হেয়ার অয়েল বানানোর নিয়ম, BSTI লাইসেন্স আর যে দাবি লিখবেন না
ঘরে হেয়ার অয়েল বানিয়ে ফেসবুকে বেচতে চাইলে কী কী লাগে। মেপে ব্যাচ বানানো আর খাতা রাখা, তেল নষ্ট হওয়ার লক্ষণ, হেয়ার অয়েল যে BSTI-র বাধ্যতামূলক লিস্টে আছে, ঔষধ প্রশাসনের আইনে কোথায় কসমেটিকস শেষ, লেবেলে কী লিখবেন, ১০০ মিলির দামের হিসাব আর কোন দাবি লিখলে বিপদ।

এই লেখায় যা আছে
হেয়ার অয়েল বানানোর নিয়ম বিক্রির জন্য আর নিজের জন্য এক না। নিজের জন্য আন্দাজে বানালেই চলে। বিক্রির জন্য প্রতিটা ব্যাচ ওজন মেপে বানাতে হয়, খাতায় লিখতে হয়, আলো ঢোকে না এমন বোতলে ভরতে হয়, আর লেবেলে কিছু তথ্য দিতেই হয়। আরও দুটো কথা শুরুতেই জেনে রাখুন। হেয়ার অয়েল BSTI-র বাধ্যতামূলক লিস্টে আছে, মানে নিজের নামে বেচতে লাইসেন্স লাগে। আর "চুল পড়া বন্ধ" জাতীয় দাবি লিখলে ফেসবুকে অ্যাড আটকায়, আইনেও বিপদ।
ইনবক্সে প্রথম যে প্রশ্নটা আসে, প্রায় সবসময় সেটা এই, "ভাই, এই তেলে চুল পড়া বন্ধ হবে তো?" এই প্রশ্নে "হ্যাঁ" বলার লোভ সবচেয়ে বেশি, আর বিপদও ঠিক সেখানে। এই প্রশ্নের সৎ উত্তর কী হবে, আর তার আগে তেলটা এমনভাবে কীভাবে বানাবেন যাতে প্রতিটা বোতল একই রকম হয়, লাইসেন্স আর দামের হিসাবসহ সেটাই এখানে বলছি।
হেয়ার অয়েলের ব্যবসা কেমন, কারা কেনেন
ঘরে বানানো তেলের কাস্টমার মূলত দুই রকম। একদল ছোটবেলায় মা-নানির হাতে বানানো তেলের গন্ধ মনে রেখেছেন, বাজারের বোতলে সেটা পান না। আরেকদল বাজারের বোতলের উপাদানের লম্বা লিস্ট দেখে বিরক্ত, তাঁরা চান অল্প কয়েকটা চেনা জিনিসে বানানো তেল। দুই দলই একবার পছন্দ হলে মাসে মাসে কেনেন, কারণ তেল ফুরায়। এই ব্যবসার আসল জোর তাই রিফিলে।
সমস্যা হলো এই বাজারে প্রতিযোগিতা অনেক, আর বেশিরভাগ পেজ বড় বড় দাবি দিয়ে বেচে। আপনি সৎ থাকলে প্রথম কয়েক সপ্তাহ মনে হবে দাবিওয়ালা পেজগুলো বেশি বেচছে। কিন্তু দাবি শুনে যিনি কেনেন, তিনি এক মাস পরে ফল না দেখে রাগ করে চলে যান, কখনো কখনো সবার সামনে ঠগ বলে যান। যিনি তেলের গন্ধ, হালকা ভাব আর চেনা উপাদানের জন্য কেনেন, তিনি থাকেন। তাই আমি সোজা বলি, এই ব্যবসায় টিকতে চাইলে দ্বিতীয় দলের জন্য বানান।
কখন এই ব্যবসা শুরু করবেন না
