পারচেজ অর্ডার কি? পাইকারের বাকি নিয়ে আর তর্ক হবে না যেভাবে
পারচেজ অর্ডার কী, মেমো বা ইনভয়েসের সাথে তফাত কোথায়, PO-তে কী কী লিখবেন, মাল অর্ধেক এলে কী করবেন, আর কোন পাইকারের কাছে কত টাকা বাকি সেটা খাতা বা এক্সেলে কীভাবে মেলাবেন। টাকার উদাহরণসহ।

এই লেখায় যা আছে
- পারচেজ অর্ডার কি, ইনভয়েসের সাথে পার্থক্য কোথায়?
- ছোট সেলারের কি পারচেজ অর্ডার লাগে?
- পারচেজ অর্ডারে কী কী লিখবেন?
- মাল এলে মিলিয়ে নেবেন যেভাবে, অর্ধেক এলে কী?
- সাপ্লায়ারের কাছে কত বাকি, হিসাবটা আসে কোথা থেকে?
- কেনা দাম বদলালে লাভের হিসাবে কী হয়?
- পাইকারকে টাকা দেওয়ার সময় কোন ভুলগুলো বেশি হয়?
- খাতা বা এক্সেলে এই হিসাব রাখবেন যেভাবে
পারচেজ অর্ডার মানে আপনি সাপ্লায়ার বা পাইকারকে লিখে যে অর্ডারটা দেন, কোন প্রোডাক্ট কত পিস কত দামে কবে লাগবে। ছোট করে একে PO বলে। এটা টাকা চাওয়ার কাগজ না, কেনার কথা দেওয়ার কাগজ। মাল এলে PO-র সাথে মিলিয়ে দেখবেন কতটা এলো, আর ঠিক ততটার টাকাই পাইকারের কাছে বাকি হিসেবে লিখবেন। একটা কথা আগেই বলে রাখি। এই লেখা দোকানের খদ্দেরের বাকি খাতা নিয়ে না। এখানে উল্টো দিকের হিসাব, মানে আপনি পাইকারের কাছে কত টাকা বাকি রাখলেন, বা কত টাকা অগ্রিম দিয়ে বসে আছেন।
ধরুন আপনার তিনজন পাইকার। একজনের কাছ থেকে থ্রি-পিস নেন, একজনের কাছ থেকে পাঞ্জাবি, আরেকজনের কাছ থেকে পলি আর বক্স। অর্ডার দেন ফোনে, মাল আসে দুই-তিন দিন পরে, কখনো অর্ধেক আসে। এক রাতে পাইকার ফোন দিয়ে বললেন, "ভাই, আগের চার হাজার টাকা তো এখনো পাইনি।" আপনার মনে হচ্ছে দিয়েছিলেন, কিন্তু কবে, কোন নম্বর থেকে, কিছুই লেখা নেই। তর্ক করবেন, নাকি আবার দিয়ে দেবেন? যে মানুষটা ঈদের ভিড়ে আপনার জন্য মাল আলাদা করে রাখেন, তাঁর সাথে টাকা নিয়ে কথা কাটাকাটি কারও ভালো লাগে না। এই লেখার নিয়মগুলো মানলে এমন রাত আর আসবে না।
পারচেজ অর্ডার কি, ইনভয়েসের সাথে পার্থক্য কোথায়?
