, বোরকা বা বাচ্চাদের রেডিমেড কাপড় কিনতে চাইলে যেতে হবে বুড়িগঙ্গার ওপারে কেরানীগঞ্জে। দেশি তাঁতের শাড়ি আর লুঙ্গির জন্য ঢাকার বাইরে নরসিংদীর বাবুরহাটও আছে, তবে সেটা সপ্তাহে মাত্র তিন দিন বসে। যাওয়ার দিন ঠিক করার আগে মনে রাখবেন, ইসলামপুর শুক্রবার বন্ধ থাকে, আর গাউছিয়া ও চাঁদনী চক বন্ধ থাকে মঙ্গলবার।
তবে কোন মার্কেটে কী পাওয়া যায়, সেটা জানা কাজের অর্ধেক মাত্র। অনলাইনে যিনি কাপড় বেচবেন, তাঁকে আরও দুটো প্রশ্নের উত্তর জানতে হয়। প্রথমবার কত টাকা নিয়ে যাবেন আর এক ডিজাইনের কয় পিস নেবেন, সেটা একটা প্রশ্ন। কাপড়টা পেজের ছবিতে যেমন দেখাবে, কাস্টমারের হাতে গিয়েও তেমন থাকবে কি না, সেটা আরেকটা। নিচে আগে মার্কেটগুলোর কথা বলছি, তারপর এই দুই প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি।
পাইকারি কাপড়ের বাজার ঢাকা, কোন কাপড় কোন মার্কেটে?
প্রথমে পুরো ছবিটা মাথায় রাখুন। ঢাকার কাপড়ের পাইকারি বাজারকে মোটামুটি দুই ভাগে ভাগ করা যায়। এক ভাগে থান আর পিস কাপড় বিক্রি হয়, যেটা দিয়ে দর্জি জামা বানাবেন বা কাস্টমার নিজে বানিয়ে নেবেন। আরেক ভাগে বিক্রি হয় বানানো, রেডিমেড পোশাক। আপনি কোনটা বেচবেন সেটা আগে ঠিক করলে অর্ধেক মার্কেট এমনিতেই বাদ পড়ে যায়, আর ঘোরাঘুরির একটা পুরো দিন বেঁচে যায়।
নিচের টেবিলটা দিয়ে শুরু করতে পারেন। প্রতিটা মার্কেটে টেবিলের বাইরেও অনেক কিছু পাবেন। এখানে শুধু সেই জায়গাগুলো রেখেছি, যেখানে ওই কাপড়ের জন্য সেলাররা সাধারণত আগে যান।
| কী বেচবেন | কোথায় খুঁজবেন | খেয়াল রাখুন |
|---|---|---|
| আনস্টিচড থ্রি-পিস, থান কাপড়, শাড়ি, লুঙ্গি | ইসলামপুর, বাবুরহাট | ইসলামপুর শুক্রবার বন্ধ, বাবুরহাট সপ্তাহে তিন দিন বসে |
| রেডিমেড থ্রি-পিস, বোরকা, জিন্স, শার্ট, পাঞ্জাবি | কেরানীগঞ্জ | সাইজ ধরে কিনতে হয়, মাপার ফিতা নিয়ে যান |
| বাচ্চাদের কাপড় | কেরানীগঞ্জ, ইসলামপুর | বয়স অনুযায়ী সাইজ সেট করে নিন |
| লেস, বাটন, স্টোন, সাজের জিনিস | ইসলামপুর | কাপড়ের সাথে একই দিনে কেনা যায় |
| অল্প পিস, ট্রেন্ড দেখা | গাউছিয়া, চাঁদনী চক | মঙ্গলবার বন্ধ, দাম খুচরার কাছাকাছি |
এই লেখাটা শুধু কাপড়ের মার্কেট নিয়ে। কসমেটিক্স, খেলনা বা গ্যাজেটের পাইকারি মার্কেট কোনটা, আর মার্কেট ঘুরে কীভাবে নতুন প্রোডাক্টের আইডিয়া বের করবেন, সেটা উইনিং প্রোডাক্ট খোঁজার লেখায় আছে।
ইসলামপুরে কী পাবেন?
