কেকের ব্যবসা কিভাবে শুরু করবো? ঘরে বানিয়ে অর্ডার নেওয়া থেকে ডেলিভারি
ঘরে কেক বানান, আত্মীয়রা বলেন বিক্রি করো? প্রথম মাসে কয়টা আইটেম রাখবেন, রান্নাঘরে কী কী লাগে, এক কেজি কেকের আসল খরচ আর দাম, কত আগে অর্ডার আর কত অগ্রিম নেওয়া নিয়মে চলে, রেজিস্ট্রেশন, গরমে ক্রিম বাঁচিয়ে ডেলিভারি আর কাস্টম ডিজাইনের অর্ডার।

এই লেখায় যা আছে
কেকের ব্যবসা কিভাবে শুরু করবো, এর সহজ উত্তর হলো ছোট করে, নিজের শহরে, তিন-চারটা কেক দিয়ে। ঘরের রান্নাঘরে যে কেক আপনি সবচেয়ে ভালো বানান, সেগুলোর ছবি তুলে ফেসবুক পেজে দিন, অর্ডার নিন অন্তত এক দিন আগে, আর ডেলিভারি দিন নিজের এলাকায়, একই দিনে। প্রথম মাসে লক্ষ্য লাভ না, লক্ষ্য হলো জানা যে আপনার কেক মানুষ কত দামে কিনছেন, আর সময়মতো পৌঁছাতে পারছেন কি না।
শুরুটা অনেকের এমন হয়। ভাগ্নির জন্মদিনে একটা কেক বানালেন, সবাই খেয়ে বললেন, "এত ভালো, বেচো না কেন?" তারপর এক শুক্রবার সন্ধ্যায় পরিচিত একজন ফোন দিলেন, "কাল একটা দুই পাউন্ডের চকলেট কেক দিতে পারবা?" ঠিক তখনই প্রশ্নগুলো আসে। কত দাম চাইব, অগ্রিম নেব কি না, কেক তো পথে গলে যাবে। নিচে এই সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি, এক কেজি কেকের খরচের পুরো হিসাবসহ।
কেকের ব্যবসা কিভাবে শুরু করবো, প্রথম মাসে কী ঠিক করবেন
প্রথম মাসে চারটা জিনিস ঠিক করুন, আর বাকি সব পরে। কোন কেক বেচবেন, কোন এলাকায় ডেলিভারি দেবেন, সপ্তাহে কয়টা অর্ডার নিতে পারবেন, আর কোন দিন বন্ধ।
কেকের লিস্ট ছোট রাখুন। একটা ভ্যানিলা, একটা চকলেট, একটা ফলের বা রেড ভেলভেট, আর নাম লেখার সুযোগ। প্রতিটা দুই সাইজে, আধা কেজি আর এক কেজি। যত কম আইটেম, তত কম উপকরণ ফ্রিজে আটকে থাকে, আর তত তাড়াতাড়ি প্রতিটা কেক হাতে বসে যায়। নতুন বেকাররা প্রায়ই প্রথম সপ্তাহেই কাপকেক, ব্রাউনি, কুকিজ, পুডিং সব তুলে দেন, তারপর একই দিনে চার রকম অর্ডার এলে রাত দুইটা পর্যন্ত রান্নাঘরে থাকেন।
এলাকা ঠিক করুন ডেলিভারির সময় ধরে, দূরত্ব ধরে না। ঢাকায় পাঁচ কিলোমিটার পথ বিকেলে এক ঘণ্টা নিতে পারে, আর এক ঘণ্টা গরম রাস্তায় ক্রিমের কেক কষ্ট পায়। শুরুতে নিজের বাসা থেকে চল্লিশ মিনিটের পথের মধ্যে থাকুন। আর সপ্তাহে কয়টা কেক পারবেন, সেটা নিজের রান্নাঘরে গুনে দেখুন। একটা ওভেনে একসাথে কয়টা প্যান ঢোকে, একটা কেক ঠান্ডা হতে কত সময় নেয়, আর সাজাতে কত। তার চেয়ে বেশি অর্ডার এলে "এই দিনের বুকিং শেষ" বলা শিখুন, সেটা খারাপ কেক দেওয়ার চেয়ে অনেক ভালো।
এই ব্যবসা কেন শুধু নিজের শহরে চলে, আর অন্য ঘরে-বানানো ব্যবসার সাথে কোথায় আলাদা, সেটা অনলাইন ব্যবসার আইডিয়ার লেখায় ছোট করে আছে।