দুটো কাগজ দুই মানুষের হাত থেকে আসে, এটাই আসল তফাত। পারচেজ অর্ডার বানান আপনি, মানে যিনি কিনছেন। তাতে লেখা থাকে আপনি কী চান। ইনভয়েস বানান সাপ্লায়ার, মানে যিনি বিক্রি করছেন। তাতে লেখা থাকে তিনি কী দিলেন আর কত টাকা পাবেন। আমাদের পাইকারি বাজারে ইনভয়েসকে বেশিরভাগ মানুষ মেমো বা চালান বলেন।
সময়ের দিক থেকেও দুটো আলাদা। PO যায় আগে, মাল আসার আগেই। মেমো আসে মালের সাথে বা মাল পৌঁছানোর পরে। তাই PO দিয়ে ফেললেই আপনার কোনো দেনা হয় না। আপনি ৬০ পিসের অর্ডার দিলেন আর এখনো একটাও আসেনি, তাহলে এই মুহূর্তে আপনি পাইকারের কাছে এক টাকাও বাকি না। দেনা শুরু হয় যেদিন মাল আপনার হাতে আসে, আর ঠিক ততটা মালের দামে, যতটা এসেছে।
বড় কোম্পানিগুলো টাকা দেওয়ার আগে তিনটা কাগজ মিলিয়ে দেখে। হিসাবের পরিচিত ওয়েবসাইট AccountingTools-এ এই নিয়মটাকে বলা হয়েছে three-way matching। সাপ্লায়ারের ইনভয়েস, নিজের পারচেজ অর্ডার আর মাল বুঝে নেওয়ার কাগজ, এই তিনটা মিললে তবেই টাকা যায়। না মিললে সাপ্লায়ারের সাথে কথা বলে মেমো ঠিক করানো হয়। আপনার দোকান ছোট, কিন্তু নিয়মটা একই কাজ করে। আপনি কী চেয়েছিলেন, পাইকার মেমোতে কী লিখলেন, আর কার্টন খুলে আসলে কী পেলেন। তিনটা মিললে টাকা দিন, না মিললে টাকা দেওয়ার আগে পাইকারকে ফোন দিন।
নিজের কাস্টমারকে পার্সেলের সাথে যে ইনভয়েস দেন, সেটা আবার আলাদা জিনিস। সেখানে আপনি বেচছেন, কাস্টমার কিনছেন। ওটা কীভাবে বানাবেন আর কী লিখবেন, সেটা অনলাইন অর্ডারের ইনভয়েসের লেখায় বিস্তারিত আছে।
ছোট সেলারের কি পারচেজ অর্ডার লাগে?
সবার লাগে না, আর এটা সোজাসুজি বলা দরকার। আপনি যদি নিজে মার্কেটে গিয়ে মাল বেছে, গুনে, সেখানেই নগদ টাকা দিয়ে মেমো নিয়ে চলে আসেন, তাহলে আলাদা PO বানানোর দরকার নেই। অর্ডার দেওয়া, মাল পাওয়া আর টাকা দেওয়া একই সময়ে হয়ে গেল, ভুলে যাওয়ার মতো কিছু বাকি থাকল না। তখন মেমোটা রেখে খাতায় এক লাইন লিখলেই চলে।
PO লাগে যখন অর্ডার দেওয়া আর মাল পাওয়ার মাঝে কয়েক দিনের ফাঁক থাকে। ফোনে অর্ডার দিলেন, মাল এলো কুরিয়ারে বা ট্রাকে চার দিন পরে। কিংবা অগ্রিম কিছু টাকা দিলেন, আর কথা হলো বাকিটা মাল পেয়ে দেবেন। অনেক পাইকার আবার মাল দেন কয়েক কিস্তিতে। কোনো দিন হয়তো আপনি বাইরে, আর মাল বুঝে নিচ্ছে আপনার ছোট ভাই বা কোনো স্টাফ। এর যেকোনো একটা হলেই কয়েক দিন পরে মনে রাখতে হয় কী চেয়েছিলেন আর কী দামে, আর মানুষের মনে এটা বেশি দিন থাকে না।
আরেকটা কারণ আছে, যেটা অনেকে ভাবেন না। আপনার পাইকারেরও পঞ্চাশজন খদ্দের আছে, তাঁর খাতাও ভুল হতে পারে। তিনি যদি মনে করেন দাম ৫৮০ টাকা ঠিক হয়েছিল, আর আপনার মনে আছে ৫৫০, তাহলে কারও কাছে প্রমাণ নেই। লিখে পাঠানো একটা PO থাকলে কথাটা সেখানেই শেষ। PO মানে ছাপানো কোনো সরকারি কাগজ না। ফোনে মেসেজ করে পাঠানো একটা লিস্টও চলে, যদি তাতে নম্বর দেন আর নিজের কাছে একটা কপি রাখেন।
পারচেজ অর্ডারে কী কী লিখবেন?