ইসলামপুর পড়েছে পুরান ঢাকায়, বুড়িগঙ্গার পাড়ে, সদরঘাটের একদম কাছে। The Daily Star ২০২৪ সালের মার্চে ইসলামপুর নিয়ে একটা লেখা ছেপেছিল। সেখানে বলা আছে, আশপাশের ৯৫টার মতো মার্কেটে ৬,৫০০-র বেশি শোরুম আছে, আর রাস্তার পাশের ছোট দোকান ধরলে সংখ্যাটা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। দেশের অন্য জেলার অনেক খুচরা দোকানদারও কাপড় নেন এখান থেকে।
একই লেখায় এখানকার মালের একটা লম্বা লিস্ট আছে। সিল্ক, রেয়ন, জর্জেট, সুতির মতো থান কাপড় থেকে শুরু করে শাড়ি, লুঙ্গি, রেডিমেড পোশাক আর বাচ্চাদের কাপড় সবই এখানে বিক্রি হয়। সাথে লেস, বাটন আর স্টোনের মতো সাজের জিনিসও পাবেন। থ্রি-পিস বেচতে চাইলে এটা কাজের খবর, কারণ জামা সাজানোর লেস বা ওড়নার পাড় কিনতে আলাদা করে আরেক মার্কেটে যেতে হয় না।
ইসলামপুরে গেলে একটা জিনিস প্রথমেই চোখে পড়বে। এখানে দোকানদাররা থান আর গজের হিসাবে কথা বলেন, পিসের হিসাবে না। আনস্টিচড থ্রি-পিস সাধারণত প্যাকেট করা সেট হিসেবে বিক্রি হয়, জামার কাপড়, সালোয়ারের কাপড় আর ওড়না একসাথে। প্যাকেট খুলে তিনটা টুকরোই আছে কি না, আর ওড়নার রং জামার সাথে মেলে কি না, সেটা দোকানেই দেখে নেবেন।

সময়টাও মাথায় রাখুন। The Daily Star-এর ওই লেখা বলছে, ইসলামপুরের ভরা মৌসুম শুরু হয় শবে বরাতের ১০ দিন আগে, চলে রমজানের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত। ওই সময় সারা দেশের দোকানদার ঈদের মাল তুলতে আসেন। ভিড় তখন এত বেশি থাকে যে নতুন কাউকে বসিয়ে কথা বলার সময় পাইকারের হাতে থাকে না। তাই প্রথমবার গেলে ঈদের ভিড় শুরু হওয়ার এক মাস আগে যান। তখন পাইকার আপনার সাথে কথা বলার সময় পাবেন, আর ঈদের অর্ডার নেওয়ার জন্য পেজের ছবিও আগে থেকে রেডি থাকবে।
কেরানীগঞ্জে কী পাবেন?
কেরানীগঞ্জ বুড়িগঙ্গার ওপারে, পুরান ঢাকার ঠিক উল্টো দিকে। এখানে কাপড় শুধু বিক্রি হয় না, বানানোও হয়। Dhaka Tribune-এর ২০১৯ সালের একটা রিপোর্টে বলা আছে, দেশের রেডিমেড পোশাকের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ কেরানীগঞ্জের এই ব্যবসা থেকে মেটে। রিপোর্টটা কয়েক বছর পুরনো, তাই সংখ্যাটা এখন কিছুটা বদলে থাকতে পারে। তবু দেশি রেডিমেড পোশাকের সবচেয়ে বড় পাইকারি জায়গা হিসেবে কেরানীগঞ্জের নামই আগে আসে।
এখানে কী কী বানানো হয়, সেটাও রিপোর্টে আছে। টি-শার্ট, থ্রি-পিস, জিন্স, শার্ট, পাঞ্জাবি, বোরকা, আন্ডারগার্মেন্টস আর বাচ্চাদের কাপড় সবই এখানে তৈরি হয়। মার্কেটগুলো ছড়িয়ে আছে আগানগর আর কালীগঞ্জের মাঝে, এক কিলোমিটারের বেশি জায়গা জুড়ে। রিপোর্টে আলম টাওয়ার, ইসলাম প্লাজা, সেঞ্চুরি কমপ্লেক্সের মতো কয়েকটা মার্কেটের নামও দেওয়া আছে।
অনলাইন সেলারের জন্য কেরানীগঞ্জের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, অনেক সময় যিনি বানাচ্ছেন তাঁর কাছ থেকেই সরাসরি কেনা যায়। তখন একটা ডিজাইন চললে আবার একই ডিজাইন বানিয়ে দিতে বলা যায়, এমনকি নিজের পছন্দের রঙেও। অনলাইনে এই সুবিধার দাম অনেক। আপনার অ্যাডের ছবি যতদিন চলবে, কাস্টমার ততদিন ঠিক ওই ডিজাইনটাই চাইবেন।
রেডিমেড কাপড়ের একটা ঝামেলাও আছে, সেটা সাইজ। থান কাপড়ে সাইজের প্রশ্ন ওঠে না, কিন্তু রেডিমেড বোরকা বা জিন্সে ওঠে। লেবেলে যে সাইজ লেখা থাকে, মাপলে অনেক সময় সেটা মেলে না। তাই কেরানীগঞ্জে যাওয়ার সময় একটা মাপার ফিতা নিয়ে যান, আর প্রতিটা সাইজের একটা পিস নিজে মেপে খাতায় লিখে রাখুন। এই মাপ দিয়েই পরে পেজের সাইজ চার্ট বানাবেন। সাইজ চার্ট ভুল হলে পার্সেল ফেরত আসবে, আর ফেরতের কুরিয়ার চার্জ যাবে আপনার পকেট থেকে।
নরসিংদী বাবুরহাট কবে বসে?
