এআই দিয়ে ছবি তৈরি, স্টুডিও ছাড়াই ঝকঝকে প্রোডাক্ট ছবি আর অ্যাড ভিডিও
নিজের তোলা আসল ছবি থেকে এআই দিয়ে সুন্দর ব্যাকগ্রাউন্ড, ব্যানার আর ১৫ সেকেন্ডের অ্যাড ভিডিও বানাবেন কীভাবে। কোন টুল ফ্রি, এআই-কে কী লিখে বলবেন, আর কোন ভুলে পার্সেল খুলে কাস্টমার মন খারাপ করে ফেরত দেন।

এই লেখায় যা আছে
- এআই দিয়ে প্রোডাক্টের ছবিতে কী কী করা যায়?
- কোন এআই টুল ফ্রি, কোনটায় টাকা লাগে?
- এআই দিয়ে ছবি তৈরি, ধাপে ধাপে (একটা পাঞ্জাবির উদাহরণ)
- এআই দিয়ে কিভাবে ভিডিও বানাবো, অ্যাডের ১৫ সেকেন্ড
- এআই-কে কী লিখে বললে ভালো ছবি আসে?
- এআই ছবির কোন ভুলে পার্সেল ফেরত আসে?
- ফেসবুক কি এআই ছবিতে লেবেল দেয়, অ্যাডে কি সমস্যা হয়?
- কখন এআই না, আসল ছবিই লাগবে?
এআই দিয়ে ছবি তৈরি এখন খুব সহজ। ChatGPT বা Gemini-তে নিজের তোলা প্রোডাক্টের ছবি আপলোড করে লিখে দিলেই পেছনে সুন্দর দৃশ্য, ভালো আলো আর ব্যানারের মতো সাজানো ছবি চলে আসে, স্টুডিও লাগে না। কিন্তু একটা নিয়ম মানতেই হবে। এআই বদলাবে শুধু প্রোডাক্টের চারপাশ, প্রোডাক্টটা না। রং, মাপ, কাপড়ের বুনন বা নকশা এআই-কে দিয়ে বদলালে কাস্টমার পার্সেল খুলে অন্য জিনিস পাবেন, আর সেই পার্সেল ফেরত আসবে।
রাতে ফোন স্ক্রল করতে করতে অন্য পেজের ঝকঝকে অ্যাড দেখে হয়তো আপনারও মন খারাপ হয়েছে। ওদের এত সুন্দর ছবি কোথা থেকে আসে, আর আপনার জানালার পাশে তোলা ছবিতে কেন অর্ডার আসে না, এই প্রশ্নটা অনেক সেলারকে কুরে কুরে খায়। এআই দিয়ে সেই ফারাকটা অনেকখানি কমানো যায়, আর বেশিরভাগ কাজ ফ্রিতেই হয়। নিচে টুল থেকে শুরু করে এআই-কে কী লিখে বলবেন, সবই দেখাচ্ছি। সাথে বলছি কোথায় থামতে হবে, কারণ একটা সুন্দর ছবির লোভে অ্যাডের টাকা আর কাস্টমারের বিশ্বাস দুটোই হারানো খুব সহজ।
এআই দিয়ে প্রোডাক্টের ছবিতে কী কী করা যায়?
এআই দিয়ে কাজ দুই রকম হয়, আর দুটোর ফল একদম আলাদা। এক রকম কাজে আপনি নিজের তোলা আসল ছবি দেন, আর এআই শুধু তার চারপাশটা সাজায়। আরেক রকম কাজে এআই শূন্য থেকে পুরো ছবি বানায়, প্রোডাক্টসহ। প্রথমটা সেলারের কাজের জিনিস। দ্বিতীয়টা প্রোডাক্টের ছবির জন্য বিপজ্জনক, কারণ এআই আপনার পাঞ্জাবি কখনো দেখেনি, সে একটা পাঞ্জাবি কল্পনা করে আঁকবে।
নিরাপদ কাজগুলো মনে রাখা সহজ, কারণ সবগুলোতে প্রোডাক্ট যেমন ছিল তেমনই থাকে। সাদা কাগজের ওপর তোলা ছবির পেছনে একটা ঘরের দৃশ্য, কাঠের টেবিল বা ঈদের সাজ বসানো যায়। ছবির কোণার ময়লা দাগ বা পেছনের এলোমেলো জিনিস মোছা যায়। ছোট বা একটু ঝাপসা ছবিকে বড় আর পরিষ্কার করা যায়। একটা ছবি থেকে চৌকো, লম্বা আর স্টোরির মাপে আলাদা আলাদা ভার্সন বানানো যায়। আর অফারের ব্যানারের জন্য খালি জায়গা রেখে ছবি সাজানো যায়, যেখানে পরে লেখা বসাবেন।