একটা ভালো PO এক নজরে পড়া যায়, আর পাইকারের মনে কোনো প্রশ্ন রাখে না। এই ঘরগুলো রাখুন।
- PO নম্বর। একটা সংখ্যা থেকে সিরিয়াল ধরে দিন, যেমন ১০০১, ১০০২। বাতিল হলেও নম্বরটা আবার দেবেন না।
- তারিখ, আর কবে আসার কথা। আসার দিনটা লেখা থাকলে দেরি হলে কবে ফোন দেবেন সেটা বুঝতে পারেন।
- সাপ্লায়ারের নাম আর ফোন নম্বর।
- প্রতিটা প্রোডাক্টের নাম, সাইজ, রং আর আপনার কোড। "লাল থ্রি-পিস" না লিখে "লাল থ্রি-পিস, সুতি, ফ্রি সাইজ" লিখুন।
- পরিমাণ, প্রতিটার কেনা দাম, আর লাইনের মোট টাকা।
- পুরো অর্ডারের মোট টাকা, আর অগ্রিম কত দিলেন, কীভাবে।
- নোট। গাড়িভাড়া কে দেবেন, নষ্ট পিস বদলে দেবেন কি না, মাল কীভাবে আসবে।
নম্বরটা কেন জরুরি, একটু বলি। পাইকারের সাথে ফোনে "গত সপ্তাহের মালটা" বললে তিনি তিনটা আলাদা চালানের কথা ভাবতে পারেন। "১০০৪ নম্বরের মাল" বললে দুজনেই একই কাগজের কথা বোঝেন। দামটাও প্রতিটা লাইনে লেখা চাই। মাল আসার পরে "ভাই, দাম তো বেড়ে গেছে" কথাটা আমাদের বাজারে প্রায়ই শোনা যায়। আগে লিখে দেওয়া দাম থাকলে সেখানে নতুন করে দরদাম করার সুযোগ থাকে, বিনা কথায় মেনে নিতে হয় না।
নোটের ঘরটাকে হালকাভাবে নেবেন না। কেরানীগঞ্জ থেকে রংপুরে মাল আসলে গাড়িভাড়া কম টাকা না। কে দেবেন সেটা আগে লেখা না থাকলে মাল পৌঁছানোর দিন এটা নিয়েই কথা কাটাকাটি হয়।
একটা উদাহরণ দেখুন, কোনো আসল দোকানের না। "PO ১০০৪, রাজু ভাই, ছেলেদের সুতি পাঞ্জাবি ৩০ পিস (M ১০, L ১২, XL ৮), প্রতিটা ৪২০ টাকা, মোট ১২,৬০০ টাকা। আসার কথা বৃহস্পতিবার। অগ্রিম ৩,০০০ টাকা bKash-এ দেওয়া হয়েছে। গাড়িভাড়া রাজু ভাইয়ের। নষ্ট পিস পরের চালানে বদলে দেবেন।" এই কয়েক লাইন পড়ে পাইকার, আপনি, আর আপনার যে স্টাফ মাল বুঝে নেবে, তিনজনই একই কথা বুঝবেন।
মাল এলে মিলিয়ে নেবেন যেভাবে, অর্ধেক এলে কী?
মাল আসার দিনটাই পুরো হিসাবের সবচেয়ে জরুরি দিন। এদিন যা লিখবেন, পরের সব টাকার হিসাব সেখান থেকেই আসবে। তাই কার্টন এলে আগে PO আর পাইকারের মেমো পাশাপাশি রাখুন। তারপর প্রতিটা লাইন ধরে গুনুন, সাইজ আর রং আলাদা করে। "৩০ পিস পাঞ্জাবি এসেছে" দেখে খুশি হয়ে যাবেন না। M সাইজ ১০টার জায়গায় ৬টা আর XL ৮টার জায়গায় ১২টা এলে মোট সংখ্যা মিলবে, কিন্তু আপনার কাস্টমারের অর্ডার মিলবে না।
গোনার সময় নষ্ট, দাগ লাগা বা ছেঁড়া পিস আলাদা করে রাখুন। খাতার "এসেছে" ঘরে শুধু ভালো পিসের সংখ্যা লিখুন, আর নষ্টগুলোর কথা নোটে লিখুন। কারণটা সোজা। নষ্ট পিস আপনি বিক্রি করতে পারবেন না, তাই তার দাম আপনার বাকিতে ঢোকা উচিত না। পাইকার বদলে দিলে যেদিন নতুন পিস আসবে, সেদিন সেটা "এসেছে" ঘরে লিখবেন। নষ্ট পিসের ছবি তুলে সেদিনই পাইকারকে পাঠান। দুই সপ্তাহ পরে বললে তিনি বিশ্বাস নাও করতে পারেন, আর সেটা তাঁর দোষও না।