বাবুরহাট ঢাকার ভেতরে না, তবু কাপড়ের পাইকারি নিয়ে কথা হলে নামটা আসবেই। Banglapedia অনুযায়ী হাটটা বসে নরসিংদী সদর উপজেলার শেখেরচরে, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে। ঢাকা থেকে দূরত্ব Banglapedia-য় লেখা ৩৫ কিলোমিটার, আর The Daily Star-এর একটা পুরনো রিপোর্টে লেখা ৪৫ কিলোমিটার। যেটাই ধরুন, যানজটসহ যাওয়া-আসায় দিনের বড় একটা অংশ চলে যাবে। এটা দেশি তাঁতের কাপড়ের হাট। নরসিংদী আর আশপাশের জেলার তাঁতিরা এখানে নিজেদের কাপড় নিয়ে আসেন।
হাট বসার দিন নিয়ে অনলাইনে নানা রকম কথা পাবেন, কারণ দিনগুলো বছরে বছরে বদলেছে। প্রথম আলো আর বাসস, দুটোরই ২০২৪ সালের এপ্রিলের রিপোর্টে লেখা আছে, হাট বসে সপ্তাহে তিন দিন, বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার। দুই রিপোর্টেই দোকানের সংখ্যা বলা হয়েছে পাঁচ হাজারের মতো। আবার প্রথম আলোর ২০১৫ সালের একটা রিপোর্টে আছে, ঈদের আগে হাট পুরো সপ্তাহ খোলা ছিল। তাই রওনা দেওয়ার আগের দিন ওখানকার কোনো দোকানে ফোন করে দিনটা জেনে নেবেন। নরসিংদী পর্যন্ত গিয়ে বন্ধ হাট দেখে ফেরার চেয়ে একটা ফোন অনেক সস্তা।
ওই রিপোর্টগুলোতে বাবুরহাটের মালের যে লিস্ট আছে, তাতে শাড়ি, লুঙ্গি, থ্রি-পিস, শার্ট পিস, প্যান্ট পিস, পাঞ্জাবির কাপড়, থান কাপড়, বিছানার চাদর আর গামছা সবই পড়ে। বাসসের রিপোর্টে টাঙ্গাইলের শাড়ি আর জামদানির কথাও আছে। দেশি সুতি কাপড়, লুঙ্গি বা পুরুষের পাঞ্জাবির কাপড় দিয়ে পেজ চালাতে চাইলে বাবুরহাট একবার ঘুরে আসার মতো জায়গা।
তবে বাবুরহাট নতুন সেলারের প্রথম জায়গা না। এখানে বেশিরভাগ বেচাকেনা হয় বড় লটে, দেশের নানা জেলার দোকানদারদের সাথে। দশ-বারো পিস নিতে গেলে অনেক দোকানে গুরুত্ব পাবেন না, আর যাতায়াতে পুরো একটা দিন যাবে। তাই আগে ইসলামপুর বা কেরানীগঞ্জ থেকে কিনে কয়েক মাস বেচুন। কোন কাপড় চলে আর মাসে কত পিস লাগে, সেটা বুঝে ফেললে তখন বাবুরহাটে যান।
গাউছিয়া, চাঁদনী চক আর বঙ্গবাজারে কি পাইকারি দাম পাওয়া যায়?