বিপদের কাজগুলোও পরিষ্কার করে জেনে রাখুন। ধরুন আপনার কাছে আছে মেরুন পাঞ্জাবি, আর এআই দিয়ে সেটাকে নেভি ব্লু বানিয়ে লিখে দিলেন "এই রঙেও আছে"। অথবা সুতি কাপড়কে এআই একটু বেশি চকচকে আর মোটা করে দেখাল, কিংবা প্রোডাক্টটাকে আসলের চেয়ে বড় দেখাল। কেউ কেউ আবার স্টকে নেই এমন ডিজাইন এআই দিয়ে বানিয়ে প্রি-অর্ডার নেন। সবচেয়ে খারাপ কাজটা হলো এআই দিয়ে "কাস্টমারের ছবি" বা হাসিমুখ মানুষের রিভিউ বানানো। প্রতিটা ক্ষেত্রে আপনি এমন কিছু দেখাচ্ছেন যা পার্সেলে যাবে না।
পেছনের ব্যাকগ্রাউন্ড সরিয়ে শুধু সাদা করতে চাইলে বড় এআই টুল লাগে না, ছবিটা ঠিকমতো তুললেই কাজ হয়ে যায়। ঘরে সাদা কাগজ আর জানালার আলোয় কীভাবে তুলবেন, সেটা মোবাইল দিয়ে প্রোডাক্ট ফটোগ্রাফির লেখায় বিস্তারিত আছে। এই লেখার সব কাজ শুরু হবে ওই রকম একটা পরিষ্কার আসল ছবি থেকে।
কোন এআই টুল ফ্রি, কোনটায় টাকা লাগে?
শুরুতে টাকা খরচ না করেও কাজ চালানো যায়। নিচের তথ্যগুলো অক্টোবর ২০২৬-এ এই টুলগুলোর নিজের পেজ দেখে লেখা। এরা প্রায়ই লিমিট আর প্ল্যান চেঞ্জ করে, তাই টাকা দেওয়ার আগে একবার মিলিয়ে নেবেন।
| টুল | কী কাজে ভালো | ফ্রিতে কতটুকু |
|---|---|---|
| ChatGPT | নিজের ছবি আপলোড করে ব্যাকগ্রাউন্ড আর আলো চেঞ্জ, ব্যানারের লেআউট | ছবি বানানো যায়, তবে প্রাইসিং পেজে লেখা "limited", সংখ্যা বলা নেই |
| Google Gemini | একই কাজ, নিজের ছবি দিয়ে দৃশ্য বদলানো | ছবি বানানো আর এডিট আছে, সংখ্যা বলা নেই। ভিডিও বানানো শুধু পেইড প্ল্যানে |
| Canva | ছবির সাথে লেখা, অফারের পোস্টার, এআই দিয়ে ছবি | মাসে অল্প কিছু এআই কাজ ফ্রি। Background Remover শুধু পেইড প্ল্যানে |
| CapCut | আসল ছবি আর ক্লিপ জুড়ে ছোট ভিডিও, টেমপ্লেট | সাধারণ এডিটিং ফ্রি, কিছু ফিচার শুধু Pro প্ল্যানে |
ChatGPT-র প্রাইসিং পেজে ফ্রি প্ল্যানে ছবি বানানোকে শুধু "limited" বলা হয়েছে, আর পেইড প্ল্যানে বেশি পাওয়া যায়। Google-এর "Gemini Apps limits" পেজে দেখা যায়, Google AI-র কোনো প্ল্যান ছাড়াই ছবি বানানো যায়, কিন্তু ভিডিও বানানোর ফিচার শুধু পেইড প্ল্যানগুলোতে। Gemini-র নিজের পেজে এটাও লেখা আছে যে ওদের বানানো ছবিতে একটা চোখে দেখা যায় এমন ছাপ আর একটা অদৃশ্য SynthID ছাপ থাকে, যা দিয়ে বোঝা যায় ছবিটা এআই-এর।
Canva-র এআই কাজ মাসে কয়টা ফ্রি, সেটা ওদের হেল্প পেজ "Understanding your AI usage"-এ দেওয়া থাকে, আর সংখ্যাটা মাঝে মাঝে বদলায়। তবে অফারের পোস্টার বানানোর কাজে Canva-র ফ্রি অ্যাকাউন্টেই অনেক কিছু হয়ে যায়, এআই না ছুঁয়েও।
পেইড প্ল্যানের কথা ভাববেন তখনই, যখন সপ্তাহে দশ-বারোটার বেশি প্রোডাক্টের ছবি বানাতে হয় আর ফ্রি লিমিটের জন্য কাজ বারবার আটকে যায়। এর আগে টাকা দিলে সেই টাকা মাসের পর মাস কাটবে, অথচ কাজে লাগবে অল্প। অনেক টুলের বিল ডলারে কাটে, তাই কেনার আগে দেখে নিন আপনার কার্ড ওরা নেয় কি না, আর অ্যাডের ডলার স্পেন্ডের লিমিটে হাত পড়বে কি না। একটা সহজ হিসাব করে নিন, ওই প্ল্যানের মাসিক দাম দিয়ে কয়টা অর্ডারের অ্যাড চলত। বেশিরভাগ নতুন সেলারের জন্য ফ্রি অ্যাকাউন্টই যথেষ্ট।