এবার অর্ধেক আসার কথা। ধরুন ৬০ পিসের অর্ডারে প্রথম চালানে এলো ৩০ পিস। খাতায় লিখুন "এসেছে ৩০, আসা বাকি ৩০", আর বাকির ঘরে ৩০ পিসের টাকা যোগ করুন, ৬০ পিসের না। বাকি ৩০ পিস পরে এলে সেদিন আবার লিখবেন। যদি পাইকার বলেন বাকি মাল আর দিতে পারবেন না, তাহলে PO-টা সেখানেই বন্ধ করে দিন, আর নোটে লিখুন কেন বন্ধ হলো। তখন আপনার দেনা শুধু যতটা এসেছে ততটার। আপনি যদি আগেই পুরো ৬০ পিসের টাকা দিয়ে থাকেন, তাহলে উল্টো পাইকারের কাছে আপনার টাকা পাওনা থাকল। সেটা পরের চালানে কেটে নেবেন, নাকি ফেরত চাইবেন, সেদিনই কথা বলে ঠিক করুন।
WinningSeller-এ এই কাজটা পারচেজ অর্ডারের পেজ থেকেই হয়। মাল এলে "প্রোডাক্ট এসেছে" বাটনে চাপ দিয়ে প্রতিটা প্রোডাক্টের পাশে যতটা এসেছে সেই সংখ্যা লেখেন, তারপর "স্টকে তুলুন"। সাথে সাথে স্টকে পিসগুলো যোগ হয়, সাপ্লায়ারের খাতায় ঠিক ততটার টাকা বাকি লেখা হয়, আর হিসাব-নিকাশে প্রোডাক্ট কেনার খরচ ওঠে। অর্ধেক এলে অর্ডারটা "আংশিক এসেছে" হয়ে থাকে। বাকি মাল আর না এলে "বাকিটা আসবে না" চাপলে অর্ডার বন্ধ হয়, আর খাতায় যতটা এসেছে ততটাই থাকে।
সাপ্লায়ারের কাছে কত বাকি, হিসাবটা আসে কোথা থেকে?
প্রতিটা পাইকারের বাকি একটা ছোট যোগ-বিয়োগ থেকে আসে। এটা একবার মাথায় বসে গেলে আর কখনো গুলিয়ে যাবে না।
বাকি = শুরুর বাকি + যত টাকার মাল হাতে এসেছে − যত টাকা দিয়েছেন
শুরুর বাকি মানে যেদিন থেকে খাতা লেখা শুরু করলেন, সেদিন পর্যন্ত আগের যা হিসাব ছিল। মাল হাতে আসার টাকা মানে প্রতিটা চালানে যতটা ভালো পিস এসেছে, তার কেনা দামের যোগফল। আর দেওয়া টাকার মধ্যে অগ্রিম, হাতে হাতে ক্যাশ, bKash, ব্যাংক সব ধরবেন। খেয়াল করুন, PO-র মোট টাকা এই হিসাবে কোথাও নেই। কারণ অর্ডার দেওয়া মানে কথা দেওয়া, দেনা না। আর হিসাবটা মাইনাসে গেলে বুঝবেন পাইকারের কাছে আপনার অগ্রিম জমা আছে।
একটা মাসের উদাহরণ দেখুন। নিচের সব সংখ্যা বোঝানোর জন্য বানানো, কোনো দোকানের আসল হিসাব না। ধরুন করিম ভাইয়ের কাছ থেকে আপনি থ্রি-পিস নেন, আর মাসের শুরুতে তাঁর কাছে আগের ২,০০০ টাকা বাকি ছিল। ৩ তারিখে PO ১০০১ দিলেন, ৬০ পিস থ্রি-পিস, প্রতিটা ৫৫০ টাকা, মোট ৩৩,০০০ টাকা। সাথে bKash-এ ১০,০০০ টাকা অগ্রিম দিলেন।
| কী হলো | মাল এসেছে (টাকা) | পেমেন্ট (টাকা) | বাকি (টাকা) |
|---|---|---|---|
| ১ তারিখ, আগের বাকি | ২,০০০ | ||
| ৩ তারিখ, PO ১০০১ দিলেন, bKash-এ অগ্রিম | ১০,০০০ | অগ্রিম ৮,০০০ | |
| ৭ তারিখ, ৩০ পিস এলো | ১৬,৫০০ | ৮,৫০০ | |
| ১২ তারিখ, নগদ দিলেন | ৮,০০০ | ৫০০ | |
| ১৮ তারিখ, আরও ২০ পিস এলো | ১১,০০০ | ১১,৫০০ | |
| ২০ তারিখ, bKash-এ দিলেন | ৭,০০০ | ৪,৫০০ | |
| ২৫ তারিখ, বাকি ১০ পিস আসবে না, PO বন্ধ | ৪,৫০০ |