কেকের ব্যবসা করতে কি কি লাগে, রান্নাঘরের খরচ
জিনিসের লিস্টে প্রথম ওভেন। গ্যাসের চুলার ওপর হাঁড়িতে কেক হয়, কিন্তু বিক্রির কেকে প্রতিবার একই ফল চাই, সেটা ওভেন ছাড়া কঠিন। ইলেকট্রিক ওভেন কিনলে ভেতরে আলাদা একটা ওভেন থার্মোমিটার রাখুন। অনেক ঘরোয়া ওভেনের নব যা বলে, ভেতরের তাপ তার চেয়ে কম-বেশি থাকে, আর সেটা না জেনে প্রথম মাসে অনেক কেক মাঝখানে বসে যায়।
এরপর একটা ডিজিটাল ওজন মাপার যন্ত্র। কাপ দিয়ে মেপে বানানো কেক একেক দিন একেক রকম হয়, গ্রাম দিয়ে মাপলে প্রতিবার একই। প্রতিটা রেসিপি গ্রামে লিখে একটা খাতায় রাখুন। হ্যান্ড মিক্সার, দুই-তিন সাইজের প্যান, পার্চমেন্ট কাগজ, পাইপিং ব্যাগ আর কয়েকটা নজল, স্প্যাচুলা আর একটা ঘোরানো কেক স্ট্যান্ড। আর কেক বোর্ড আর বক্স, যেগুলো নিয়ে নিচে আলাদা কথা আছে।
ফ্রিজের জায়গা নিয়ে আগে পরিবারের সাথে কথা বলে নিন। ক্রিমের কেক সাজানোর আগে আর পরে ঠান্ডা করতে হয়, আর একটা এক কেজির বক্স ফ্রিজের পুরো একটা তাক নেয়। ঈদের আগে মাছ-মাংসে ভরা ফ্রিজে কেকের জায়গা না পেলে অর্ডার ফেরত দিতে হয়। অনেকে কয়েক মাস পরে একটা ছোট আলাদা ফ্রিজ কেনেন, শুরুতে না হলেও চলে।
একটা জিনিস প্রায় সবাই শুরুতে বাদ দেন, সেটা পরিষ্কার রাখার নিয়ম। কেক বানানোর সময় চুল বাঁধা বা ক্যাপ, হাত ধোয়া, আর কাঁচা মাংস-মাছ কাটার বোর্ড আর ছুরি কেকের কাজে না লাগানো। পরে রেজিস্ট্রেশনের সময় কেউ রান্নাঘর দেখতে এলে এই অভ্যাসগুলোই কাজে আসে, আর তার চেয়েও বড় কথা, একটা বাচ্চার জন্মদিনে কেউ অসুস্থ হলে সেই দায় কোনো রিফান্ডে মেটে না।

এক কেজি কেকের দাম কত রাখবেন (উদাহরণ)
কেকের দাম ঠিক করার সময় বেশিরভাগ মানুষ শুধু উপকরণ গোনেন। ময়দা, চিনি, ডিম, ক্রিম, এই। কিন্তু বক্স, বোর্ড, ওভেনের বিদ্যুৎ, মাঝে মাঝে নষ্ট হওয়া একটা কেক, অ্যাড আর আপনার নিজের তিন ঘণ্টা, এগুলো বাদ পড়লে মাস শেষে হাতে কিছু থাকে না, শুধু ক্লান্তি থাকে।
উদাহরণ। এখানে প্রতিটা দাম কল্পনার, কোনো বাজারের রেট না। আপনার এলাকার দাম বসিয়ে আবার করুন। ধরুন এক কেজির একটা সাধারণ চকলেট ক্রিম কেক।
| খরচের খাত | টাকা |
|---|---|
| স্পঞ্জের উপকরণ (ময়দা, চিনি, ডিম, তেল, দুধ, কোকো) | ২৮০ |
| ক্রিম আর সাজানোর জিনিস | ২৩০ |
| কেক বোর্ড আর বক্স | ৭০ |
| গ্যাস আর বিদ্যুৎ | ৪০ |
| নষ্ট হওয়া কেকের ভাগ (ধরুন বিশটায় একটা) | ৩০ |
| অগ্রিম নেওয়ার অনলাইন চার্জ | ১০ |
| অ্যাড, প্রতি অর্ডারে | ১২০ |
| মোট খরচ | ৭৮০ |