এআই দিয়ে ছবি তৈরি, ধাপে ধাপে (একটা পাঞ্জাবির উদাহরণ)
ধরুন আপনি ঈদের জন্য একটা মেরুন রঙের সুতি পাঞ্জাবি বিক্রি করবেন। আপনার কাছে আছে সাদা কাগজের ওপর হ্যাঙারে ঝোলানো একটা পরিষ্কার ছবি। এখন আপনি চান অ্যাডের জন্য এমন একটা ছবি, যেখানে পাঞ্জাবিটা ঈদের সকালের মতো একটা ঘরে ঝুলছে। কাজটা পাঁচ ধাপে হয়।
১. আসল ছবিটা ভালো করে তুলুন। দিনের আলোয় সামনে থেকে তুলবেন, আর পুরো পাঞ্জাবিটা যেন ফ্রেমের ভেতরে থাকে। এআই আপনার ছবির রং আর ডিটেইল দেখেই কাজ করে। ঝাপসা বা হলুদ আলোর ছবি দিলে এআই নিজের মতো রং ঠিক করতে যায়, আর তখনই পাঞ্জাবির রং বদলে যায়।
২. ছবিটা আপলোড করে এক মেসেজে কাজটা বলুন। ChatGPT বা Gemini খুলে ছবি দিন, তারপর লিখুন কী বদলাবে আর কী বদলাবে না। দ্বিতীয় অংশটাই আসল। "বদলাবে না" না লিখলে এআই প্রায়ই পাঞ্জাবিকেও একটু "সুন্দর" করে দেয়, যেমন কাপড়ে চকচকে ভাব এনে দেয় বা বোতাম অন্য রকম করে ফেলে। কী লিখবেন তার পুরো উদাহরণ নিচের একটা অংশে দিয়েছি।
৩. নতুন ছবি আর আসল ছবি পাশাপাশি রেখে জুম করে মেলান। প্রথমে দেখুন রং একই আছে কি না। তারপর একে একে বোতাম গুনুন, গলার নকশা আর এমব্রয়ডারির জায়গা দেখুন, হাতা কতটা লম্বা আর কাপড়ের বুনন কেমন সেটাও মেলান। একটাও না মিললে ছবিটা বাদ দিন। এখানে মায়া করবেন না। দেখতে যত সুন্দরই লাগুক, যে ছবিতে পাঞ্জাবি বদলে গেছে, সেটা আপনার পাঞ্জাবির ছবি না।
৪. ভুল হলে একবারে একটা জিনিস ঠিক করতে বলুন। "রং একটু হালকা হয়ে গেছে, আসল ছবির মতো গাঢ় মেরুন করো", ঠিক এভাবে এক কথায় বলুন। একসাথে পাঁচটা কথা বললে এআই একটা ঠিক করে আরেকটা নষ্ট করে। তিন-চারবার চেষ্টায়ও না হলে নতুন চ্যাট খুলে শুরু থেকে করুন।
৫. পোস্ট বা ল্যান্ডিং পেজে আসল ছবিটাও দিন। এআই ছবিটা থাকবে প্রথমে, মানুষকে থামানোর জন্য। ঠিক তার পরেই দিন সাদা কাগজের আসল ছবি আর কাপড়ের ক্লোজআপ। নিচে এক লাইন লিখে দিন, "পেছনের দৃশ্য এআই দিয়ে সাজানো, পাঞ্জাবি আসল ছবির মতোই।" এই এক লাইন লিখতে লজ্জার কিছু নেই। কাস্টমার এতে বোঝেন আপনি কিছু লুকাচ্ছেন না।

এআই দিয়ে কিভাবে ভিডিও বানাবো, অ্যাডের ১৫ সেকেন্ড
ভিডিওর বেলায় নিয়মটা আরও কড়া। এআই দিয়ে শূন্য থেকে বানানো ভিডিওতে প্রোডাক্ট প্রায়ই নড়াচড়ার সাথে সাথে একটু একটু বদলে যায়। কখনো বোতাম হারায়, কখনো নকশা গলে যায়। অ্যাডে এমন ভিডিও দিলে কাস্টমার যা দেখে অর্ডার করেন, সেটা পার্সেলে পান না। তাই অ্যাডের ভিডিও বানান নিজের আসল ছবি আর ফোনে তোলা ছোট ছোট ক্লিপ জুড়ে। এআই এখানে সাহায্য করবে সাজাতে, প্রোডাক্ট বানাতে না।