গাউছিয়া আর চাঁদনী চক নিউমার্কেটের ঠিক পাশেই। দুটোতেই কাপড়, গয়না আর জুতার দোকান অনেক, আর খুচরার পাশাপাশি কিছু দোকান পাইকারিও দেয়। তবে বেশিরভাগ সেলারের অভিজ্ঞতা হলো, ইসলামপুর বা কেরানীগঞ্জের তুলনায় এখানে দাম খুচরার কাছাকাছি থাকে। তাই এখান থেকে নিয়মিত স্টক তুললে আপনার মার্জিন কম থাকবে।
তাহলে গাউছিয়ায় যাবেন কেন? প্রথম কারণ, এখানে দুই-তিন পিস কেনা সহজ। একটা নতুন ডিজাইন অল্প করে এনে পেজে পোস্ট দিয়ে দেখতে পারেন অর্ডার আসে কি না, আর অর্ডার এলে বড় লট তুলবেন ইসলামপুর বা কেরানীগঞ্জ থেকে। দ্বিতীয় কারণ, ঢাকার দোকানগুলো এখন কোন কাট আর কোন রং সামনে ঝোলাচ্ছে, সেটা এক ঘণ্টা হাঁটলেই বোঝা যায়। মার্কেট ঘুরে ট্রেন্ড ধরার পুরো নিয়মটা উইনিং প্রোডাক্টের লেখায় বলা আছে, তাই এখানে আর লম্বা করছি না।
বঙ্গবাজারের অবস্থা এখন আলাদা। ২০২৩ সালের এপ্রিলের আগুনে মার্কেটটা পুড়ে যায়। The Business Standard ২০২৬ সালের আগস্টে লিখেছে, ব্যবসায়ীরা এখনো আশপাশের মার্কেট, মিরপুর, নিউমার্কেট আর নূরজাহান মার্কেটে ছড়িয়ে আছেন, আর অনেকে ফেসবুক পেজ খুলে অনলাইনে বেচছেন। একই জায়গায় ১০ তলার বঙ্গবাজার পাইকারি মার্কেট তৈরি হচ্ছে, যেখানে ৩,০৪২টা দোকান থাকার কথা। কবে চালু হবে, সেটা রিপোর্টে বলা নেই। বঙ্গবাজার পরিচিত ছিল এক্সপোর্ট সারপ্লাস কাপড়ের জন্য, মানে বিদেশের অর্ডারের যে মাল বাড়তি হয়ে গেছে বা ছোটখাটো খুঁতের কারণে পাঠানো হয়নি। এই ধরনের মাল খুঁজলে আগে খোঁজ নিন আপনার চেনা দোকানটা এখন কোথায় বসছে।
কোন মার্কেট কবে বন্ধ থাকে?
ঢাকার মার্কেটগুলোর সাপ্তাহিক বন্ধ এলাকা ধরে আলাদা। অনেক পত্রিকা প্রতিদিন সকালে সেদিনের বন্ধ মার্কেটের লিস্ট ছাপে। ২০২৬ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে desh.tv-র এমন লিস্টগুলো মিলিয়ে দেখলে কাপড়ের মার্কেটের দিনগুলো এরকম দাঁড়ায়।
- শুক্রবার বন্ধ থাকে ইসলামপুরের কাপড়ের দোকান, চকবাজার, সদরঘাট আর বাবুবাজার এলাকা (desh.tv, ২ অক্টোবর ২০২৬)।
- মঙ্গলবার বন্ধ থাকে নিউমার্কেট, গাউছিয়া, চাঁদনী চক আর চন্দ্রিমা মার্কেট (desh.tv, ৬ অক্টোবর ২০২৬)।
- বৃহস্পতিবার বন্ধ থাকে মৌচাক মার্কেট (desh.tv, ১ অক্টোবর ২০২৬)।
কেরানীগঞ্জের মার্কেটগুলোর সাপ্তাহিক বন্ধের দিন কোনো নির্ভরযোগ্য সোর্সে আমরা পাইনি। মার্কেট ধরে দিন আলাদা হতে পারে, তাই যে পাইকারের কাছে যাবেন তাঁকে আগে ফোন করে নিন। বাবুরহাটের দিন ওপরে বলেছি, তবে খেয়াল রাখবেন ওটা বন্ধের দিন না, হাট বসার দিন।
প্রথমবার গেলে কত টাকা আর কত পিস নিয়ে যাবেন?