এবার ধরুন দাম রাখলেন ১,২০০ টাকা, ডেলিভারি চার্জ আলাদা। হাতে থাকে ১,২০০ − ৭৮০ = ৪২০ টাকা। শুনতে ভালো, কিন্তু এবার আপনার সময়টা ধরুন। স্পঞ্জ বানানো, ঠান্ডা করা, কাটা, ক্রিম, সাজানো আর বক্স করা মিলিয়ে একটা কেকে তিন ঘণ্টা গেলে আপনার প্রতি ঘণ্টার আয় ৪২০ ÷ ৩ = ১৪০ টাকা। এটাই আসল সংখ্যা, যেটা দিয়ে ঠিক করবেন দাম বাড়াবেন কি না।
নাম লেখা বা বিশেষ নকশার কেকে বাড়তি এক ঘণ্টা গেলে সেই ঘণ্টার দাম আলাদা করে ধরুন, ধরুন ২০০ টাকা। কাস্টম কেকের দাম সাধারণ কেকের সমান রাখলে আপনি আসলে সবচেয়ে কঠিন কাজটা সবচেয়ে কম দামে করছেন। আর পুরনো কাস্টমার নিজে থেকে আবার অর্ডার দিলে অ্যাডের ১২০ টাকা লাগে না, তখন একই কেকে হাতে থাকে ৫৪০ টাকা। কেকের ব্যবসায় দ্বিতীয় বছরের লাভটা মূলত এখান থেকেই আসে।

অর্ডার কত আগে নেবেন, অগ্রিম কত
সাধারণ কেকের জন্য একটা কাট-অফ ঠিক করুন, যেমন "আগের দিন সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে অর্ডার"। সেটা পেজের ওপরে আর প্রতিটা কেকের পোস্টে লিখে রাখুন। কাট-অফ না থাকলে রাত এগারোটায় মেসেজ আসবে, "কাল সকাল দশটায় একটা কেক লাগবে", আর আপনি না বলতে পারবেন না। নাম লেখা বা বিশেষ নকশার কেকে দুই-তিন দিন আগে নিন, কারণ ফন্ডান্টের নকশা বা ছবির প্রিন্ট আগে থেকে বানাতে হয়।
এবার অগ্রিমের কথা, আর এখানে নিয়মটা জানা জরুরি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১ জারির সময় বাংলা ট্রিবিউন ৬ জুলাই ২০২১-এ নির্দেশিকার মূল কথাগুলো ছেপেছিল। নির্দেশিকার ৩.২.১০ অনুচ্ছেদের কথা সেখানে আছে, পুরো টাকা অগ্রিম নেওয়া যায় তখনই, যখন টাকা পাওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জিনিসটা ডেলিভারি ম্যান বা কুরিয়ারের হাতে দিতে পারবেন। না পারলে দামের ১০%-এর বেশি অগ্রিম নেওয়া যায় না, আর বেশি নিতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত এসক্রো সার্ভিস দিয়ে। কেক অর্ডারে বানানো হয়, তাই চার দিন আগের বুকিংয়ে পুরো টাকা নিয়ে নেওয়া এই নিয়মের সাথে মেলে না।
তাহলে কেকের জন্য সহজ একটা রাস্তা দাঁড়ায়। বুকিংয়ের সময় দামের ১০% পর্যন্ত অগ্রিম নিন, ১,২০০ টাকার কেকে সর্বোচ্চ ১২০ টাকা। এতে নাম-নকশার কাজ শুরু করার একটা ভরসা থাকে, আর কেউ মজা করে অর্ডার দেন না। বাকি টাকা নিন ডেলিভারির সময়, অথবা ডেলিভারির আগের দিন একটা পেমেন্ট লিংক পাঠিয়ে, যখন টাকা পাওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই কেক রাইডারের হাতে যাবে। বিকাশ পেমেন্ট লিংক কীভাবে বানাবেন, ভুয়া স্ক্রিনশট কীভাবে ধরবেন, আর কাস্টমার বাতিল করলে রিফান্ড কীভাবে দেবেন, সব আছে বিকাশ পেমেন্ট লিংকের লেখায়। এটা আইনের পরামর্শ না, একজন সেলারের হিসাব। বড় অঙ্কের কর্পোরেট অর্ডারে আগে একজন আইনজীবী বা নিজের পেমেন্ট গেটওয়ের সাথে কথা বলে নিন।