১৫ সেকেন্ডের একটা অ্যাড ভিডিও তিন ভাগে সাজান। প্রথম দুই-তিন সেকেন্ডে এমন কিছু দেখান যাতে স্ক্রল করা আঙুল থামে, যেমন এআই দিয়ে সাজানো সেই ঈদের সকালের ছবিটা, বা কাপড়ের ওপর আলো পড়ার একটা ক্লোজআপ। পরের সাত সেকেন্ডে আসল জিনিস দেখান। কাপড় হাতে নিয়ে বুনন, বোতাম, গলার কাজ, আর একজন মানুষের গায়ে পরা অবস্থা, সব নিজের তোলা ক্লিপ। শেষ পাঁচ সেকেন্ডে দাম, ডেলিভারি চার্জ আর অর্ডার করার উপায় বড় লেখায় দিন। অনেকে শব্দ বন্ধ রেখে ভিডিও দেখেন, তাই আসল কথাগুলো লেখাতেও থাকা চাই।
জোড়া দেওয়ার কাজটা CapCut-এর মতো এডিটরে ফ্রিতেই হয়। প্রতিটা ক্লিপ দুই-তিন সেকেন্ডের বেশি লম্বা রাখবেন না, নাহলে দর্শক বিরক্ত হয়ে সরে যান। CapCut-এ ক্লিপ কাটা, বাংলা লেখা আর সাবটাইটেল বসানোর পুরো ধাপ ফেসবুক রিলস দিয়ে প্রোডাক্ট ভিডিও বানানোর লেখায় দেওয়া আছে, এখানে আর আলাদা করে বলছি না।
গান বসানোর আগে একটা জিনিস অবশ্যই জেনে রাখুন। CapCut-এর Materials License Agreement-এ লেখা আছে, সাধারণ গান বা "Sounds" ব্যবসার কাজে দেওয়া যাবে না। ব্যবসার জন্য ওদের আলাদা "Commercial Sounds" আছে, কিন্তু সেগুলোও শুধু CapCut, TikTok আর TikTok for Business-এর ভেতরে দেওয়ার অনুমতি। মানে CapCut-এর গানসহ ভিডিও Facebook অ্যাডে চালাতে হলে আলাদা লাইসেন্স লাগবে। গান দিতেই চাইলে Facebook-এর নিজের লাইব্রেরি থেকে দিন। আরও সহজ হলো নিজের গলায় দুই লাইন বলে দেওয়া, যেমন "ঈদের নতুন সুতি পাঞ্জাবি, সারা দেশে ক্যাশ অন ডেলিভারি।" অচেনা গানের চেয়ে সেলারের নিজের গলা অনেক সময় বেশি ভরসা জাগায়, কারণ কাস্টমার বোঝেন ওপাশে একজন আসল মানুষ আছেন।

এআই-কে কী লিখে বললে ভালো ছবি আসে?
এআই-কে যা লিখে কাজ দেন, সেটাকে প্রম্পট বলে। ভালো প্রম্পটে চারটা কথা থাকে। প্রথমে বলুন ছবিতে কোন প্রোডাক্ট আছে। তারপর লিখুন পেছনে কী দৃশ্য চান আর আলো কেমন হবে। শেষে পরিষ্কার করে লিখুন কী একদম বদলানো যাবে না, কারণ এই লাইনটা না থাকলেই এআই প্রোডাক্টে হাত দেয়। এর বাইরে ছবির মাপটাও বলে দিন, কারণ ফেসবুক ফিডের জন্য লম্বা ছবি লাগে আর প্রোডাক্ট লিস্টের জন্য চৌকো।
বাংলায় লিখলেও এআই বোঝে। পাঞ্জাবির জন্য এমন লিখতে পারেন।
"এই ছবির পাঞ্জাবিটা একটা কাঠের আলমারির পাশে হ্যাঙারে ঝুলিয়ে দাও। পেছনে একটা পরিষ্কার ঘর, জানালা দিয়ে সকালের নরম আলো আসছে। পাঞ্জাবির রং, বোতাম, গলার নকশা, কাপড়ের বুনন আর মাপ একদম আগের মতো রাখবে, কিছুই বদলাবে না। ছবির মাপ হবে ৪:৫, ছবিতে কোনো লেখা দেবে না।"
অনেক সময় ইংরেজিতে লিখলে ফল একটু বেশি নিখুঁত আসে। একই কথা ইংরেজিতে এরকম।
"Place this exact panjabi on a hanger beside a wooden wardrobe in a clean, bright room with soft morning light from a window. Keep the colour, buttons, collar design, fabric texture and size exactly as in the photo. Do not change the product. Portrait 4:5. No text in the image."
