ফেসবুক গিভওয়ে কি? লাইক-শেয়ারের ফাঁদ এড়িয়ে নিয়ম মেনে পুরস্কার দিন
ফেসবুক গিভওয়ে কি, Meta-র নিয়মে লাইক-শেয়ার-ট্যাগের বদলে পুরস্কার কেন চলে না, কিনলেই লাকি কুপনে বাংলাদেশের আইন কী বলে, আর লটারি বা ফ্রি গিফটের বদলে কীভাবে দামের ছাড় সাজাবেন যাতে ফ্রি-শিকারি না, আসল কাস্টমার আসে। টাকার হিসাবসহ।

এই লেখায় যা আছে
- ফেসবুক গিভওয়ে কি, অনলাইন শপের কী লাভ
- ফেসবুক গিভওয়ের নিয়ম, Meta-তে কী করা যায়, কী যায় না
- কাদের জন্য গিভওয়ে, ফলোয়ার না কাস্টমার
- কিনলেই লাকি কুপন, আইনের দিকটা
- বিজয়ী বাছাই, সবার সামনে স্বচ্ছভাবে
- পুরস্কার আর খরচের হিসাব, লাভ কি থাকে (উদাহরণ)
- ভুয়া গিভওয়ের প্রতারণা থেকে পেজ বাঁচানো
- কখন গিভওয়ে করবেন না
- আজই করে ফেলুন
ফেসবুক গিভওয়ে কি, সহজ কথায় বলি। পেজ থেকে কয়েকজনকে বিনা টাকায় কিছু দেওয়ার প্রচারণাই গিভওয়ে। সমস্যা হলো বাংলাদেশে যে ধাঁচে বেশিরভাগ গিভওয়ে হয়, "পেজে লাইক দিন, পোস্ট শেয়ার করুন, তিনজনকে ট্যাগ করুন, লটারিতে পাবেন স্মার্টওয়াচ", ঠিক সেটাই Meta-র নিয়মে নিষেধ। আর "কিনলেই লাকি কুপন" ধাঁচের ড্রয়ে বাংলাদেশের আইনের প্রশ্ন আছে। তাই আসল কাজ হলো এমন অফার সাজানো, যেটা Meta-র নিয়ম আর দেশের আইনের ঝুঁকি এড়িয়ে চলে, আর ফ্রি-শিকারি না এনে কাস্টমার আনে।
গিভওয়ের শেষ দিন বিকেলে পোস্টে দুই হাজার কমেন্ট, সবগুলোতে "Done" আর তিনটা করে ট্যাগ। দেখে বুক ভরে যায়। তারপর সপ্তাহ শেষে অর্ডারের খাতা খুলে দেখেন, অর্ডার আগের সপ্তাহের মতোই, কোনো কোনো দিন কম। অনেক সেলারের প্রথম গিভওয়ের গল্প এটাই। নিচে বলছি কেন এমন হয়, নিয়ম কী বলে, আর কোন ধাঁচের অফারে সত্যিকারের অর্ডার আসে, টাকার হিসাবসহ।
ফেসবুক গিভওয়ে কি, অনলাইন শপের কী লাভ
দোকানের দিক থেকে গিভওয়ের লাভ হতে পারে তিন জায়গায়। নতুন মানুষ পেজটা চেনেন, পুরনো কাস্টমার আবার কেনার একটা কারণ পান, আর পেজের পোস্টে কিছুদিন সাড়া বাড়ে। কিন্তু খেয়াল করুন, এর কোনোটাই নিজে থেকে টাকা না। টাকা আসে তখনই, যখন গিভওয়ে দেখে কেউ অর্ডার দেন আর পার্সেলটা ডেলিভারি হয়।
লাইক-শেয়ারের গিভওয়েতে প্রথম দুই দিন সব ভালো দেখায়। ফলোয়ার এক রাতে কয়েক হাজার বাড়ে, পোস্টের রিচ আকাশে ওঠে। তারপর একটা জিনিস ঘটে, যেটা অনেকে খেয়াল করেন সপ্তাহ দুয়েক পরে। নতুন পোস্টের রিচ আগের চেয়েও কমে যায়। কারণ যাঁরা এসেছিলেন, তাঁদের বেশিরভাগ আপনার প্রোডাক্টে আগ্রহী না, তাঁরা পরের পোস্টে সাড়া দেন না। ফেসবুক দেখে আপনার পোস্টে মানুষ থামছে না, তাই কম দেখায়।