অর্ডারগুলো ইনবক্সে ছড়িয়ে থাকলে কোন কেক কবে, কোন নাম, কত অগ্রিম এলো, মেলাতে গিয়ে রাত পার হয়। WinningSeller-এ ফোন বা ইনবক্সের অর্ডার "নতুন অর্ডার" দিয়ে ম্যানুয়ালি তুলে রাখা যায়, নোটে নামের বানান আর ডেলিভারির সময় লিখে। অর্ডারের পেজ থেকে কত টাকার পেমেন্ট লিংক চান লিখে "লিংক বানান" চাপলে লিংক তৈরি হয়, লিংকটা তিন দিন চলে, আর টাকা এলে অর্ডারে অগ্রিমটা নিজে বসে যায়। দোকানের নিজের অর্ডার ফর্মে নিজের bKash বা SSLCommerz অ্যাকাউন্ট জুড়ে "অনলাইন পেমেন্ট" চালু করে নিলে কাস্টমার পুরো টাকা দেবেন, শুধু ডেলিভারি চার্জ দেবেন, নাকি নির্দিষ্ট একটা অগ্রিম দেবেন, সেটা আপনি ঠিক করে দিতে পারেন। আর সেটিংসের "ডেলিভারি চার্জ" অংশে নিজের এলাকাগুলো আলাদা চার্জে লিখে রাখা যায়, যেমন "দুই কিলোমিটারের মধ্যে" আর "তার বাইরে"। অন্য ফিচারগুলো দেখে নিতে পারেন ফিচারের পেজে।
লাইসেন্স আর লেবেল
কাগজের কাজ শুরু করুন ট্রেড লাইসেন্স দিয়ে, খাবার বানানো বা বেচার ধরন উল্লেখ করে। এরপর নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। The Daily Star বাংলার ২২ জুলাই ২০২৬-এর খবর অনুযায়ী ১৬ জুলাই "নিরাপদ খাদ্য (নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং) প্রবিধানমালা" গেজেট হয়েছে। সেখানে রেস্তোরাঁ, বেকারি, পেস্ট্রি শপ আর ক্যাটারিংকে রেজিস্ট্রেশন নিতে বলা হয়েছে, বেশিরভাগ ছোট ব্যবসার জন্য রেজিস্ট্রেশনই যথেষ্ট, মেয়াদ সাধারণত তিন বছর, আর খবরে রেজিস্ট্রেশনের ফি ১,০০০ টাকা থেকে শুরু আর নবায়ন ৫০০ টাকার কথা আছে। ২০২৬ সালের ১২ অক্টোবর bfsa.gov.bd-র আইনের পেজে এই প্রবিধানমালার পুরো লেখা তোলা দেখা যায়নি, আর ঘরে কেক বানানো মানুষের কথা খবরে আলাদা করে নেই। তাই জেলার নিরাপদ খাদ্য অফিসে ফোন করে নিজের কাজটা বলে জিজ্ঞেস করুন।
BSTI-র দিকটাও জানুন। ২০২৬ সালের ১২ অক্টোবর BSTI-র ওয়েবসাইটে ৩ জুন ২০২৫-এর ৩১৫টা বাধ্যতামূলক জিনিসের মূল লিস্টে কেক (BDS 1574) আর ডেকোরেটেড কেক (BDS 2008) দুটোই আলাদা নামে আছে, সাথে পাউরুটি আর বিস্কুট। মানে নিজের ব্র্যান্ডে প্যাকেট করে কেক বাজারে ছাড়লে BSTI-র CM লাইসেন্সের প্রশ্ন আসে। অর্ডারে বানানো জন্মদিনের কেক সরাসরি কাস্টমারের হাতে দিলে এটা কীভাবে খাটে, সেটা BSTI-র ওয়ান স্টপ সার্ভিসে জিজ্ঞেস করে নিন, নিজে ধরে নেবেন না। কোন অফিসে কী কাগজ, কোনটা আগে, সেটা ধাপে ধাপে আছে ফুড লাইসেন্সের লেখায়।