প্রথম কেনাকাটার আসল কাজ লাভ করা না, শেখা। আপনার কাস্টমার কোন রং বেশি নেন আর কোন কাপড়ের ছবি ফোনে ভালো আসে, সেটা প্রথম লট বেচেই বুঝবেন। কোন সাইজ বারবার ফেরত আসছে, সেটাও তখনই ধরা পড়ে। তাই এমন অঙ্ক নিয়ে যান, যেটা পুরো আটকে গেলেও আপনার সংসার বা ব্যবসা টলবে না।
নিচের হিসাবটা একটা উদাহরণ, কোনো মার্কেটের আসল দাম না। নিজের মার্কেট আর নিজের কাপড়ের দাম বসিয়ে মিলিয়ে নিন।
ধরুন আপনি ইসলামপুর থেকে আনস্টিচড থ্রি-পিস কিনবেন, হাতে ১৫,০০০ টাকা। এর মধ্যে ১২,০০০ টাকা রাখুন কাপড়ের জন্য। বাকি ৩,০০০ টাকা রাখুন যাতায়াত, মাল আনার ভ্যান বা রিকশা, পলি আর হঠাৎ খুব ভালো কিছু চোখে পড়লে সেটার জন্য। পুরো টাকা কাপড়ে ঢেলে দিলে ফেরার ভাড়ার জন্য টানাটানি হয়, আর প্যাকেটের পলি কেনার টাকাও থাকে না।
এবার ১২,০০০ টাকায় কী নেবেন। ধরুন পিসপ্রতি গড় দাম পড়ল ৬০০ টাকা, তাহলে মোট ২০ পিস হয়। এগুলো ৫টা ডিজাইনে ভাগ করে প্রতিটার ৪ পিস নিন। এক ডিজাইনের ২০ পিস নিলে ওটা না চললে পুরো টাকা আটকে যায়। আবার ২০টা ডিজাইনের এক পিস করে নিলে কোনটা আসলে চলল সেটা বোঝাই যায় না, কারণ প্রতিটা একবার বিক্রি হয়েই শেষ। কয়টা ডিজাইন আর কোন রং নেবেন, আর যে ডিজাইন চলবে সেটা আবার আনার টাকা কেন আলাদা রাখবেন, সেটা অনলাইনে কাপড়ের ব্যবসার গাইডে বিস্তারিত বলা আছে। এখানে শুধু মার্কেটে যাওয়ার দিনের হিসাবটা রাখছি।
পাইকার হয়তো বলবেন, এক ডজন না নিলে পাইকারি দাম হবে না। অনেক দোকানে কথাটা সত্যি, তবে সব দোকানে না। আপনি যে অনলাইনে বেচেন আর ডিজাইন চললে আবার তাঁর কাছেই আসবেন, সেটা খোলাখুলি বলুন। নিয়মিত কাস্টমার পাইকারেরও দরকার, তাই অনেকে তখন চার-পাঁচ পিসেও দাম কিছুটা কমান। দাম ডজনের দামের চেয়ে একটু বেশি পড়লে মেনে নিন। প্রথম লটে কয়েকশো টাকা বেশি দিলে যে ক্ষতি হয়, ২০ পিস অচল মাল নিয়ে বসে থাকার ক্ষতি তার চেয়ে অনেক বড়।
কেনার পরের কাজ হলো দাম ঠিক করা। ওপরের উদাহরণে ভ্যান আর যাতায়াতে ৬০০ টাকা গেলে, সেটা ২০ পিসে ভাগ করলে পিসপ্রতি ৩০ টাকা। তাহলে আপনার আসল কেনা দাম ৬০০ না, ৬৩০ টাকা। এর ওপর কুরিয়ার, COD চার্জ, ফেরত পার্সেল আর অ্যাডের খরচ বসিয়ে কীভাবে বিক্রির দাম বের করবেন, সেটা ঠিক এমনই একটা থ্রি-পিসের উদাহরণ দিয়ে প্রোডাক্টের দাম নির্ধারণের লেখায় ধাপে ধাপে দেখানো আছে। মার্কেট থেকে ফিরে পোস্ট দেওয়ার আগে ওই হিসাবটা একবার করে নিন।
কাপড়ের মান আর দাম চেক করবেন কীভাবে?