এজন্য গিভওয়ের আগে একটাই প্রশ্ন করুন, আমি কার হাতে উপহারটা দিতে চাই। যদি উত্তর হয় "যে কেউ", তাহলে টাকাটা অ্যাডে দিন, সেটাই বেশি কাজের। যদি উত্তর হয় "যিনি আমার প্রোডাক্ট কিনবেন বা কিনেছেন", তাহলে গিভওয়ে কাজে আসতে পারে, কিন্তু অন্য নিয়মে।
ফেসবুক গিভওয়ের নিয়ম, Meta-তে কী করা যায়, কী যায় না
Facebook giveaway rules বলতে আসলে Meta-র দুটো নিয়ম বোঝায়, আর দুটোই ২০২৬ সালের ১২ অক্টোবর Meta-র নিজের পেজে মিলিয়ে দেখা।
প্রথমটা Pages, Groups and Events Policies-এর Promotions অংশ। সেখানে লেখা আছে, পেজে কনটেস্ট, গিভওয়ে বা লটারি ধাঁচের প্রচারণা চালালে সেটা দেশের আইন মেনে চালানোর দায় আপনার। অংশগ্রহণকারীদের জন্য অফিশিয়াল নিয়ম, শর্ত আর কারা অংশ নিতে পারবেন, সেটা জানাতে হবে, আর দরকার হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে রেজিস্ট্রেশনও করাতে হবে। অংশগ্রহণকারীরা মেনে নেবেন যে এই প্রচারণার দায় Meta-র না, আর Meta এটা স্পন্সর বা পরিচালনা করছে না। আর সবচেয়ে কাজের লাইনটা, প্রচারণায় অংশ নেওয়ার শর্ত হিসেবে শেয়ার, রিপোস্ট, অন্যকে ট্যাগ বা অন্য কোনোভাবে প্রচার করতে বলা যাবে না, এর জন্য বাড়তি সুবিধাও দেওয়া যাবে না।
দ্বিতীয়টা Meta-র Community Standards-এর Spam নিয়ম। সেখানে এনগেজমেন্টের বদলে কিছু দেওয়ার কথা আলাদা করে নিষেধ করা আছে। এনগেজমেন্টের বদলে টাকা বা টাকার সমান কিছু জেতার সুযোগ দেওয়া, আর লাইক বা ফলোর বদলে দামি কিছু দেওয়ার প্রস্তাব, দুটোই সেখানে নিষেধের লিস্টে। নিয়মের নিজের উদাহরণেই আছে, পেজে লাইক দিলে iPhone দেওয়ার প্রস্তাব।
তাহলে বাস্তবে কী দাঁড়াল? "লাইক দিন", "ফলো করুন", "শেয়ার করুন", "তিনজনকে ট্যাগ করুন", এগুলোর কোনোটাকে পুরস্কারের শর্ত বানাবেন না। এই একই কথা ফেসবুক পেজ খোলার লেখায় নতুন পেজের ভুলের লিস্টে বলেছি। কমেন্টে একটা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে অংশ নেওয়ার গিভওয়ে অনেক পেজ চালায়। কিন্তু Spam নিয়মের ভাষা "এনগেজমেন্ট" শব্দটা বড় অর্থে বলে, তাই এটাকে আমি ধূসর জায়গা হিসেবে দেখি, নিরাপদ না। বারবার এমন পোস্টে রিপোর্ট খেলে পেজ কী বিপদে পড়ে, সেটা পেজ রেস্ট্রিক্টেড হওয়ার লেখায় আছে।