যদি BSTI-র লাইসেন্স আর ল্যাবের পরীক্ষার খরচ বহন করার মতো টাকা আর ধৈর্য না থাকে, তাহলে এখন না। লাইসেন্স ছাড়া নিজের নামে বোতল বেচা মানে প্রতিটা অর্ডারে ঝুঁকি নেওয়া। যদি আপনার পরিকল্পনাই হয় "চুল গজানোর তেল" বেচা, তাহলেও না, কারণ সেই দাবি ছাড়া আপনার বিক্রির গল্প দাঁড়ায় না, আর দাবিটা আইনে দাঁড়ায় না। আর যদি এখনো একই তেল তিনবার বানিয়ে তিনবার একই গন্ধ আর রং আনতে না পারেন, আগে রান্নাঘরে সেটা শিখুন।
হেয়ার অয়েল বানানোর নিয়ম, উপকরণ আর এক ব্যাচ মেপে রাখা
বেস তেল দিয়ে শুরু করুন, কারণ বোতলের নব্বই ভাগের বেশি জুড়ে থাকে এটাই। নারকেল, তিল, সরিষা বা ক্যাস্টর, যেটাই নিন, একই সাপ্লায়ারের কাছ থেকে নিয়মিত নিন, যাতে প্রতি ব্যাচে গন্ধ আর ঘনত্ব একই থাকে। BSTI-র বাধ্যতামূলক লিস্টে নারকেল তেল আর ভার্জিন নারকেল তেলও আছে, তাই নারকেল তেল কিনলে BSTI-র মান চিহ্ন দেখে কিনুন। খোলা ড্রামের তেলে কী মেশানো আছে, আপনি জানবেন না, অথচ লেবেলে নামটা থাকবে আপনার।
ভেষজ কিনুন ভালো করে শুকানো, আর কেনার পর নিজে আরেক দিন রোদে দিন। কাঁচা পাতা বা ফুল সরাসরি তেলে দিলে তার পানি তেলের নিচে জমে, আর সেখান থেকেই কয়েক সপ্তাহে ছত্রাক আর বাজে গন্ধ শুরু হয়। পাতা হাতে নিয়ে গুঁড়া করলে মচমচ করে ভাঙলে ঠিক আছে, নরম লাগলে আরও শুকান।
এবার মাপার কথা, যেটা নিজের জন্য বানানোর সময় কেউ করেন না। প্রতিটা উপকরণ ডিজিটাল ওজন যন্ত্রে গ্রামে মাপুন, মুঠো বা কাপে না। একটা ব্যাচ শিট রাখুন, খাতায় বা ফোনে, যেখানে প্রতি ব্যাচে লিখবেন তারিখ, ব্যাচ নম্বর, প্রতিটা তেল আর ভেষজের ওজন, কোন সাপ্লায়ার, কতক্ষণ কত আঁচে জ্বাল দিলেন, ছাঁকার পর কত মিলি পেলেন, আর কয়টা বোতল হলো। শিটটা লিখুন সেই দিনেই, পরের দিন না। দুই মাস পরে কোনো কাস্টমার "এবারের তেলের গন্ধ অন্যরকম" বললে এই খাতা দেখেই বুঝবেন কী বদলেছিল।
জ্বাল দেওয়ার কাজটা ধীরে করুন। মোটা তলার পাত্রে সবচেয়ে কম আঁচে ভেষজ তেলে ছাড়ুন, আর পাশে দাঁড়িয়ে থাকুন। ভেষজ একবার পুড়ে গেলে তেলে একটা পোড়া গন্ধ বসে যায়, যেটা কাস্টমার প্রথম দিনেই ধরেন, আর পরে কোনো সুগন্ধি দিয়ে ঢাকা যায় না। জ্বাল শেষে ঠান্ডা হতে দিন, পরিষ্কার পাতলা কাপড়ে ছাঁকুন, তারপর এক-দুই দিন ঢেকে রেখে দিন। নিচে যে তলানি আর পানির ফোঁটা জমবে, সেটা রেখে ওপরের পরিষ্কার তেলটা আলাদা পাত্রে ঢালুন।

মেয়াদ, গন্ধ আর তেল নষ্ট হওয়া