মধুর বয়ামের জন্য পেছনটা হতে পারে রান্নাঘরের তাক বা কাঠের টেবিল, পাশে একটা চামচ। তখন প্রম্পটে লিখুন, "বয়ামের লেবেল, ঢাকনার রং আর মধুর রং একদম আগের মতো রাখবে।" মধুর রং দেখেই অনেক কাস্টমার খাঁটি না ভেজাল আন্দাজ করেন, তাই ওই রং এআই একটু উজ্জ্বল করে দিলেও সমস্যা।
প্রম্পটে "ছবিতে কোনো লেখা দেবে না" কেন লিখলাম, সেটা বলি। এআই ছবির ভেতরে বাংলা লেখা বসাতে গেলে প্রায়ই অক্ষর ভেঙে যায় বা বানান ভুল আসে। ভুল বানানের অফার দেখলে কাস্টমার পেজটাকে হালকা চোখে দেখেন। তাই ছবি এআই দিয়ে বানান, আর লেখা বসান Canva বা অন্য এডিটরে, নিজের হাতে।
এআই ছবির কোন ভুলে পার্সেল ফেরত আসে?
ক্যাশ অন ডেলিভারিতে কাস্টমার টাকা দেন পার্সেল হাতে নিয়ে, অনেকে খুলেও দেখেন। ছবির সাথে না মিললে ওখানেই পার্সেল ফেরত দেন। এআই ছবিতে এমনটা সবচেয়ে বেশি ঘটে পাঁচটা ভুলে। সবচেয়ে কমন হলো রং আসলের চেয়ে উজ্জ্বল হয়ে যাওয়া বা অন্য শেডে চলে যাওয়া। এর পরেই আসে সুতি কাপড়কে সিল্কের মতো চকচকে করে ফেলা। কখনো এআই প্রোডাক্টটাকে আসলের চেয়ে বড় বা ভারী দেখায়। এআই মডেলের গায়ে পরানো ছবিতে কাপড়ের ফিটিং আসলের মতো বসে না, ওটাও বড় ঝামেলা। আর মাঝে মাঝে এআই নিজে থেকেই পাশে একটা সুন্দর গিফট বক্স বসিয়ে দেয়, যেটা আপনার প্যাকেটে নেই।
এবার দেখি এর দাম কত। নিচের সংখ্যাগুলো একটা উদাহরণ, কোনো দোকানের আসল হিসাব না। নিজের দাম বসিয়ে একবার মিলিয়ে নিন।
ধরুন ওই পাঞ্জাবি একটা ডেলিভারি হলে অ্যাডের খরচ বাদ দিয়ে আপনার হাতে থাকে ৩৫০ টাকা। একটা পার্সেল ফেরত এলে যায় যাওয়ার কুরিয়ার চার্জ ধরুন ১৩০ টাকা, ফেরতের চার্জ ধরুন ৬৫ টাকা, প্যাকেট ২০ টাকা, আর ওই অর্ডারটা আনতে অ্যাডে যা গেছে, ধরুন ২০০ টাকা। মোট ৪১৫ টাকা।
এখন ধরুন ১০০টা অর্ডারে আগে ফেরত আসত ১০টা। এআই ছবিতে রং একটু বেশি গাঢ় আর কাপড় একটু বেশি চকচকে দেখানোয় এখন আসছে ২০টা। বাড়তি ১০টা ফেরতে গেল ১০ × ৪১৫ = ৪,১৫০ টাকা। ওটা পুষিয়ে নিতে প্রায় ১২টা পার্সেল ডেলিভারির পুরো লাভ লাগবে। মানে ১২ জন খুশি কাস্টমারের লাভ চলে গেল একটা "সুন্দর" ছবির জন্য।
টাকার চেয়েও বেশি যায় বিশ্বাস। যিনি পার্সেল খুলে ঠকে গেছেন বলে মনে করেন, তিনি পেজে কমেন্ট করেন "ছবির সাথে কোনো মিল নেই"। পরের দশজন কাস্টমার অর্ডারের আগে ওই কমেন্টটাই পড়েন, আর সেই কমেন্ট মুছে দিলেও মানুষের মনের সন্দেহটা মোছে না। ছবি ছাড়া আর কোন কোন কারণে পার্সেল ফেরত আসে আর কীভাবে কমাবেন, সেটা ফেক অর্ডার আর কুরিয়ার রিটার্ন কমানোর লেখায় এক জায়গায় পাবেন।
ফেসবুক কি এআই ছবিতে লেবেল দেয়, অ্যাডে কি সমস্যা হয়?