দোকানের আলোয় সব কাপড়ই সুন্দর দেখায়। সমস্যা ধরা পড়ে কাস্টমারের হাতে গিয়ে, যখন পার্সেল খুলে তিনি দেখেন রং আলাদা, বা প্রথম ধোয়াতেই রং উঠে গেছে। তখন পার্সেল ফেরত আসে, আর সাথে পেজে একটা খারাপ রিভিউও পড়ে। তাই কেনার সময় কয়েকটা জিনিস নিজের হাতে চেক করবেন।

রং ওঠে কি না। পকেটে একটা সাদা রুমাল রাখুন। পানিতে একটু ভিজিয়ে কাপড়ের কোণায় কয়েকবার ঘষুন। রুমালে রং লাগলে বুঝবেন ধোয়ার সময় রং ছাড়বে। এমন কাপড় নিলে কাস্টমারকে আগে থেকে বলে দিতে হবে আলাদা ধুতে, নইলে অভিযোগ আসবে।
কাপড় পাতলা কি না। কাপড়টা আলোর দিকে ধরে দেখুন। ওপাশ থেকে হাত পরিষ্কার দেখা গেলে কাপড়টা পাতলা। গরমের সুতি জামায় এটা হয়তো চলে, কিন্তু ছবিতে কাপড় মোটা দেখিয়ে পাতলা কাপড় পাঠালে কাস্টমার ঠকেছেন মনে করবেন।
সেট পুরো আছে কি না। থ্রি-পিসের প্যাকেট খুলে জামা, সালোয়ার আর ওড়না তিনটাই দেখুন, প্রিন্ট সোজা আছে কি না দেখুন। রেডিমেড কাপড়ে সেলাই হালকা টেনে দেখুন, আর ফিতা দিয়ে মেপে দেখুন লেবেলের সাইজের সাথে মেলে কি না। দোকানে দেখানো স্যাম্পল না, যে প্যাকেটগুলো আপনাকে দেওয়া হচ্ছে সেগুলো থেকে দুই-একটা খুলে দেখুন।
দাম চেক করার নিয়ম সহজ। একই গলিতে অন্তত তিনটা দোকানে একই রকম কাপড়ের দাম জিজ্ঞেস করুন, আর খাতায় লিখে রাখুন। দাম জানতে চাইবেন আপনি যত পিস নেবেন সেই সংখ্যা বলে, যেমন "চার পিস নিলে কত পড়বে?" ডজনের দাম শুনে হিসাব করলে পরে কেনার সময় অঙ্ক মেলে না। প্রথম দোকানেই কিনে ফেলবেন না, আর পছন্দ হলেও মুখে বেশি উৎসাহ দেখাবেন না, কারণ আগ্রহ টের পেলে পাইকার দাম কমাতে চান না। আর একটা প্রশ্ন অবশ্যই করবেন, "এই ডিজাইনটা এক মাস পরে আবার পাওয়া যাবে?" অনলাইনে এই প্রশ্নটা দামের চেয়েও জরুরি। আপনার পোস্ট চললে অর্ডার আসতেই থাকবে, আর তখন ডিজাইনটা না পেলে ওই পোস্টের সব অর্ডার ক্যানসেল করতে হবে।
শেষে দোকানের নাম, নম্বর আর কী কত দামে কিনলেন লেখা একটা মেমো চেয়ে নিন। খুঁতওয়ালা পিস পেলে ফেরত বা বদল দেবেন কি না, সেটাও কেনার আগেই জিজ্ঞেস করুন। পরে ফোনে অভিযোগ করলে মেমো আর আগের কথাটাই আপনার ভরসা।
ঢাকায় না গিয়ে অনলাইনে পাইকারি কাপড় কিনলে কি ঠকার ভয় আছে?