তেলের সবচেয়ে বড় শত্রু তিনটা, পানি, আলো আর গরম। পানি আসে কাঁচা ভেষজ বা ভেজা পাত্র থেকে, তাই প্রতিটা পাত্র, ফানেল আর বোতল পুরো শুকনো হতে হবে। আলো আর গরম তেলকে বাসি করে, যে গন্ধটাকে অনেকে বলেন "তেল চিটচিটে হয়ে গেছে"। তাই বোতল নিন বাদামি বা গাঢ় রঙের, আর স্টক রাখুন অন্ধকার, ঠান্ডা জায়গায়, রান্নাঘরের চুলার পাশে না।
মেয়াদ কত লিখবেন, এই প্রশ্নের উত্তর অন্য পেজ থেকে নেবেন না। প্রতিটা ব্যাচ থেকে একটা ছোট বোতল নমুনা হিসেবে রেখে দিন, গায়ে ব্যাচ নম্বর আর তারিখ লিখে। মাসে একবার নমুনাগুলো খুলে গন্ধ নিন আর আলোর সামনে রং দেখুন। যে মাসে গন্ধ বাসি হতে শুরু করে বা তলায় কিছু জমে, তার আগের সময়টাই আপনার তেলের আসল মেয়াদ। প্রথম বছরে এই কাজ বিরক্তিকর লাগবে, কিন্তু লেবেলের মেয়াদের তারিখটা তখন আপনার নিজের প্রমাণে দাঁড়াবে। কোনো কাস্টমার অভিযোগ করলে একই ব্যাচের নমুনাটাও আপনার হাতে থাকবে।
বোতল ভরার পর আরেকটা পরীক্ষা করুন, লিকের। ঢাকনা শক্ত করে লাগিয়ে বোতলগুলো এক রাত উল্টো করে একটা শুকনো কাগজের ওপর রাখুন। সকালে যে বোতলের নিচের কাগজে তেলের দাগ, তার ঢাকনা বা ড্রপার বদলান। কুরিয়ারে তেল লিক হলে শুধু বোতল না, পুরো পার্সেল নষ্ট হয়, আর কাস্টমার তেলতেলে বক্স হাতে নিয়েই আপনার সম্পর্কে মত ঠিক করে ফেলেন।

লাইসেন্স, BSTI না DGDA, কখন কোনটা
এখানে দুটো অফিসের কথা আসে, আর দুটো আলাদা কাজ দেখে। BSTI দেখে জিনিসটার মান, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর বা DGDA দেখে কসমেটিকস আর ওষুধের আইন।
BSTI-র দিকটা পরিষ্কার। ২০২৬ সালের ১২ অক্টোবর BSTI-র ওয়েবসাইটের বাধ্যতামূলক লিস্টের পেজে ৩ জুন ২০২৫-এর ৩১৫টা জিনিসের মূল লিস্ট আছে, তার রাসায়নিক অংশে হেয়ার অয়েল আলাদা নামে লেখা, মানদণ্ড নম্বর BDS 1339:2018। পরে ২০২৬ সালে দুই দফায় আরও ২০টা যোগ হয়েছে, জানুয়ারিতে ১৩টা আর জুনে ৭টা। মানে দেশে হেয়ার অয়েল বানিয়ে বাজারে ছাড়লে BSTI-র CM লাইসেন্স লাগে, আর লাইসেন্স পাওয়ার পর লেবেলে BSTI-র মান চিহ্ন বসে। লাইসেন্সের জন্য কী কী কাগজ, কত ফি, সেটা BSTI-র সিএম উইংয়ের ফি-র তালিকায় আর ওয়ান স্টপ সার্ভিসে জেনে নিন। ট্রেড লাইসেন্সটা তো আগে লাগবেই।