মাস শেষে করিম ভাই পাবেন ৪,৫০০ টাকা। সূত্রে মিলিয়ে দেখুন। ২,০০০ + ২৭,৫০০ − ২৫,০০০ = ৪,৫০০।
এবার ভুল পথে হিসাব করলে কী হতো দেখুন। অনেকে PO-র ৩৩,০০০ টাকাকেই বাকি ধরে নেন। তাহলে হিসাব দাঁড়ায় ২,০০০ + ৩৩,০০০ − ২৫,০০০ = ১০,০০০ টাকা। মাসের শেষে করিম ভাই ফোন দিলে আপনি সরল মনে ১০,০০০ টাকা পাঠিয়ে দিতেন। অথচ যে ১০ পিস কখনো আসেনি, তার ৫,৫০০ টাকাও চলে যেত। করিম ভাই সৎ মানুষ হলে হয়তো ফেরত দেবেন, কিন্তু তাঁর খাতাও যদি ভুল থাকে, টাকাটা সেখানেই হারিয়ে গেল।
কেনা দাম বদলালে লাভের হিসাবে কী হয়?
পাইকারি দাম এক জায়গায় বসে থাকে না। কাপড়ের দাম বাড়ে, ডলারের দাম বাড়লে আমদানি করা জিনিসের দাম বাড়ে, ঈদের আগে প্রায় সবকিছুর দাম বাড়ে। সমস্যা হয় যখন কেনা দাম বাড়ল, কিন্তু আপনার হিসাবের শিটে পুরনো দামটাই রয়ে গেল।
উদাহরণ দিয়ে দেখি, এটাও বানানো সংখ্যা। করিম ভাই পরের চালানে থ্রি-পিসের দাম ৫৫০ থেকে ৬০০ করলেন। আপনি বিক্রি করেন ১,২৫০ টাকায়। শিটে কেনা দাম ৫৫০ থেকে গেলে প্রতিটা বিক্রিতে খাতায় লাভ দেখাবে ৫০ টাকা বেশি। মাসে ১০০ পিস বিক্রি হলে কাগজে ৫,০০০ টাকা এমন লাভ দেখাবে, যেটা আসলে আপনার পকেটে নেই। মাস শেষে ভাববেন ব্যবসা ভালো চলছে, অথচ ক্যাশ বাক্স বলবে অন্য কথা। ঠিক এই ফাঁক থেকেই অনেক সেলার বুঝতে পারেন না টাকা যাচ্ছে কোথায়।
হাতে হিসাব রাখলে কেনা দাম ঠিক করার দুটো সহজ উপায় আছে। সবচেয়ে সোজা হলো শেষ চালানের দামটাই নতুন কেনা দাম ধরে নেওয়া, আর ছোট দোকানে বেশিরভাগ সময় এটুকুই যথেষ্ট। একটু বেশি ঠিক হিসাব চাইলে গড় দাম ধরুন। ধরুন হাতে আগের ২০ পিস আছে ৫৫০ টাকার, নতুন এলো ৪০ পিস ৬০০ টাকার। মোট দাম ১১,০০০ + ২৪,০০০ = ৩৫,০০০ টাকা, পিস ৬০টা, তাহলে গড় পড়ে প্রায় ৫৮৩ টাকা। যেটাই নিন, সারা বছর একই নিয়ম মেনে হিসাব করবেন, আর দাম বদলানোর তারিখটা লিখে রাখুন। পুরনো মাল আগে বের করার নিয়ম, মানে FIFO, ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্টের লেখায় বুঝিয়ে বলা আছে।
কেনা দাম বাড়লে বিক্রির দামটাও একবার ভেবে দেখুন। ৫০ টাকা বাড়তি খরচ চুপচাপ নিজের ঘাড়ে নিতে থাকলে মার্জিন কমতে কমতে একসময় অ্যাডের খরচই উঠবে না।
WinningSeller-এ মাল "স্টকে তুলুন" করার সময় একটা সুইচ থাকে, "প্রোডাক্টের কেনা দাম আপডেট করুন", শুরুতে চালু করা। চালু থাকলে প্রোডাক্টের কেনা দাম এই PO-র দামে বদলে যায়, তাই পরের অর্ডারগুলোর লাভ নতুন দামে হিসাব হয়। আগে নেওয়া অর্ডারগুলোতে কেনা দাম যা ছিল তাই থাকে, কারণ প্রতিটা অর্ডার নেওয়ার সময়ই তার কেনা দাম সাথে লিখে রাখা হয়। কোনো চালানের দাম যদি এককালীন হয়, সুইচটা বন্ধ করে দিলেই আগের দাম থেকে যায়।
পাইকারকে টাকা দেওয়ার সময় কোন ভুলগুলো বেশি হয়?