কাদের জন্য গিভওয়ে, ফলোয়ার না কাস্টমার
যিনি নিয়মিত গিভওয়ে পেজে ঘোরেন, তাঁকে চেনা সহজ। কমেন্ট দেখে কয়েকটা প্রোফাইলে ঢুকলেই দেখবেন, একই মানুষ একই সপ্তাহে বিশটা পেজের গিভওয়েতে "Done" লিখেছেন। প্রোফাইলে নিজের কোনো পোস্ট নেই, আছে শুধু গিভওয়ের শেয়ার। এঁরা দোষী না, এটা তাঁদের শখ। কিন্তু আপনার উপহারের টাকায় তাঁরা কাস্টমার হবেন না।
কাস্টমার আনতে হলে সুবিধাটা এমন হতে হবে, যার দাম শুধু আপনার কাস্টমারের কাছে আছে। শাড়ির দোকান ফ্রি স্মার্টওয়াচ দিলে ঘড়ির শখের মানুষ আসবেন, শাড়ির ক্রেতা না। তার বদলে "পরের শাড়িতে ১৫০ টাকা কম" দিলে যিনি আগ্রহী হবেন, তিনি শাড়িই কিনবেন। মধুর পেজে পরের বোতলে ছাড়, জুতার দোকানে পরের জোড়ায়। সুবিধা ছোট, কিন্তু ঠিক লোকের হাতে যায়। কেনার সাথে ফ্রি জিনিস না দিয়ে আমি দামের ছাড়ই বেছে নিতে বলি, কেন, সেটা নিচে আইনের অংশে আছে।
আর সবচেয়ে ভালো জায়গা হলো পুরনো কাস্টমার। যিনি একবার কিনে খুশি হয়েছেন, তাঁকে ধন্যবাদ হিসেবে পরের অর্ডারে একটা ছাড় দিলে সেটা আবার কেনার কারণ হয়, আর এখানে কোনো ভাগ্যের ড্র লাগে না। "গত তিন মাসে যাঁরা দুবার কিনেছেন, তাঁদের সবার পরের অর্ডারে ১০% কম" লিখে দিন। এখানে সবাই পাচ্ছেন, কেউ লটারির ভরসায় নেই।
এই লিস্ট বানাতে আলাদা খাতা লাগে না, যদি অর্ডারগুলো এক জায়গায় থাকে। WinningSeller-এ অর্ডার লিস্টের CSV নামালে প্রতিটা অর্ডারের স্ট্যাটাস আর তারিখ পাশাপাশি আসে, তাই Sheet-এ খুলে ডেলিভারি হওয়া অর্ডারগুলো আলাদা করলেই পুরনো কাস্টমারের নাম-নম্বর হাতে চলে আসে। দোকানের বাকি কাজ কীভাবে হয়, দেখে নিতে পারেন ফিচারের লিস্টে।
কিনলেই লাকি কুপন, আইনের দিকটা
ঈদের আগে পার্সেলের ভেতরে স্ক্র্যাচ কার্ড, "ঘষলেই পেতে পারেন বাইক", অনেক পেজে দেখা যায়। কাজটা দেখতে নিরীহ, কিন্তু বাংলাদেশের আইনে এর একটা পরিষ্কার দিক আছে, সেটা জেনে নিন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১-এর ৩.১.৮ অনুচ্ছেদে (৪ জুলাই ২০২১-এর গেজেট, mincom.gov.bd-তে আছে) লেখা, ডিজিটাল কমার্স প্রতিষ্ঠান সরকারের আগাম অনুমতি ছাড়া কোনো লটারি বা র্যাফেল ড্র করতে পারবে না, আর এ ক্ষেত্রে দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ২৯৪খ ধারাও খাটবে। বাংলা ট্রিবিউন ৬ জুলাই ২০২১-এ একই লাইন ছেপেছিল।