DGDA-র দিকটা একটু জটিল, তাই ধীরে বলি। ঔষধ ও কসমেটিকস্ আইন, ২০২৩-এর ৩১ ধারায় কসমেটিকস বানানো, বিতরণ, আমদানি আর রপ্তানির জন্য লাইসেন্সের কথা আছে, আর ৩২ ধারায় প্রতিটা কসমেটিকসের রেজিস্ট্রেশনের কথা। কিন্তু কে কোন লাইসেন্স পাবেন, ফি কত, এসব ঠিক হবে বিধিমালায়। ২০২৬ সালের জুনে কসমেটিকসের লাইসেন্স আর রেজিস্ট্রেশনের বিধিমালার একটা খসড়া মতামতের জন্য স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের ওয়েবসাইটে এসেছিল, কিন্তু ১২ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত চূড়ান্ত বিধিমালা গেজেটে আসতে দেখা যায়নি। বিধিমালার ড্রাফট আর কসমেটিকসের লাইসেন্সের সাধারণ কথা অনলাইন কসমেটিকস ব্যবসার লেখায় আছে, সেই কথা আর এখানে টানছি না।
হেয়ার অয়েলের বেলায় আসল প্রশ্নটা অন্য জায়গায়, আপনার তেল আইনের চোখে কসমেটিকস, নাকি ওষুধ। একই আইনে ঔষধের সংজ্ঞায় দুটো কথা আছে। রোগ সারানো, কমানো বা ঠেকানোর জন্য যেকোনো উপাদান ওষুধ, আর ইউনানী, আয়ুর্বেদিক, হারবাল পদ্ধতিতে বানানো উপাদানও ওষুধের সংজ্ঞায় পড়ে। মানে বোতলে বা অ্যাডে যদি লেখেন "আয়ুর্বেদিক ওষুধ" বা "খুশকির চিকিৎসা", তাহলে আপনি নিজেই তেলটাকে ওষুধের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন, যার লাইসেন্স আলাদা আর অনেক কঠিন। সাধারণ চুলে মাখার তেল হিসেবে বেচলে, আর সেভাবেই লিখলে, আপনি কসমেটিকসের সীমার ভেতরে থাকেন।
এই সীমা কোথায় টানা হবে, শেষ কথা বলবে BSTI আর DGDA, আমি না। কোন ধরনের লেখা বা নামে আপনার তেল কোন দিকে পড়ে, সন্দেহ থাকলে লেবেলের নকশা হাতে নিয়ে জেলার ঔষধ প্রশাসন অফিসে যান, আর অফিসার কী বললেন সেটা দিন-তারিখসহ খাতায় লিখুন।
লেবেলে কী লিখতেই হবে
ছোট বোতলে জায়গা কম, তাই অনেকে শুধু দোকানের নাম আর একটা সুন্দর ছবি দিয়ে লেবেল বানান। এটা চলবে না। নিচের ঘরগুলো রাখুন, আর ছাপার আগে BSTI-কে দেখিয়ে নিন, কারণ CM লাইসেন্সের আবেদনে লেবেলও দেখা হয়।
- তেলের নাম, যেমন "হেয়ার অয়েল", সাথে আপনার ব্র্যান্ডের নাম। "ওষুধ" বা "চিকিৎসা" শব্দ না।
- উপাদানের পুরো লিস্ট, পরিমাণে যেটা বেশি সেটা আগে।
- নিট পরিমাণ, মিলিতে।
- ব্যাচ নম্বর, ব্যাচ শিটের সাথে মিলিয়ে।
- বানানোর তারিখ আর মেয়াদের তারিখ।
- কে বানিয়েছেন, পুরো নাম আর ঠিকানা, ফোন নম্বর।
- কীভাবে মাখবেন, আর "শুধু বাইরে মাখার জন্য, চোখে লাগবে না"।
- প্রথমবার মাখার আগে কানের পেছনে বা হাতের কব্জিতে একটু লাগিয়ে এক দিন দেখে নেওয়ার কথা।
- সর্বোচ্চ খুচরা দাম (MRP), আর CM পাওয়ার পর BSTI-র মান চিহ্ন।