লেবেল নিয়ে আইনের পুরো খুঁটিনাটি ওই লেখাতেই আছে। কেকের বক্সের জন্য একটা ছোট স্টিকার রাখুন, যাতে থাকবে দোকানের নাম আর ফোন নম্বর, কেকের নাম, বানানোর তারিখ, "ফ্রিজে রাখুন, দুই দিনের মধ্যে খেয়ে ফেলুন" ধরনের কথা, আর বাদাম, ডিম বা দুধের মতো যে জিনিসে অনেকের অ্যালার্জি হয়, সেগুলোর নাম। বাচ্চার জন্মদিনে কোনো অতিথির বাদামে অ্যালার্জি থাকলে এই এক লাইন বড় বিপদ থামাতে পারে।
শহরে একই দিনে ডেলিভারি, বক্স আর গরম
কেক বাঁচে বা মরে শেষ এক ঘণ্টায়, রান্নাঘর থেকে কাস্টমারের দরজা পর্যন্ত। ডেলিভারির সময়ের ঘর কীভাবে ঠিক করবেন, নিজের লোক রাখবেন নাকি একই দিনের কুরিয়ার, কত খরচ, সেটা নিজের ডেলিভারি ম্যান নিয়ে লেখায় কেকের আলাদা অংশে বলা আছে। এখানে বলছি বক্সের ভেতরের কাজটা, যেটা সেখানে নেই।
প্রতিটা কেক বসান একটা শক্ত কেক বোর্ডের ওপর, কেকের চেয়ে এক-দুই ইঞ্চি বড়। বোর্ড ছাড়া বক্সের নরম তলায় কেক বসালে বক্স তোলার সময় তলা বেঁকে যায়, আর ক্রিমে ফাটল ধরে। বোর্ডের তলায় একটু ক্রিম দিয়ে কেকটা আটকে দিন, যাতে পথে পিছলে বক্সের দেয়ালে না লাগে। বক্সটা কেকের উচ্চতার চেয়ে উঁচু হতে হবে, ঢাকনা যেন নকশা ছোঁয় না।
সাজানো শেষ হলে কেক বক্সসহ অন্তত আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা ফ্রিজে রাখুন, তারপর বের করে সাথে সাথে পাঠান। ঠান্ডা শক্ত ক্রিম পথের ঝাঁকুনি অনেক ভালো সামলায়। হুইপড ক্রিম গরমে সবচেয়ে আগে নরম হয়। জুন-জুলাইয়ে দুপুরের লম্বা পথের অর্ডারে বাটারক্রিম বা ফন্ডান্টের কেক দেওয়ার কথা ভাবুন, আর কাস্টমারকে আগেই বলুন কেন।

রাইডারের হাতে দেওয়ার সময় তিনটা কথা মুখে বলে দিন, কারণ বক্সের গায়ে লেখা থাকলেও সবাই পড়েন না। বক্স সোজা থাকবে, পায়ের কাছে বা কোলে সমান করে, পিঠের ব্যাগে না। ওপরে আর কিছু রাখা যাবে না। আর ব্রেক কষার সময় বক্স হাতে চেপে রাখবেন। প্রথম কয়েকটা ডেলিভারিতে রাইডার রওনা হওয়ার আগে বক্স কীভাবে ধরছেন, একবার নিজে দেখে নিন।

ছবি আর কাস্টম ডিজাইনের অর্ডার
পেজে শুধু নিজের বানানো কেকের ছবি দিন, ইন্টারনেট থেকে নামানো একটাও না। নামানো ছবি দেখে কেউ অর্ডার দিলে তিনি সেটাই আশা করবেন, আর আপনার কেক তার মতো না হলে অভিযোগ আসবেই। প্রতিটা কেক পাঠানোর আগে জানালার আলোয় একটা ছবি তুলুন, ওপর থেকে একটা আর পাশ থেকে একটা। এই ছবিগুলো দুটো কাজ করে। পেজের জন্য নতুন ছবি জমে, আর কাস্টমার পরে "নকশা নষ্ট ছিল" বললে আপনার কাছে প্রমাণ থাকে কেক কেমন অবস্থায় বেরিয়েছিল।