হ্যাঁ, দেয়। Meta জুলাই ২০২৪ থেকে এই লেবেলের নাম রেখেছে "AI info"। Meta-র নিউজরুমের লেখা অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে কোনো ছবি শুধু এআই দিয়ে এডিট করা হলে লেবেলটা পোস্টের মেনুর ভেতরে থাকে। আর পুরো ছবিটাই এআই দিয়ে বানানো হলে লেবেলটা সবার চোখের সামনে দেখায়।
অ্যাডের নিয়ম Meta-র হেল্প পেজে আলাদা লেখা আছে। Meta-র নিজের অ্যাড টুলে ব্যাকগ্রাউন্ড বা ছবি বানিয়ে বড় কোনো চেঞ্জ করলে, অথবা অন্য কোম্পানির এআই টুলে বানানো বা এডিট করা ছবি Meta ধরতে পারলে, অ্যাডে "AI info" লেবেল বসে। লেবেলটা সাধারণত অ্যাডের ডান কোণার তিন ডটের মেনুতে থাকে, কখনো "Sponsored" লেখার পাশে। শুধু ছবির মাপ বদলানো বা রং ঠিক করার মতো ছোট কাজে লেবেল বসে না। এই নিয়মগুলো Meta মাঝে মাঝে বদলায়, তাই বড় বাজেটের অ্যাডের আগে Meta-র বিজনেস হেল্প সেন্টারে "AI info" লিখে খুঁজে একবার পড়ে নিন।
অন্য টুলের ছবি Meta চেনে কীভাবে? OpenAI ২০২৪ সালে জানিয়েছে, ChatGPT-তে বানানো ছবির ভেতরে C2PA নামের একটা স্ট্যান্ডার্ড মেনে কিছু তথ্য জুড়ে দেওয়া থাকে, যা দেখে বোঝা যায় ছবিটা ওদের টুলে বানানো। Gemini-র ছবিতে আছে SynthID। তাই ধরে নিন, এআই দিয়ে বড় চেঞ্জ করা ছবিতে লেবেল আসতেই পারে। এটা লুকানোর চেষ্টা না করে নিজেই পোস্টে লিখে দিন পেছনটা এআই দিয়ে সাজানো।
লেবেল থাকলে কি অ্যাড কম দেখায়? Meta-র এই পেজগুলোতে এমন কিছু বলা নেই, শুধু লেবেল দেওয়ার কথা বলা আছে। আসল ঝুঁকি অন্য জায়গায়। ছবি দেখে অর্ডার করে কাস্টমার অন্য জিনিস পেলে অ্যাডে খারাপ ফিডব্যাক আর রিপোর্ট আসে। প্রতারণার অভিযোগ বেশি হলে পেজ বা অ্যাড অ্যাকাউন্টে বিপদ নামে। তাই লেবেল নিয়ে ভয় না পেয়ে ভয় পান প্রোডাক্ট বদলে দেওয়াকে।
Meta-র Ads Manager-এর ভেতরেও এখন এআই আছে। Meta মে ২০২৪-এ জানিয়েছে, Advantage+ creative-এ প্রোডাক্টের ছবির চারপাশে নতুন ব্যাকগ্রাউন্ড বানানো আর ছবিকে Reels বা Feed-এর মাপে বাড়িয়ে নেওয়ার ফিচার আছে। অ্যাড পাবলিশ করার আগে এই অপশনগুলো চালু থাকলে প্রিভিউতে একবার দেখে নিন, প্রোডাক্টটা যেন আগের মতোই থাকে।
কখন এআই না, আসল ছবিই লাগবে?