লেবেলের লেখা সত্যি হতে হবে, আর সেটা আপনার ব্যাচ শিটের সাথে মিলতে হবে। শিটে যদি তিলের তেল না থাকে, লেবেলে তিলের তেল লিখবেন না, শুনতে ভালো লাগলেও। আর লেবেল প্রিন্ট করুন দুই-তিন মাসের মতো, হাজার হাজার না, কারণ CM-এর সময় BSTI কিছু বদলাতে বললে পুরনো লেবেল ফেলে দিতে হবে।

১০০ মিলির দাম কত রাখবেন (উদাহরণ)
তেলের খরচ কম দেখে অনেকে দাম কম রাখেন, তারপর মাস শেষে দেখেন অ্যাড আর বোতলেই লাভ শেষ। পুরো হিসাবটা একবার করে নিন।
উদাহরণ। সংখ্যাগুলো একটা নমুনা হিসাব, আপনার তেল, বোতল আর অ্যাডের খরচ আলাদা হবে। ধরুন এক ব্যাচে নারকেল আর তিলের তেল, শুকনো ভেষজ আর গ্যাস মিলিয়ে খরচ হলো ৭৫০ টাকা, আর ছাঁকার পর তেল পেলেন ১,০০০ মিলি। তাহলে ১০০ মিলি তেলের খরচ ৭৫ টাকা। বাদামি বোতল আর ঢাকনা ৩৫ টাকা, লেবেল ৮ টাকা, ছোট বক্স ১২ টাকা। লাইসেন্স আর ল্যাবের খরচ ভাগ করে প্রতি বোতলে ধরলেন ২০ টাকা। অ্যাডের খরচ প্রতি ডেলিভারি হওয়া অর্ডারে ১২০ টাকা, ফেরত পার্সেলের লোকসান ভাগ করে ৩০ টাকা, ডেলিভারি চার্জ কাস্টমার দেন।
| খরচের খাত | এক বোতল, ৪৫০ টাকায় | দুই বোতলের প্যাক, ৮৫০ টাকায় |
|---|---|---|
| তেল আর ভেষজ | ৭৫ | ১৫০ |
| বোতল, লেবেল আর বক্স | ৫৫ | ১১০ |
| লাইসেন্স আর ল্যাবের ভাগ | ২০ | ৪০ |
| অ্যাড, প্রতি ডেলিভারি হওয়া অর্ডারে | ১২০ | ১২০ |
| ফেরত পার্সেলের লোকসান, ভাগ করে | ৩০ | ৩০ |
| COD চার্জ (ধরুন ১%) | ৫ | ৯ |
| মোট খরচ | ৩০৫ | ৪৫৯ |
| হাতে থাকে | ১৪৫ | ৩৯১ |
তেলের খরচ মাত্র ৭৫ টাকা, অথচ এক বোতলে হাতে থাকছে ১৪৫, কারণ অ্যাডের ১২০ টাকা একটা বোতলের ঘাড়েই বসে আছে। দুই বোতলের প্যাকে সেই ১২০ টাকা দুই ভাগ হয়, তাই হাতে থাকে ৩৯১, আড়াই গুণেরও বেশি। এজন্য অ্যাডে সামনে রাখুন দুই বোতলের প্যাক, এক বোতল রাখুন যাঁরা প্রথমবার চেখে দেখবেন তাঁদের জন্য।
আর পুরনো কাস্টমার নিজে থেকে আবার নিলে অ্যাডের খরচ নেই, তখন এক বোতলেই হাতে থাকে ২৬৫ টাকা। তাই এই ব্যবসার আসল কাজ রিফিলের দিনটা ধরা। ডেলিভারির কয়েক দিন পরে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করুন গন্ধ কেমন লাগল, তেল ভারী না হালকা, আর ১০০ মিলি সাধারণত কয় দিনে ফুরায়। কাকে আগে ফোন দেবেন আর কী বলবেন, পুরো স্ক্রিপ্ট আছে পুরনো কাস্টমারকে আবার বিক্রির লেখায়।