এবার দণ্ডবিধির কথা। সরকারের আইনের সাইট bdlaws.minlaw.gov.bd-তে ধারাগুলো ইংরেজিতে আছে, ২০২৬ সালের ১২ অক্টোবর মিলিয়ে দেখা। ২৯৪ক ধারায় সরকারের অনুমতি ছাড়া লটারি চালানো আর এমন লটারির সাথে টাকা বা জিনিস দেওয়ার প্রস্তাব ছাপানোর শাস্তির কথা আছে। ঠিক পরের ২৯৪খ ধারার ভাষা আরও চওড়া। ব্যবসা বা বিক্রির সাথে কুপন, টিকিট, নম্বর, বা "অন্য যেকোনো উপায়ে" টাকা বা জিনিসে কোনো পুরস্কার বা রিওয়ার্ড দেওয়ার প্রস্তাব, যদি সেটা কেনায় উৎসাহ দিতে বা প্রোডাক্টের প্রচারের জন্য হয়, তাহলে যিনি প্রস্তাব দেন আর যিনি সেটা প্রচার করেন, দুজনেরই ছয় মাস পর্যন্ত জেল, জরিমানা বা দুটোই হতে পারে। খেয়াল করুন, এই ধারায় ভাগ্য বা ড্রয়ের কথা আলাদা করে নেই।
তাহলে কী করবেন? প্রথম কথা, আমি আইনের রায় দিচ্ছি না, কোন অফার কোন ধারায় পড়ে সেটা একজন আইনজীবীই শেষ কথা বলবেন। কিন্তু একজন সেলার হিসেবে নিয়মটা আমি সহজ রাখতে বলি। যেখানে পুরস্কার ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে আর সেটা কেনার সাথে বাঁধা, সেই রাস্তায় আইনজীবীর সাথে কথা না বলে যাবেন না। আর ড্র নেই বলেই নিরাপদ, এমনও ধরে নেবেন না। ধারার ভাষা পড়লে "এই সপ্তাহের প্রথম ৫০টা অর্ডারের পার্সেলে একটা গিফট" ধাঁচের অফারও কেনায় উৎসাহ দেওয়ার রিওয়ার্ড হিসেবে পড়তে পারে। তাই পুরস্কার বা ফ্রি জিনিসের বদলে দামেই ছাড় দিন। "এই সপ্তাহে প্রথম ৫০টা অর্ডারে ৬০ টাকা কম", বা পরের অর্ডারে একটা ছাড়ের কোড, এগুলো দাম কমানোর অফার, আলাদা পুরস্কার না। তবু বড় অঙ্কের বা নতুন ধাঁচের কোনো অফারের আগে একবার আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
বিজয়ী বাছাই, সবার সামনে স্বচ্ছভাবে
ছাড় বা উপহার যে নিয়মেই দিন, কে পেলেন সেটা সবার সামনে দেখান। মানুষ গিভওয়েতে সবচেয়ে বেশি রাগেন তখন, যখন মনে হয় বিজয়ী আগে থেকে ঠিক করা ছিল। কমেন্টে "নিজের লোককে দিয়েছে" একবার উঠলে সেটা থামানো কঠিন।
শুরু করুন পোস্টের শর্ত দিয়ে। শুরু আর শেষ কোন দিন কয়টায়, ঢাকার সময়ে লিখুন। কারা পাবেন, যেমন "এই সপ্তাহে যাঁরা অর্ডার দেবেন"। কীভাবে বাছবেন, যেমন "অর্ডারের সময় ধরে প্রথম ৫০টা অর্ডার"। পুরস্কার শুধু বাংলাদেশের ভেতরে পাঠানো হবে, সেটাও লিখুন, নইলে প্রবাসী কেউ জিতে ঠিকানা দেন দুবাইয়ের। আর Meta-র নিয়ম মেনে একটা লাইন রাখুন, এই প্রচারণা দোকানের নিজের, Meta-র না।