মোবাইলে খাবারের ছবি কীভাবে তুলবেন, আলো আর ব্যাকগ্রাউন্ড কেমন হবে, সেটা আলাদা কাজ, এখানে শুধু কেকের কয়েকটা কথা। সাদা বা হালকা রঙের টেবিলে রাখুন, জানালার আলো পাশ থেকে আসুক, আর একটা ছবিতে কেক কেটে ভেতরের স্তর দেখান। কাস্টমার ভেতরটা দেখে বেশি ভরসা পান।
কাস্টম নকশার অর্ডারে কাস্টমার প্রায়ই একটা ছবি পাঠান, অন্য কোনো বেকারির। এখানে লিখিতভাবে পরিষ্কার করে নিন, "এই নকশার কাছাকাছি হবে, হুবহু না", আর কোন অংশ বদলাবে, যেমন রং বা উপরের খেলনা। কার্টুন চরিত্রের প্রিন্ট বা বাজারের খেলনা বসালে সেটার দাম আলাদা লিখুন। প্রথম কয়েকটা কাস্টম অর্ডারে নকশার একটা সাদামাটা স্কেচ এঁকে কাস্টমারকে পাঠান, তাঁর হ্যাঁ পেলে তবে শুরু করুন।

কখন কেকের ব্যবসা শুরু করবেন না
যদি শুক্র-শনিবার আর উৎসবের দিনগুলো রান্নাঘরে কাটানোর মতো অবস্থা না থাকে, তাহলে এখন না। কেকের অর্ডার সবচেয়ে বেশি আসে ঠিক তখনই, যখন বাকি সবাই ছুটিতে। জন্মদিন আর বিয়ের দাওয়াত বেশিরভাগ সন্ধ্যায়, তাই বিকেলটাও আপনার ব্যস্ত সময়।
বাসা যদি এমন জায়গায় হয়, যেখান থেকে চল্লিশ মিনিটের মধ্যে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো যায় না, তাহলেও ভাবুন। আর ওভেন যদি এখনো ভরসার না হয়, একই রেসিপি তিনবার বানিয়ে তিন রকম ফল আসে, তাহলে আগে রান্নাঘরে কয়েক সপ্তাহ অনুশীলন করুন, আত্মীয়-বন্ধুদের জন্য। টাকা নিয়ে খারাপ কেক দেওয়ার চেয়ে এক মাস দেরিতে শুরু করা অনেক ভালো। আমি হলে প্রথম দশটা অর্ডার পরিচিতদের কাছ থেকে নিতাম, পুরো দামে, আর প্রতিটার পর জিজ্ঞেস করতাম কী ভালো লাগেনি।
আজই করে ফেলুন
- যে তিন-চারটা কেক দিয়ে শুরু করবেন, তাদের রেসিপি গ্রামে লিখে খাতায় তুলুন।
- নিজের বাসা থেকে চল্লিশ মিনিটে কোন কোন এলাকায় যাওয়া যায়, তার একটা লিস্ট বানান।
- ওপরের খরচের টেবিলটা নিজের এলাকার দাম বসিয়ে আবার করুন, আর নিজের প্রতি ঘণ্টার আয়টা বের করুন।
- কাট-অফের নিয়ম আর অগ্রিমের নিয়ম দুই লাইনে লিখে পেজের ওপরে পিন করুন।
- জেলার নিরাপদ খাদ্য অফিসের ফোন নম্বর খুঁজে খাতায় লিখুন, আর এই সপ্তাহে একবার ফোন দিন।
- কাছের বাজারে কেক বোর্ড আর বক্স কোথায় পাওয়া যায় দেখে আসুন, দুই সাইজের দাম লিখে আনুন।
সাধারণ প্রশ্ন
কেকের ব্যবসা করতে কি কি লাগে?
গ্যাস বা ইলেকট্রিক একটা ভরসার ওভেন, ডিজিটাল ওজন মাপার যন্ত্র, কয়েক সাইজের কেকের প্যান, হ্যান্ড মিক্সার, পাইপিং ব্যাগ আর নজল, কেক বোর্ড আর বক্স, আর জিনিস ঠান্ডা রাখার মতো ফ্রিজের জায়গা। কাগজের দিকে লাগবে ট্রেড লাইসেন্স, আর নিরাপদ খাদ্যের রেজিস্ট্রেশন নিয়ে জেলা অফিসের সাথে কথা।
ঘরে বানানো কেক অনলাইনে বেচতে কি লাইসেন্স লাগে?