যাঁরা অনেক কাস্টমার নিয়ে কাজ করেন, তাঁদের জন্য এই মনে করানোর কাজটা হাতে রাখা কঠিন। WinningSeller-এর "রিপিট সেল" মেনুর "অটো ফলোআপ"-এ "আবার লাগবে? মনে করিয়ে দিন" নামে একটা টিক আছে। নিজের SMS অ্যাকাউন্ট জুড়ে টিকটা চালু করে নিলে ডেলিভারির নির্দিষ্ট দিন পরে কাস্টমারের কাছে একটা SMS নিজে থেকে যায়, শুরুতে ২০ দিন দেওয়া থাকে, আর দিনটা আপনি বদলাতে পারেন। দিনটা পুরো দোকানের জন্য একটা, তাই আপনার কাস্টমারদের ১০০ মিলি গড়ে যতদিনে ফুরায়, তার কয়েক দিন আগে দিন। SMS যায় সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টার মধ্যে, খরচ যায় আপনার নিজের SMS ব্যালেন্স থেকে। আর প্রোডাক্টে "এক বোতল" আর "দুই বোতলের প্যাক" দুটো অপশন রাখলে ল্যান্ডিং পেজের অর্ডার ফর্মে প্রতিটা অপশন নিজের দামসহ আলাদা প্যাকেজ কার্ড হয়ে দেখায়, কাস্টমার এক চাপে বেছে নেন। সব ফিচার একসাথে দেখতে চাইলে এই পেজটা খুলুন।

যে দাবি লিখলে অ্যাড বন্ধ আর আইনের ঝামেলা
হেয়ার অয়েলের পেজে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় তিন রকম দাবি। রোগ সারানোর দাবি, যেমন "চুল পড়া চিরতরে বন্ধ", "টাক মাথায় নতুন চুল"। নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট ফলের দাবি, যেমন "৩০ দিনে চুল দুই ইঞ্চি লম্বা"। আর আগে-পরের ছবি। তিনটাই বিপদ, তিন দিক থেকে।
প্রথম বিপদ আইনের। ঔষধ ও কসমেটিকস্ আইন, ২০২৩-এর ৭১ ধারার প্রথম উপধারায় লেখা আছে, লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষের আগাম অনুমোদন ছাড়া আরোগ্য বা চিকিৎসার দাবিসহ কোনো বিজ্ঞাপন প্রচার করা যাবে না। দ্বিতীয় উপধারায় আছে, কসমেটিকস যিনি বানান বা বেচেন, তাঁর বিজ্ঞাপনে কসমেটিকস মাখার পরের ফল নিয়ে ভুল বা অসত্য দাবি থাকা চলবে না। মানে ফেসবুক পোস্টে "চুল পড়া বন্ধ" লেখা মানেই আপনি এই ধারার সামনে দাঁড়িয়ে।
দ্বিতীয় বিপদ Meta-র। ২০২৬ সালের ১২ অক্টোবর Meta-র Advertising Standards-এর Health and Wellness অংশে লেখা আছে, চেহারা নিয়ে মানুষকে ছোট করে দেখানো কথা কসমেটিক অ্যাডে চলবে না, আর আগে-পরের পরিবর্তন দেখানো কসমেটিক অ্যাড শুধু ১৮ বছরের বেশি বয়সীদের দেখানো যায়। চুলের সাধারণ প্রোডাক্টের অ্যাডে বয়সের এই সীমা খাটে না, কিন্তু আগে-পরের ছবি দিলেই আপনি ওই নিয়মের ভেতরে ঢুকে পড়েন। বাস্তবে "টাক মাথা নিয়ে আর লজ্জা নয়" জাতীয় লাইন আর রোগ সারানোর কথা থাকলে অ্যাড রিজেক্ট হওয়া খুব সাধারণ ঘটনা, আর বারবার রিজেক্টে অ্যাড অ্যাকাউন্ট ঝুঁকিতে পড়ে। কোন লাইনে কেন রিজেক্ট হয় আর রিজেক্ট হলে কী করবেন, সেটা ফেসবুক অ্যাড রিজেক্টের লেখায় বিস্তারিত আছে।