বাছাইয়ের দিন পুরো কাজটা স্ক্রিন রেকর্ড করুন, শুরু থেকে শেষ। "প্রথম ৫০টা অর্ডার" নিয়মে অর্ডার লিস্টটা অর্ডারের সময় ধরে সাজিয়ে দেখান, কোন অর্ডার কোন মিনিটে এলো, আর ৫০ নম্বরটা কোথায় শেষ হলো। ভাগ্যের ড্র আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে করলে কমেন্ট পিকার টুল চালানোর পুরো সময়টা রেকর্ড করুন, ফিল্টার কী দিয়েছেন সেটাসহ। ভিডিওটা পোস্টের কমেন্টে দিন।
ফলাফল জানান দুই জায়গায়, পোস্টের কমেন্টে আর বিজয়ীর ইনবক্সে। নাম লিখুন, ফোন নম্বর দিলে মাঝের অঙ্কগুলো ঢেকে দিন, যেমন ০১৭১১-XXX-৮৯২। বিজয়ীর পুরো নম্বর আর ঠিকানা কখনো পাবলিক কমেন্টে চাইবেন না, ইনবক্সে নিন। আর বিজয়ী ৪৮ ঘণ্টায় সাড়া না দিলে কী হবে, সেটাও শর্তে আগে লিখে রাখুন, যাতে পরে নিজের মতো নিয়ম বানাতে না হয়।

পুরস্কার আর খরচের হিসাব, লাভ কি থাকে (উদাহরণ)
গিভওয়ের খরচ শুধু উপহারের দাম না। উপহার কেনা, প্যাকিং, আলাদা পার্সেল হলে তার ডেলিভারি চার্জ, আর বিজয়ী ফোন না ধরলে ফেরত পার্সেল। ছাড়ের বেলায় খরচ হলো প্রতিটা অর্ডারে যত টাকা কম নিলেন। তাই আগে পুরো খরচ ধরুন, তারপর দেখুন বাড়তি অর্ডারে সেটা উঠছে কি না।
উদাহরণ। এখানকার প্রতিটা সংখ্যা বানানো, শুধু হিসাবের ধরনটা দেখানোর জন্য। আপনার পেজের সংখ্যা বসালে ফল অন্যরকম হবে। ধরুন আপনার পেজে সাধারণ সপ্তাহে ১২০টা অর্ডার ডেলিভারি হয়, আর প্রতিটা ডেলিভারি হওয়া অর্ডারে অ্যাড আর সব খরচ বাদে হাতে থাকে ২৫০ টাকা। দুই রকম গিভওয়ে পাশাপাশি দেখুন।
প্রথমটা লাইক-শেয়ারের লটারি, পুরস্কার একটা স্মার্টওয়াচ, দাম ৪,৫০০ টাকা, ডেলিভারি চার্জ ১২০ টাকা, মোট ৪,৬২০ টাকা। কমেন্ট এলো দুই হাজার, কিন্তু সপ্তাহের ডেলিভারি হওয়া অর্ডার রইল ১২০টাই। হাতে থাকল ৪,৬২০ টাকার খরচ, বাড়তি লাভ শূন্য, আর সাথে Meta-র নিয়ম ভাঙার ঝুঁকি।
দ্বিতীয়টা সবার জন্য দামের ছাড়। "এই সপ্তাহে প্রথম ৫০টা অর্ডারে ৬০ টাকা কম"। ছাড়টা অর্ডারের দামের ভেতরেই কাটে, তাই আলাদা পার্সেল বা ডেলিভারি চার্জ নেই। খরচ ৫০ × ৬০ = ৩,০০০ টাকা। ধরুন এই সপ্তাহে ডেলিভারি হলো ১৩৫টা, মানে ১৫টা বাড়তি অর্ডার। বাড়তি লাভ ১৫ × ২৫০ = ৩,৭৫০ টাকা। ছাড়ের খরচ বাদ দিলে হাতে থাকল ৩,৭৫০ − ৩,০০০ = ৭৫০ টাকা।
সংখ্যাটা ছোট, আর সেটাই আসল শিক্ষা। ছাড়ও লাভ রাখে তখনই, যখন ছাড় ছোট আর বাড়তি অর্ডার যথেষ্ট। একই হিসাবে বাড়তি অর্ডার ১২টার কম হলে, মানে ১২ × ২৫০ = ৩,০০০ টাকার নিচে, আপনি লোকসানে। তাই ছাড় ঠিক করার আগে খাতায় এই একটা লাইন লিখুন, কয়টা বাড়তি অর্ডার এলে খরচ উঠবে। ৬০ টাকার বদলে ২০০ টাকা ছাড় দিলে সেই সংখ্যা হয়ে যায় ৪০টা অর্ডার, যেটা এক সপ্তাহে প্রায় অসম্ভব।