খবর অনুযায়ী ১৬ জুলাই ২০২৬-এ গেজেট হওয়া নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নতুন প্রবিধানমালায় বেকারি আর পেস্ট্রি শপকে রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আনা হয়েছে। BSTI-র বাধ্যতামূলক লিস্টে কেক আর ডেকোরেটেড কেকও আছে। আপনার কাজের জন্য ঠিক কোন কাগজ লাগবে, জেলার নিরাপদ খাদ্য অফিস আর BSTI-তে জিজ্ঞেস করে নিন।
কেকের অর্ডারে কত টাকা অগ্রিম নেওয়া যায়?
ডিজিটাল কমার্স নির্দেশিকা ২০২১ অনুযায়ী পুরো টাকা অগ্রিম নেওয়া যায় তখনই, যখন টাকা পাওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জিনিসটা ডেলিভারি ম্যানের হাতে দিতে পারবেন। কয়েক দিন আগের বুকিংয়ে দামের ১০%-এর বেশি না নেওয়াই নিয়ম। তাই বুকিংয়ে অল্প অগ্রিম নিন, বাকিটা ডেলিভারির আগের দিন বা ডেলিভারির সময়।
এক কেজি কেকের দাম কত রাখা উচিত?
উপকরণ, বক্স, গ্যাস-বিদ্যুৎ, নষ্ট হওয়া কেকের ভাগ আর অ্যাডের খরচ যোগ করে তারপর নিজের সময়ের দাম ধরুন। এই লেখার উদাহরণে এক কেজি চকলেট ক্রিম কেকের খরচ অ্যাডসহ ৭৮০ টাকা ধরা হয়েছে। নিজের বাজারদর বসিয়ে একবার হিসাব না করে দাম ঠিক করবেন না।
কেকের ব্যবসার কিছু নাম কী হতে পারে?
এমন নাম রাখুন যেটা ফোনে একবার শুনে বানান করা যায় আর এলাকার নাম বা নিজের নামের সাথে মেলে, যেমন "মিরপুর হোম বেক"। নাম ঠিক করার আগে ফেসবুকে খুঁজে দেখুন একই নামে আরেকটা পেজ আছে কি না।
গরমে কেকের ক্রিম গলে যায়, কী করব?
কেক বক্সে ভরার আগে ফ্রিজে রেখে ক্রিম শক্ত হতে দিন, আর দুপুরের সবচেয়ে গরম সময়ে লম্বা পথে না পাঠানোর চেষ্টা করুন। হুইপড ক্রিম গরমে সবচেয়ে আগে নরম হয়, লম্বা পথের অর্ডারে বাটারক্রিম বা ফন্ডান্ট তুলনামূলক বেশি টেকে। বক্স সবসময় সোজা রাখতে রাইডারকে আগে বলে দিন।
আরও পড়ুন
খেলনা ব্যবসার আইডিয়া, কোন খেলনা অনলাইনে চলে আর নিরাপত্তার নিয়ম
বাচ্চাদের খেলনা অনলাইনে বেচতে চাইলে কোন খেলনা চলে, চকবাজার থেকে প্রথম লট কীভাবে নেবেন, ২০২৬ সালে BSTI-র তালিকায় খেলনা আসার মানে কী, ব্যাটারির খেলনা চালিয়ে দেখা, মাপ বোঝানো ছবি আর না ভাঙার প্যাকিং, একটা লটের টাকার হিসাবসহ।
থ্রিফট শপিং কি? পুরনো বিদেশি জ্যাকেট-শার্টের থ্রিফট ব্যবসার নিয়ম
থ্রিফট শপিং কি, মাল কোথা থেকে আসে আর পুরনো কাপড় আমদানির নিয়ম কী বলে, গাইট খুলে বাছাই, ধোয়া আর ছবি, কন্ডিশন সত্যি করে লেখা, আর একটা গাইট থেকে এক পিসের দাম কীভাবে বের করবেন, হিসাবসহ।
অনলাইনে শাড়ির ব্যবসা, তাঁতের শাড়ি থেকে প্রথম লট, ছবি আর ফেরত
অনলাইনে শাড়ির ব্যবসা শুরু করবেন? কোন শাড়ি চলে, টাঙ্গাইলের হাট আর পাইকার, BSTI-র ২০২৬ সালের নতুন শাড়ির নিয়ম, মডেল ছাড়া শাড়ির ছবি, মাপ আর যত্নের কথা লেখা, আর একটা লটে কত থাকে, হিসাবসহ।