রংপুর, সিলেট বা খুলনা থেকে প্রতি মাসে ঢাকায় আসা সহজ না। তাই এখন অনেক পাইকার ফেসবুক পেজ বা WhatsApp-এ ছবি দেন, অর্ডার নেন, আর কুরিয়ারে মাল পাঠান। এতে আপনার যাতায়াতের খরচ আর একটা পুরো দিন বেঁচে যায়, আর ঘরে বসেই অনেক দোকানের দাম মিলিয়ে দেখা যায়।
তবে ঠকার ভয়ও আছে, আর সেটা মূলত তিন রকম। ছবিতে যে কাপড় দেখলেন, পার্সেলে সেটা না এসে কম মানের কাপড় আসতে পারে। পুরো টাকা অগ্রিম পাঠানোর পর মাল না-ও আসতে পারে। আর প্রথম লট ভালো এলেও পরের লটে মান নেমে যেতে পারে। দোষ সবসময় পাইকারের না, অনেক সময় মিল থেকেই অন্য রকম কাপড় আসে। কিন্তু ক্ষতিটা শেষ পর্যন্ত আপনার, কারণ আপনার কাস্টমার আপনাকেই দোষ দেবেন।
তাই অনলাইনে পাইকারের কাছ থেকে কেনার সময় কয়েকটা নিয়ম রাখুন। প্রথম অর্ডার ছোট রাখুন, এমন অঙ্কের যেটা হারালেও সামলাতে পারবেন। অর্ডার দেওয়ার আগে ভিডিও কলে আসল পিসটা দেখতে চান, স্টুডিওর ছবি না। দোকানের ঠিকানা জেনে নিন, আর ঢাকায় পরিচিত কেউ থাকলে একবার গিয়ে দেখে আসতে বলুন। পেজের কমেন্ট আর রিভিউতে আগে যাঁরা কিনেছেন তাঁরা কী বলছেন, সেটা পড়ে নিন। কেউ কেউ অগ্রিম হিসেবে শুধু কুরিয়ার চার্জ বা অর্ধেক টাকা নিয়ে বাকিটা কুরিয়ারের কন্ডিশনে পাঠান, এমন পাইকার পেলে শুরুতে তাঁদেরকেই আগে রাখুন।
একজন ভালো পাইকার পেয়ে গেলে তাঁকে ধরে রাখুন। নিয়মিত সময়ে পেমেন্ট দিন, আর কোন ডিজাইন চলছে সেটা তাঁকে জানান। যে পাইকার জানেন আপনি প্রতি সপ্তাহে নেবেন, তিনি নতুন মাল এলে আগে আপনাকে ছবি পাঠাবেন, আর ঈদের ভিড়েও আপনার মাল আলাদা করে রাখবেন।
কয়েকজন পাইকার হয়ে গেলে কার কাছ থেকে কী কত দামে নিলেন, সেটা মনে রাখা কঠিন হয়ে যায়। খাতা বা Google Sheet-এ লিখে রাখলেই চলে। WinningSeller-এ সাপ্লায়ারের লিস্ট আর পারচেজ অর্ডার রাখার ফিচার আছে, তাই কোন পাইকারের কাছ থেকে কবে কী কিনলেন আর কত টাকা দিলেন, সেটা অর্ডার আর স্টকের পাশেই থাকে।
এই সপ্তাহেই কাজটা শুরু করতে চাইলে আগে ঠিক করুন কোন কাপড় বেচবেন, থান না রেডিমেড। তারপর ওপরের টেবিল থেকে মার্কেটটা বেছে নিন, বন্ধের দিনটা মিলিয়ে নিন, আর সাদা রুমাল, মাপার ফিতা আর একটা ছোট খাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন।
সাধারণ প্রশ্ন
ঢাকায় সবচেয়ে বড় পাইকারি কাপড়ের বাজার কোনটা?
থান কাপড়, শাড়ি আর আনস্টিচড থ্রি-পিসের জন্য পুরান ঢাকার ইসলামপুর সবচেয়ে বড় আর পুরনো। রেডিমেড পোশাক, মানে জিন্স, শার্ট, পাঞ্জাবি, বোরকা আর বাচ্চাদের কাপড়ের জন্য বুড়িগঙ্গার ওপারে কেরানীগঞ্জ। ঢাকার বাইরে নরসিংদীর বাবুরহাট দেশি তাঁতের কাপড়ের বড় হাট।
ইসলামপুর মার্কেট কবে বন্ধ থাকে?