সবাইকে আজই ছাড় না দিয়ে পরের অর্ডারে ছাড়ের কোড দিলে খরচ আরও কমে, কারণ ছাড় খরচ হয় শুধু তখন, যখন তিনি সত্যিই আবার কেনেন। কোডটা কীভাবে বানালে এক নম্বর থেকে একবারের বেশি চলে না, আর কত ছাড়ে লোকসান শুরু, সেটা কুপন কোডের লেখায় হিসাবসহ আছে। WinningSeller-এ "কুপন" মেনু থেকে বিজয়ীদের জন্য আলাদা একটা কোড বানিয়ে "মোট কতবার দেওয়া যাবে" ঘরে বিজয়ীর সংখ্যা দিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে কোড ফেসবুকে ছড়িয়ে গেলেও বাড়তি কেউ নিতে পারেন না। কুপন দোকানে শুরুতে বন্ধ থাকে, চালু করে নিলে তবেই চেকআউটে কুপনের ঘর আসে।
ভুয়া গিভওয়ের প্রতারণা থেকে পেজ বাঁচানো
গিভওয়ে ঘোষণা করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রায়ই একটা জিনিস ঘটে। আপনার পেজের নাম আর লোগো নকল করে একটা নতুন পেজ খোলে, আর আপনার পোস্টে যাঁরা কমেন্ট করেছেন তাঁদের মেসেজ দেয়, "অভিনন্দন, আপনি জিতেছেন, ডেলিভারি চার্জ ১৫০ টাকা বিকাশ করুন"। মানুষ টাকা পাঠান, পুরস্কার আসে না, আর গালিটা পড়ে আপনার আসল পেজে।
এটা থামানোর পুরো ক্ষমতা আপনার হাতে নেই, কিন্তু ক্ষতি অনেক কমানো যায়। গিভওয়ের পোস্টেই বড় করে লিখুন, এটাই আমাদের একমাত্র পেজ, আর আমরা কোনো বিজয়ীর কাছে কোনো টাকা চাই না। একই কথা একটা আলাদা পোস্টে লিখে পেজের ওপরে পিন করুন। কমেন্টে নকল পেজের কমেন্ট দেখলে সাথে সাথে লুকান, আর পেজটা রিপোর্ট করুন। আসল বিজয়ীকে ইনবক্সে মেসেজ দেওয়ার সময় পেজের নাম আর পোস্টের লিংক উল্লেখ করুন, যাতে তিনি মিলিয়ে নিতে পারেন।

অফার শেষ হলে যাঁরা ছাড় পেলেন, তাঁদের অর্ডারের পার্সেল পাঠানোর দিন একটা ছবি তুলে রাখুন, রাইডারের হাতে দেওয়ার সময়। পরে সেটা পোস্টে দিন, ক্রেতার অনুমতি নিয়ে। একটা আসল ছবি অনেক "সত্যিই কি দেয়?" প্রশ্নের উত্তর দেয়। আর বিজয়ী খুশি হয়ে পেজে কিছু লিখতে চাইলে নিজে থেকে লিখতে দিন, রিভিউয়ের বদলে কিছু দেওয়ার প্রস্তাব কেন বিপদ, সেটা পেজ রিভিউয়ের লেখায় আছে।

কখন গিভওয়ে করবেন না
নতুন পেজে, যেখানে এখনো হাতে গোনা কয়েকটা অর্ডার হয়েছে, গিভওয়ে দিয়ে শুরু করবেন না। তখন ফলোয়ারের ভিড় আসবে কাস্টমার ছাড়া, আর পরের মাসগুলোতে পেজের রিচ ভুগবে। আগে কয়েকশো অর্ডারের একটা ভিত্তি গড়ুন, পুরনো কাস্টমারের লিস্ট তৈরি হোক, তারপর তাঁদের জন্য উপহার ভাবুন।