তৃতীয় বিপদ কাস্টমারের বিশ্বাসের। চুল পড়ার কারণ অনেক রকম, আর একটা তেল সবার জন্য একই ফল দেবে, এমন কথা কেউ সৎভাবে বলতে পারেন না। যিনি দাবি শুনে কিনলেন আর ফল পেলেন না, তিনি রিফিল কিনবেন না, উল্টো কমেন্টে লিখবেন।
তাহলে লিখবেন কী? লিখুন কী দিয়ে বানানো, কোন বেস তেল, কোন ভেষজ। তেলটা হালকা না ভারী, চটচটে কি না, গন্ধ কেমন। কীভাবে মাখবেন, কতক্ষণ রাখবেন, কীভাবে ধোবেন। এক বোতলে সাধারণত কতবার মাখা যায়। আর বানানোর একটা ছোট ভিডিও, যেখানে ওজন মাপা আর ছাঁকা দেখা যায়। এগুলো দাবি না, তথ্য, আর এই তথ্যই যাঁরা থাকবেন তাঁদের টানে। প্রোডাক্টের বর্ণনা কীভাবে সাজালে প্রশ্ন কমে আর বিশ্বাস বাড়ে, সেটা প্রোডাক্ট ডেসক্রিপশনের লেখায় উদাহরণসহ আছে।
আজই করে ফেলুন
- BSTI-র ওয়েবসাইটে বাধ্যতামূলক লিস্টের পেজটা খুলে হেয়ার অয়েলের লাইনটা নিজের চোখে দেখুন, আর ওয়ান স্টপ সার্ভিসের ফোন নম্বর খাতায় তুলুন।
- একটা ব্যাচ শিটের ঘর বানান, তারিখ, ব্যাচ নম্বর, প্রতিটা উপাদানের গ্রাম, আঁচ আর সময়, ছাঁকার পর কত মিলি।
- এখন যে তেল বানান, তার এক ব্যাচ গ্রামে মেপে আবার বানান, আর একটা নমুনা বোতল তারিখ লিখে তুলে রাখুন।
- আপনার পেজের পুরনো পোস্ট আর অ্যাডে "চুল পড়া", "গজায়", "সারায়" শব্দগুলো খুঁজে বের করুন, আর এডিট করুন।
- ওপরের টেবিলে নিজের তেল, বোতল আর অ্যাডের খরচ বসিয়ে এক বোতল আর দুই বোতলের হিসাব আবার করুন।
- দশটা বোতল এক রাত উল্টো রেখে লিক পরীক্ষা করুন, আর যে ঢাকনায় দাগ পড়ে সেই সাপ্লায়ারের বদলে আরেকটা খুঁজুন।
সাধারণ প্রশ্ন
হেয়ার অয়েল বিক্রি করতে কি BSTI লাইসেন্স লাগে?
নিজে বানিয়ে নিজের নামে বেচলে লাগে। ২০২৬ সালের ১২ অক্টোবর BSTI-র ওয়েবসাইটে ৩ জুন ২০২৫-এর ৩১৫টা জিনিসের বাধ্যতামূলক লিস্টে হেয়ার অয়েল আলাদা নামে আছে (BDS 1339), মানে এর জন্য BSTI-র CM লাইসেন্স লাগে। আবেদনের কাগজ আর ফি BSTI-র ওয়ান স্টপ সার্ভিস থেকে জেনে নিন।
হেয়ার অয়েল বানাতে কি কি লাগে?
একটা বা দুটো বেস তেল, যেমন নারকেল বা তিলের তেল, ভালো করে শুকানো ভেষজ, একটা ডিজিটাল ওজন মাপার যন্ত্র, মোটা তলার পাত্র, ছাঁকার পরিষ্কার কাপড়, আর আলো ঢোকে না এমন বোতল। সাথে একটা খাতা, যেখানে প্রতিটা ব্যাচের ওজন, তারিখ আর ব্যাচ নম্বর লিখবেন।
ঘরে বানানো হেয়ার অয়েল কতদিন ভালো থাকে?