ইসলামপুরের কাপড়ের দোকান শুক্রবার বন্ধ থাকে। ২০২৬ সালের ২ অক্টোবর desh.tv-র শুক্রবারের বন্ধ মার্কেটের লিস্টে ইসলামপুরের কাপড়ের দোকান, চকবাজার, সদরঘাট আর বাবুবাজারের নাম আছে। ঈদের আগে অনেক দোকান ছুটির দিনেও খোলা থাকে, তাই যাওয়ার আগে পাইকারকে একবার ফোন করে নিন।
বাবুরহাট কোন কোন দিন বসে?
প্রথম আলো আর বাসস-এর ২০২৪ সালের এপ্রিলের রিপোর্ট অনুযায়ী বাবুরহাট সপ্তাহে তিন দিন বসে, বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার। ঈদের মৌসুমে দিন বাড়ে, আর আগের বছরগুলোতে দিন বদলেছেও। তাই রওনা দেওয়ার আগে ওখানকার কোনো দোকানে ফোন করে দিনটা জেনে নিন।
পাইকারি দামে কাপড় কিনতে কমপক্ষে কত পিস নিতে হয়?
এটা দোকান আর কাপড় ধরে আলাদা, কোনো বাঁধা নিয়ম নেই। অনেক পাইকার এক ডজনের হিসাবে দাম বলেন, কিন্তু অনলাইনে বেচেন আর নিয়মিত নেবেন বললে অনেকে একটা ডিজাইনের ৩ থেকে ৫ পিসও দেন। দাম তখন ডজনের দামের চেয়ে একটু বেশি পড়ে, সেটা মেনে নিন।
গাউছিয়া কি পাইকারি মার্কেট?
গাউছিয়ায় খুচরা আর পাইকারি দুই রকম দোকানই আছে, তবে বেশিরভাগ সেলার একে ইসলামপুর বা কেরানীগঞ্জের মতো পুরো পাইকারি বাজার হিসেবে দেখেন না। অল্প পিস কিনতে আর এখন কী চলছে দেখতে ওখানে যাওয়া কাজের। গাউছিয়া, চাঁদনী চক আর নিউমার্কেট মঙ্গলবার বন্ধ থাকে।
প্রথমবার পাইকারি কাপড় কিনতে কত টাকা লাগে?
কোনো বাঁধা অঙ্ক নেই, তবে এমন টাকা নিয়ে যান যেটা পুরো আটকে গেলেও ব্যবসা টলবে না। এই লেখার উদাহরণে ১৫,০০০ টাকা ধরা হয়েছে, যার ১২,০০০ কাপড়ে আর ৩,০০০ যাতায়াত, ভ্যান ভাড়া আর পলির জন্য। ওই টাকায় ৫টা ডিজাইনের ৪ পিস করে নিলে কোন ডিজাইন চলছে সেটা পরিষ্কার বোঝা যায়।
আরও পড়ুন
খেলনা ব্যবসার আইডিয়া, কোন খেলনা অনলাইনে চলে আর নিরাপত্তার নিয়ম
বাচ্চাদের খেলনা অনলাইনে বেচতে চাইলে কোন খেলনা চলে, চকবাজার থেকে প্রথম লট কীভাবে নেবেন, ২০২৬ সালে BSTI-র তালিকায় খেলনা আসার মানে কী, ব্যাটারির খেলনা চালিয়ে দেখা, মাপ বোঝানো ছবি আর না ভাঙার প্যাকিং, একটা লটের টাকার হিসাবসহ।
থ্রিফট শপিং কি? পুরনো বিদেশি জ্যাকেট-শার্টের থ্রিফট ব্যবসার নিয়ম
থ্রিফট শপিং কি, মাল কোথা থেকে আসে আর পুরনো কাপড় আমদানির নিয়ম কী বলে, গাইট খুলে বাছাই, ধোয়া আর ছবি, কন্ডিশন সত্যি করে লেখা, আর একটা গাইট থেকে এক পিসের দাম কীভাবে বের করবেন, হিসাবসহ।
অনলাইনে শাড়ির ব্যবসা, তাঁতের শাড়ি থেকে প্রথম লট, ছবি আর ফেরত
অনলাইনে শাড়ির ব্যবসা শুরু করবেন? কোন শাড়ি চলে, টাঙ্গাইলের হাট আর পাইকার, BSTI-র ২০২৬ সালের নতুন শাড়ির নিয়ম, মডেল ছাড়া শাড়ির ছবি, মাপ আর যত্নের কথা লেখা, আর একটা লটে কত থাকে, হিসাবসহ।