পাইকারের সাথে বেশিরভাগ ঝামেলা মাল নিয়ে হয় না, হয় টাকা নিয়ে। নিচের ভুলগুলো সেলারদের মধ্যে খুব চেনা, আর প্রতিটার দাম আপনি টাকায় অথবা সম্পর্কে দেন।
মাল গোনার আগে পুরো টাকা দিয়ে দেওয়া। পাইকার তাড়া দিচ্ছেন, আপনিও ভালো মানুষ, তাই কার্টন খোলার আগেই পুরো টাকা bKash করে দিলেন। পরে গুনে দেখলেন ৮ পিস কম। এখন নিজের টাকার জন্য আপনাকেই ফোন দিতে হবে, আর পাইকারের কাছে সেটা আর জরুরি না। নিয়মটা সোজা। অগ্রিম যা ঠিক হয়েছে সেটুকু দিন, বাকিটা দিন গোনার পরে।
যে লোক মাল নিয়ে এলো, তার হাতে লেখা ছাড়া নগদ দেওয়া। পাইকারের দোকানের ছেলেটা মাল দিয়ে গেল, আপনি তার হাতে ৮,০০০ টাকা দিলেন। এক মাস পরে পাইকার বললেন টাকাটা তিনি পাননি। কে ঠিক বলছে, প্রমাণ করার কোনো উপায় নেই। হাতে হাতে টাকা দিলে সাথে সাথে পাইকারকে একটা মেসেজ দিন, "ভাই, আজ ৮,০০০ টাকা রাসেলের হাতে দিলাম, PO ১০০১-এর জন্য।" তিনি "আচ্ছা" লিখলেই সেটা আপনার রিসিট।
bKash-এ পাঠিয়ে TrxID না রাখা। তিন দিন পরে মনে নেই পাঠিয়েছিলেন কি না, তাই আরেকবার পাঠালেন। দুবার দেওয়ার বেশিরভাগ ঘটনা এভাবেই ঘটে। প্রতিটা পেমেন্টের পাশে খাতায় TrxID বা ব্যাংকের রেফারেন্স লিখে রাখুন। তাহলে সন্দেহ হলে এক মিনিটে মিলিয়ে নিতে পারবেন।
সংসারের টাকা থেকে দিয়ে ব্যবসার খাতায় না তোলা। হাতে ব্যবসার টাকা ছিল না, তাই নিজের পকেট থেকে পাইকারকে দিলেন। খাতায় না তুললে মাস শেষে লাভ বেশি দেখাবে, আর পাইকারের বাকিও ভুল দেখাবে। কোন টাকা থেকেই দিন, সাপ্লায়ারের খাতায় পেমেন্টটা লিখতেই হবে। ব্যবসা আর সংসারের টাকা আলাদা রাখার নিয়ম অনলাইন ব্যবসার লাভ-ক্ষতির হিসাবের লেখায় আছে।
মাসে একবারও পাইকারের খাতার সাথে না মেলানো। আপনার খাতায় বাকি ৪,৫০০, তাঁর খাতায় ৯,০০০। এই ফারাক ছয় মাস জমলে কেউ আর মনে করতে পারেন না কোথা থেকে শুরু হয়েছিল। মাসের শেষে একবার ফোনে বা দেখা করে দুজনের হিসাব মিলিয়ে নিন। ভালো পাইকার এটা পছন্দই করেন, কারণ এতে বোঝা যায় আপনি টাকার ব্যাপারে পরিষ্কার মানুষ।
খাতা বা এক্সেলে এই হিসাব রাখবেন যেভাবে
এই হিসাবের জন্য দামি কিছু লাগে না। একটা খাতা, অথবা ফোনে Google Sheets বা এক্সেল হলেই চলে। শুধু দুটো আলাদা জিনিস রাখবেন। একটা PO-র লিস্ট, আর প্রতিটা পাইকারের আলাদা একটা খাতা।
PO-র লিস্টে প্রতিটা প্রোডাক্ট লাইন এক সারিতে লিখুন। কলাম থাকবে PO নম্বর, তারিখ, সাপ্লায়ার, প্রোডাক্ট, অর্ডারের পিস, কেনা দাম, এসেছে কত পিস, আর অবস্থা (অর্ডার দেওয়া, আংশিক এসেছে, এসেছে, বন্ধ)। এই লিস্ট দেখে যেকোনো দিন বলতে পারবেন কোন মাল এখনো পথে আছে।