এটা নির্ভর করে বেস তেল, ভেষজ কতটা শুকনো ছিল আর বোতল কোথায় রাখা হয় তার ওপর, তাই অন্যের কথায় মেয়াদ লিখবেন না। প্রতিটা ব্যাচ থেকে একটা ছোট নমুনা রেখে মাসে মাসে গন্ধ আর রং দেখুন। যে মাসে গন্ধ বদলাতে শুরু করে, তার আগের সময়টা দিয়ে নিজের মেয়াদ ঠিক করুন।
হেয়ার অয়েলের অ্যাডে "চুল পড়া বন্ধ" লেখা যায়?
না। ঔষধ ও কসমেটিকস্ আইন, ২০২৩-এর ৭১ ধারায় অনুমোদন ছাড়া আরোগ্য বা চিকিৎসার দাবিসহ বিজ্ঞাপন নিষেধ, আর কসমেটিকসের ফল নিয়ে ভুল দাবিও নিষেধ। Meta-ও এমন দাবিওয়ালা অ্যাড সাধারণত আটকে দেয়। লিখুন কী দিয়ে বানানো আর কীভাবে মাখবেন।
হারবাল হেয়ার অয়েলকে কি "আয়ুর্বেদিক" বলা যায়?
সাবধান থাকুন। ঔষধ ও কসমেটিকস্ আইন, ২০২৩-এ ঔষধের সংজ্ঞায় ইউনানী, আয়ুর্বেদিক আর হারবাল পদ্ধতিতে বানানো উপাদানের কথা আছে। নিজের তেলকে আয়ুর্বেদিক বা হারবাল ওষুধ বললে সেটা কসমেটিকস থেকে ওষুধের দিকে চলে যেতে পারে, যার জন্য আলাদা লাইসেন্স লাগে।
অল্প টাকায় কি হেয়ার অয়েলের ব্যবসা শুরু করা যায়?
তেল আর ভেষজের খরচ কম, তাই প্রথম ব্যাচ অল্প টাকায় হয়। আসল খরচ আসে লাইসেন্স, ল্যাবের পরীক্ষা, ভালো বোতল আর লেবেলে। এগুলো আগে হিসাবে ধরে নিন, তারপর বড় ব্যাচ বানান।
আরও পড়ুন
খেলনা ব্যবসার আইডিয়া, কোন খেলনা অনলাইনে চলে আর নিরাপত্তার নিয়ম
বাচ্চাদের খেলনা অনলাইনে বেচতে চাইলে কোন খেলনা চলে, চকবাজার থেকে প্রথম লট কীভাবে নেবেন, ২০২৬ সালে BSTI-র তালিকায় খেলনা আসার মানে কী, ব্যাটারির খেলনা চালিয়ে দেখা, মাপ বোঝানো ছবি আর না ভাঙার প্যাকিং, একটা লটের টাকার হিসাবসহ।
থ্রিফট শপিং কি? পুরনো বিদেশি জ্যাকেট-শার্টের থ্রিফট ব্যবসার নিয়ম
থ্রিফট শপিং কি, মাল কোথা থেকে আসে আর পুরনো কাপড় আমদানির নিয়ম কী বলে, গাইট খুলে বাছাই, ধোয়া আর ছবি, কন্ডিশন সত্যি করে লেখা, আর একটা গাইট থেকে এক পিসের দাম কীভাবে বের করবেন, হিসাবসহ।
অনলাইনে শাড়ির ব্যবসা, তাঁতের শাড়ি থেকে প্রথম লট, ছবি আর ফেরত
অনলাইনে শাড়ির ব্যবসা শুরু করবেন? কোন শাড়ি চলে, টাঙ্গাইলের হাট আর পাইকার, BSTI-র ২০২৬ সালের নতুন শাড়ির নিয়ম, মডেল ছাড়া শাড়ির ছবি, মাপ আর যত্নের কথা লেখা, আর একটা লটে কত থাকে, হিসাবসহ।