কিছু জায়গায় এআই-এর হাত না দেওয়াই ভালো, যত সুন্দরই লাগুক। মোটা দাগে নিয়মটা হলো, কাস্টমার যে জিনিস দেখে কেনার সিদ্ধান্ত নেন, সেই জিনিসের ছবি হবে আসল।
- কাপড় আর জুতার রং, মাপ আর গায়ে পরা ছবি। কাপড়ে রঙের অমিল আর সাইজের ভুলেই সবচেয়ে বেশি ফেরত আসে। গায়ে পরা ছবি আসল মানুষকে পরিয়ে তুলুন।
- কসমেটিকসের শেড আর খাবারের রং। লিপস্টিকের শেড, মধু বা ঘি-র রং আর ঘনত্ব দেখে মানুষ সিদ্ধান্ত নেন। এখানে এআই একটু উজ্জ্বল করলেই সেটা মিথ্যা হয়ে যায়।
- কাপড়ের বুনন আর ক্লোজআপ। ক্লোজআপ ছবির কাজই হলো আসল জিনিস কাছ থেকে দেখানো। ওটা এআই দিয়ে বানালে ক্লোজআপের মানেই থাকে না।
- প্যাকেটে কী আসবে। বক্স, বয়াম আর সাথের জিনিস যেভাবে পার্সেলে যাবে, ছবিতেও ঠিক সেভাবেই দেখান।
- কাস্টমারের ছবি আর রিভিউ। এগুলো দেবেন শুধু আসল কাস্টমারের কাছ থেকে নিয়ে, তাঁর অনুমতি নিয়ে।
আর যে প্রোডাক্ট এখনো হাতে আসেনি, তার ছবি এআই দিয়ে বানিয়ে অর্ডার নেবেন না। সাপ্লায়ারের নমুনা হাতে নিয়ে আসল ছবি তুলে তবেই অ্যাড দিন। স্টক আসার আগে অর্ডার নিয়ে পরে অন্য রকম মাল এলে আপনাকে একসাথে অনেক কাস্টমারকে ফোন দিয়ে মাফ চাইতে হবে।
এআই সবচেয়ে বেশি কাজে আসে অ্যাডের প্রথম ছবিতে, অফারের ব্যানারে আর ল্যান্ডিং পেজের ওপরের বড় ছবিতে। মানে যেখানে কাজটা মানুষকে থামানো। আর যেখানে কাজটা মানুষকে বিশ্বাস করানো, সেখানে আসল ছবি। এই ভাগটা মাথায় রাখলে এআই আপনার খরচ বাঁচাবে, ঝামেলা বাড়াবে না।
আজই একটা কাজ করে দেখুন। আপনার সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া প্রোডাক্টের একটা পরিষ্কার আসল ছবি নিন, ওপরের প্রম্পটটা নিজের প্রোডাক্টের নাম বসিয়ে ChatGPT বা Gemini-তে দিন, তারপর আসলটার সাথে জুম করে মিলিয়ে দেখুন। যেদিন প্রথম সুন্দর ছবিটা হাতে পাবেন আর দেখবেন প্রোডাক্টটা একদম আপনারটাই আছে, সেদিন বুঝবেন স্টুডিওর টাকা ছাড়াও অ্যাড সুন্দর করা যায়।
ছবি তৈরি হয়ে গেলে সেগুলো এক জায়গায় সাজিয়ে অর্ডার নেওয়ার পেজও লাগে। WinningSeller-এ একটা প্রোডাক্টের জন্য AI দিয়ে ৫ মিনিটে ল্যান্ডিং পেজ বানানো যায়, তারপর সেখানে এআই দিয়ে সাজানো ছবিটা ওপরে আর আসল ছবিগুলো নিচে নিজের হাতে বসিয়ে দিতে পারেন। প্রতিটা লেখা আর বাটনের রং-সাইজও নিজে চেঞ্জ করা যায়, আর আপনার তোলা ভিডিও YouTube থেকে পেজে বসানো যায়। কুরিয়ার, ফ্রড চেক আর বাকি কাজগুলো কীভাবে হয়, সেটা WinningSeller-এর সব ফিচারের পেজে দেখে নিতে পারেন।
সাধারণ প্রশ্ন
এআই দিয়ে কি ফ্রিতে প্রোডাক্টের ছবি বানানো যায়?
হ্যাঁ, ChatGPT আর Gemini দুটোরই ফ্রি অ্যাকাউন্টে ছবি বানানো আর নিজের ছবি এডিট করা যায়। তবে দিনে কয়টা ছবি পাবেন সেটা সীমিত, আর দুই কোম্পানির কেউই ফ্রি প্ল্যানের নির্দিষ্ট সংখ্যা লিখে দেয়নি। দুই-চারটা প্রোডাক্টের কাজ সাধারণত ফ্রিতেই হয়ে যায়, লিমিট শেষ হলে পরের দিন আবার চেষ্টা করুন।
চ্যাটজিপিটি দিয়ে ছবি এডিট কীভাবে করব?