স্টক কম থাকলে, বা ঈদের ঠিক আগের সপ্তাহে কুরিয়ার যখন এমনিতেই চাপে, তখনও না। উপহারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পার্সেল দেরিতে গেলে খুশির বদলে অভিযোগ আসে। পেজ রেস্ট্রিক্টেড থাকলে বা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কোনো পোস্টে ভায়োলেশন এলে তো একদমই না। আর যদি উপহারের খরচ কোন সংখ্যার অর্ডারে উঠবে সেটা বলতে না পারেন, তাহলে গিভওয়ে না দিয়ে সেই টাকা একটা ভালো অ্যাডে দিন। নতুন সেলারের জন্য গিভওয়ের ওই টাকায় কনফার্ম কলের একজন মানুষ রাখা প্রায় সবসময় বেশি অর্ডার বাঁচায়।
আজই করে ফেলুন
- পেজের পুরনো পোস্টে "লাইক-শেয়ার-ট্যাগ করলে গিফট" ধাঁচের কোনো গিভওয়ে থাকলে খুঁজে বের করুন, আর সেগুলো এডিট বা আর্কাইভ করুন।
- গত তিন মাসে যাঁদের অর্ডার ডেলিভারি হয়েছে, তাঁদের সংখ্যা গুনুন। এটাই আপনার আসল গিভওয়ের মাঠ।
- এমন একটা ছাড় ঠিক করুন, যেটা শুধু আপনার কাস্টমারের কাজে লাগে, যেমন পরের অর্ডারে নিজের প্রোডাক্টে কয়েক টাকা কম।
- খাতায় হিসাবটা করুন, ছাড়ের মোট খরচ ভাগ এক অর্ডারের লাভ, মানে কয়টা বাড়তি অর্ডারে খরচ উঠবে।
- শর্তের পোস্টটা লিখে ফেলুন, সময় ঢাকার সময়ে, কারা পাবেন, কীভাবে বাছাই, আর "আমরা কোনো টাকা চাই না" লাইনসহ।
- "এটাই আমাদের একমাত্র পেজ" লেখা একটা পোস্ট আজই পিন করে রাখুন, গিভওয়ে করুন বা না করুন।
সাধারণ প্রশ্ন
ফেসবুক গিভওয়ে কি?
পেজ থেকে কিছু মানুষকে বিনা টাকায় একটা জিনিস দেওয়ার প্রচারণাকে গিভওয়ে বলে। বাংলাদেশে সাধারণত লাইক, শেয়ার বা বন্ধু ট্যাগ করলে লটারিতে পুরস্কারের কথা বলা হয়, কিন্তু এই ধরনটাই Meta-র নিয়মে আটকায়। দোকানের জন্য কম ঝুঁকির রাস্তা হলো লটারি বা কেনার সাথে ফ্রি পুরস্কারের বদলে সবার জন্য দামে ছাড় বা পরের অর্ডারের কুপন, কারণ বিক্রির সাথে পুরস্কারে বাংলাদেশের দণ্ডবিধির প্রশ্ন আসে।
লাইক-শেয়ার করলে গিফট দেওয়া কি ফেসবুকে নিষেধ?
হ্যাঁ। Meta-র Pages, Groups and Events Policies বলছে প্রচারণায় অংশ নিতে শেয়ার, রিপোস্ট বা অন্যকে ট্যাগ করতে বলা বা তার জন্য কিছু দেওয়া যাবে না। আর Meta-র Spam নিয়মে লাইক বা ফলোর বদলে টাকা বা দামি কিছু দেওয়ার প্রস্তাবও নিষেধ।
কিনলেই লাকি কুপন দেওয়া কি আইনসম্মত?