সাপ্লায়ারের খাতায়, খাতা হলে প্রতিটা পাইকারের জন্য আলাদা পেজ, শিট হলে আলাদা ট্যাব রাখুন। কলাম রাখুন এই পাঁচটা।
- তারিখ
- বিবরণ (PO নম্বর, কত পিস এলো, অথবা TrxID)
- মাল এসেছে (টাকা)
- পেমেন্ট (টাকা)
- বাকি
প্রথম সারিতে শুরুর বাকিটা লিখুন। এরপর প্রতিটা সারির "বাকি" ঘর হবে আগের সারির বাকি, যোগ এই সারির মাল এসেছে, বিয়োগ এই সারির পেমেন্ট। এক্সেল বা Google Sheets-এ শুরুর বাকি যদি E2 ঘরে থাকে, তাহলে E3 ঘরে লিখুন =E2+C3-D3, তারপর ঘরটা নিচের দিকে টেনে দিন। প্রতিবার নতুন সারি লিখলেই বাকিটা নিজে থেকে বের হয়ে আসবে, আলাদা করে যোগ-বিয়োগ করতে হবে না।

সপ্তাহে একদিন, ধরুন শুক্রবার বিকেলে, সব পাইকারের শেষ সারির বাকিগুলো একটা জায়গায় তুলুন, যার বাকি বেশি তাকে উপরে রেখে। এতে বুঝবেন সামনের সপ্তাহে কাকে কত দিতে হবে। কুরিয়ারের টাকা কবে আসবে সেটার সাথে মিলিয়ে পেমেন্টের দিন ঠিক করতে পারবেন। তখন আর পাইকারের ফোন এলে বুক ধড়ফড় করবে না।
শিট ঠিকঠাক চলে যতক্ষণ পাইকার দুই-তিনজন আর চালান মাসে কয়েকটা। ঝামেলা শুরু হয় যখন একই মাল তিন জায়গায় লিখতে হয়, PO-র লিস্টে, পাইকারের খাতায় আর স্টকের শিটে। একটা জায়গায় লিখতে ভুলে গেলেই তিনটা হিসাব তিন রকম দেখায়, আর তখন শিটের ওপর থেকেই ভরসা উঠে যায়।
এই জায়গায় এসে WinningSeller কাজটা অনেক হালকা করে দেয়। "সাপ্লায়ার" পেজে প্রতিটা পাইকারের পাশে লেখা থাকে "বাকি আছে" নাকি "অগ্রিম দেওয়া আছে", আর যার কাছে বেশি বাকি সে থাকে সবার উপরে। আগের পুরনো বাকিটা "শুরুর ব্যালেন্স" ঘরে একবার লিখে দিলেই খাতা চালু হয়ে যায়। "পেমেন্ট দিন" চেপে টাকা লেখার সময় ক্যাশ, bKash, Nagad নাকি ব্যাংক সেটা সিলেক্ট করেন, আর নোটে TrxID লিখে রাখতে পারেন। PO-টা প্রিন্ট করে পাইকারের হাতেও দিতে পারবেন। বাকি সব ফিচার এখানে দেখে নিন।
আজ শুরু করতে চাইলে বড় কিছু লাগবে না। আপনার প্রতিটা পাইকারকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করুন তাঁর খাতায় আপনার কত বাকি, আর নিজের মনে যা আছে তার সাথে মেলান। যেটা দুজনে মানলেন, সেটাই প্রতিটা খাতার প্রথম সারি। পরের অর্ডারটা থেকে নম্বর দিয়ে PO পাঠান। এক মাস পরে দেখবেন, পাইকারের ফোন এলে আর মাথা চুলকাতে হচ্ছে না, শুধু খাতাটা খুলে বলে দিচ্ছেন।
সাধারণ প্রশ্ন
পারচেজ অর্ডার কি?