নিজের তোলা প্রোডাক্টের ছবিটা ChatGPT-তে আপলোড করুন, তারপর এক মেসেজে লিখুন কী বদলাবেন আর কী একদম বদলাবেন না। যেমন, "পেছনে একটা কাঠের টেবিল আর জানালার আলো দাও, কিন্তু পাঞ্জাবির রং, বোতাম আর নকশা হুবহু রাখো।" ছবি এলে জুম করে আসলটার সাথে মিলিয়ে নিন, কিছু বদলে গেলে সেই ছবি বাদ দিন।
এআই দিয়ে বানানো ছবি দিয়ে কি ব্যবসা করা যায়, কপিরাইটে আটকাবে?
OpenAI-র Terms of Use-এ লেখা আছে, আউটপুটের মালিকানা ইউজারের, তাই ChatGPT-র ছবি নিজের পেজে আর অ্যাডে দিতে বাধা নেই। তবে অন্যের ছবি বা অন্য ব্র্যান্ডের লোগো ঢুকিয়ে বানালে সেই দায় আপনার। আর CapCut-এর গান অ্যাডে দেওয়ার আগে লাইসেন্স দেখে নিন, সেটা ওপরে ভিডিওর অংশে বলেছি।
এআই ছবি দিলে কি ফেসবুক অ্যাড বন্ধ করে দেয়?
Meta-র পেজে এআই ছবির জন্য "AI info" লেবেল দেওয়ার কথা বলা আছে, শুধু এআই দিয়ে বানানো বলে অ্যাড আটকানোর কথা বলা নেই। ঝামেলা হয় যখন ছবিটা কাস্টমারকে ভুল জিনিস দেখায়। তখন খারাপ ফিডব্যাক আর রিপোর্ট আসে, আর সেটা পেজের জন্য বিপদ।
এআই দিয়ে কি মডেলের গায়ে পরা ছবি বানানো ঠিক?
না করাই ভালো। এআই মডেলের গায়ে কাপড় কেমন বসবে সেটা আন্দাজে আঁকে, তাই ফিটিং আর লম্বা-চওড়া আসলের সাথে মেলে না। সাইজের ভুলে কাপড় ফেরত আসে সবচেয়ে বেশি, তাই গায়ে পরা ছবি আসল মানুষকে পরিয়েই তুলুন।
এআই দিয়ে কিভাবে ভিডিও বানাবো, ফ্রিতে হয়?
সবচেয়ে নিরাপদ রাস্তা হলো নিজের আসল ছবি আর ছোট ক্লিপ CapCut-এর মতো এডিটরে সাজিয়ে ১৫ সেকেন্ডের ভিডিও বানানো, এটা ফ্রিতেই হয়। Google-এর Gemini লিমিট পেজে ভিডিও বানানোর ফিচার শুধু পেইড প্ল্যানে দেখানো আছে। পুরো ভিডিও এআই দিয়ে বানালে প্রোডাক্ট প্রায়ই আসলের মতো থাকে না, তাই অ্যাডে সেটা না দেওয়াই ভালো।
আরও পড়ুন
ওয়েবসাইটের মেনু আর ফুটারে কী রাখবেন? অনলাইন দোকানের জরুরি পেজসহ
ওয়েবসাইটের মেনুতে কয়টা লিংক রাখবেন, হেডারে কল আর WhatsApp বাটন কেন, ফুটারে ঠিকানা আর ট্রেড লাইসেন্স নম্বর কোথায় বসবে, আর About, যোগাযোগ, ডেলিভারি ও রিটার্নের পেজে কী লিখবেন। ফোনে দোকান খুলে এক ঘণ্টায় গুছিয়ে নেওয়ার পুরো নিয়ম।
গুগল সার্চ কনসোল কি? দোকানের ওয়েবসাইট গুগলে তুলবেন যেভাবে
গুগল সার্চ কনসোল হলো Google-এর ফ্রি টুল, যেখানে দেখা যায় কোন সার্চে আপনার দোকান আসছে আর কোন পেজ গুগলের লিস্টে আছে। নিজের ডোমেইনে DNS দিয়ে মালিকানা প্রমাণ, sitemap.xml সাবমিট, URL Inspection, "Not indexed" দেখলে কী করবেন, আর কোন পথ দোকানে আসলে কাজ করে না।
বিজনেস ক্যাপশন, ফেসবুকে সেল পোস্টে কী লিখলে অর্ডার আসে
ছবি সুন্দর, তবু ইনবক্সে সবাই শুধু দাম জিজ্ঞেস করে? সেল পোস্টের প্রথম দুই লাইনে কী লিখবেন, ক্যাপশনে কোন পাঁচটা কথা থাকতেই হবে, দাম লিখবেন কি না, নতুন মাল, অফার, স্টকে ফেরা আর রিভিউর চারটা নমুনা, আর কোন কথায় পোস্ট রিপোর্ট খায়।