ঝুঁকির। ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১ অনুযায়ী সরকারের আগাম অনুমতি ছাড়া লটারি বা র্যাফেল ড্র করা যায় না, আর দণ্ডবিধির ২৯৪খ ধারায় বিক্রির সাথে কুপন, নম্বর বা অন্য যেকোনো উপায়ে পুরস্কারের প্রস্তাব শাস্তিযোগ্য, সেখানে ভাগ্যের কথা আলাদা করে নেই। এমন অফারের আগে একজন আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
গিভওয়ের বিজয়ী কীভাবে বাছাই করব?
যে নিয়মে বাছবেন, সেটা পোস্টেই আগে লিখে দিন, শুরু আর শেষের সময় ঢাকার সময়ে। বাছাইয়ের পুরো সময়টা স্ক্রিন রেকর্ড করুন, ফলাফল কমেন্টে আর ইনবক্সে জানান, ফোন নম্বরের মাঝের অঙ্ক ঢেকে। লটারির বদলে সবার জন্য একই ছাড় রাখলে বাছাই নিয়ে তর্কই ওঠে না।
গিভওয়ের পুরস্কার পাঠানোর ডেলিভারি চার্জ কে দেবে?
আপনি দেবেন। বিজয়ীর কাছ থেকে ডেলিভারি চার্জ বা "প্রসেসিং ফি" চাওয়াটাই ভুয়া গিভওয়ে পেজগুলোর প্রতারণার মূল কৌশল। আপনি চাইলে আসল বিজয়ীও আপনাকে প্রতারক ভাববেন।
গিভওয়ে দিলে কি পেজে অর্ডার বাড়ে?
লাইক-শেয়ারের গিভওয়েতে সাধারণত ফলোয়ার বাড়ে, অর্ডার না, কারণ যাঁরা আসেন তাঁদের বেশিরভাগ শুধু ফ্রি জিনিসের খোঁজে থাকেন। সবার জন্য দামের ছাড়ে অর্ডার বাড়তে পারে, যদি ছাড়ের মোট খরচ বাড়তি অর্ডারের লাভের চেয়ে কম থাকে। আগে হিসাব করে নিন।
আরও পড়ুন
ওয়েবসাইটের মেনু আর ফুটারে কী রাখবেন? অনলাইন দোকানের জরুরি পেজসহ
ওয়েবসাইটের মেনুতে কয়টা লিংক রাখবেন, হেডারে কল আর WhatsApp বাটন কেন, ফুটারে ঠিকানা আর ট্রেড লাইসেন্স নম্বর কোথায় বসবে, আর About, যোগাযোগ, ডেলিভারি ও রিটার্নের পেজে কী লিখবেন। ফোনে দোকান খুলে এক ঘণ্টায় গুছিয়ে নেওয়ার পুরো নিয়ম।
গুগল সার্চ কনসোল কি? দোকানের ওয়েবসাইট গুগলে তুলবেন যেভাবে
গুগল সার্চ কনসোল হলো Google-এর ফ্রি টুল, যেখানে দেখা যায় কোন সার্চে আপনার দোকান আসছে আর কোন পেজ গুগলের লিস্টে আছে। নিজের ডোমেইনে DNS দিয়ে মালিকানা প্রমাণ, sitemap.xml সাবমিট, URL Inspection, "Not indexed" দেখলে কী করবেন, আর কোন পথ দোকানে আসলে কাজ করে না।
বিজনেস ক্যাপশন, ফেসবুকে সেল পোস্টে কী লিখলে অর্ডার আসে
ছবি সুন্দর, তবু ইনবক্সে সবাই শুধু দাম জিজ্ঞেস করে? সেল পোস্টের প্রথম দুই লাইনে কী লিখবেন, ক্যাপশনে কোন পাঁচটা কথা থাকতেই হবে, দাম লিখবেন কি না, নতুন মাল, অফার, স্টকে ফেরা আর রিভিউর চারটা নমুনা, আর কোন কথায় পোস্ট রিপোর্ট খায়।