পারচেজ অর্ডার হলো সাপ্লায়ার বা পাইকারকে দেওয়া আপনার লিখিত অর্ডার, কোন প্রোডাক্ট কত পিস কত দামে কবে লাগবে। ছোট করে একে PO বলে। এটা কেনার কথা দেওয়ার কাগজ, টাকা চাওয়ার কাগজ না।
পারচেজ অর্ডার আর ইনভয়েসের পার্থক্য কী?
পারচেজ অর্ডার বানান যিনি কিনছেন, মাল আসার আগে, কী চান সেটা জানাতে। ইনভয়েস বানান সাপ্লায়ার, মাল দেওয়ার সময় বা পরে, কত টাকা পাবেন সেটা জানাতে। পাইকারি বাজারে ইনভয়েসকে সাধারণত মেমো বা চালান বলে।
পারচেজ অর্ডার দিলেই কি পাইকারের কাছে টাকা বাকি হয়ে যায়?
না। বাকি শুরু হয় মাল হাতে আসার দিন, আর যতটা এসেছে ঠিক ততটার টাকা। ৬০ পিসের অর্ডার দিয়ে ৫০ পিস পেলে বাকি ধরবেন ৫০ পিসের দামে।
পারচেজ অর্ডারের ফরম্যাট কোথায় পাব, এক্সেলে বানানো যায়?
আলাদা ফরম্যাট কিনতে হয় না। এক্সেল বা Google Sheets-এ PO নম্বর, তারিখ, সাপ্লায়ার, প্রোডাক্ট, পরিমাণ, কেনা দাম, মোট আর অগ্রিমের ঘর রাখলেই চলে। দরকার হলে সেটা প্রিন্ট করে বা ছবি তুলে পাইকারকে পাঠান।
পাইকারকে অগ্রিম দিলে খাতায় কীভাবে লিখব?
অগ্রিমও একটা পেমেন্ট, তাই সাপ্লায়ারের খাতায় পেমেন্টের ঘরে লিখুন। মাল আসার আগে বাকির ঘর তখন মাইনাস হয়ে যায়, মানে পাইকারের কাছে আপনার টাকা জমা আছে। মাল এলে সেটা কেটে যায়।
পারচেজ অর্ডার নম্বর কীভাবে দেব?
একটা সংখ্যা থেকে সিরিয়াল ধরে দিন, যেমন ১০০১, ১০০২, ১০০৩। একটা নম্বর দুটো অর্ডারে দেবেন না, অর্ডার বাতিল হলেও না। ফোনে "১০০৪ নম্বরের মাল" বললেই দুজনে একই অর্ডারের কথা বোঝেন।
আরও পড়ুন
খেলনা ব্যবসার আইডিয়া, কোন খেলনা অনলাইনে চলে আর নিরাপত্তার নিয়ম
বাচ্চাদের খেলনা অনলাইনে বেচতে চাইলে কোন খেলনা চলে, চকবাজার থেকে প্রথম লট কীভাবে নেবেন, ২০২৬ সালে BSTI-র তালিকায় খেলনা আসার মানে কী, ব্যাটারির খেলনা চালিয়ে দেখা, মাপ বোঝানো ছবি আর না ভাঙার প্যাকিং, একটা লটের টাকার হিসাবসহ।
থ্রিফট শপিং কি? পুরনো বিদেশি জ্যাকেট-শার্টের থ্রিফট ব্যবসার নিয়ম
থ্রিফট শপিং কি, মাল কোথা থেকে আসে আর পুরনো কাপড় আমদানির নিয়ম কী বলে, গাইট খুলে বাছাই, ধোয়া আর ছবি, কন্ডিশন সত্যি করে লেখা, আর একটা গাইট থেকে এক পিসের দাম কীভাবে বের করবেন, হিসাবসহ।
অনলাইনে শাড়ির ব্যবসা, তাঁতের শাড়ি থেকে প্রথম লট, ছবি আর ফেরত
অনলাইনে শাড়ির ব্যবসা শুরু করবেন? কোন শাড়ি চলে, টাঙ্গাইলের হাট আর পাইকার, BSTI-র ২০২৬ সালের নতুন শাড়ির নিয়ম, মডেল ছাড়া শাড়ির ছবি, মাপ আর যত্নের কথা লেখা, আর একটা লটে কত থাকে, হিসাবসহ।


