কাস্টমারের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয়, ফোন আর ইনবক্সের রেডি লাইন
প্রথম মেসেজ থেকে দরজায় পার্সেল না নেওয়া পর্যন্ত আটটা মুহূর্তে কাস্টমারকে ফোনে আর ইনবক্সে ঠিক কী বলবেন, কোন কথা কখনো বলবেন না, আর দুজন মিলে রিপ্লাই দিলে ভাষা এক রাখবেন কীভাবে।

এই লেখায় যা আছে
- কাস্টমারের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয়, প্রথম মেসেজে কী লিখবেন?
- দাম জিজ্ঞেস করলে কী বলবেন?
- "দাম বেশি" বললে কী বলবেন?
- অর্ডার কনফার্মের ফোনে কী বলবেন?
- ডেলিভারি দেরি হলে ফোনে কী বলবেন?
- ভুল প্রোডাক্ট গেলে কী বলবেন?
- কাস্টমার দরজায় পার্সেল নিতে না চাইলে কী বলবেন?
- ডেলিভারির পরে কী বলবেন?
- যে কথাগুলো কখনো বলবেন না
- একাধিক মানুষ রিপ্লাই দিলে একই ভাষা রাখবেন কীভাবে?
কাস্টমারের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয়, তার মূল কথাটা ছোট। কাস্টমার যা জানতে চেয়েছেন তার সোজা উত্তর আগে দিন, তারপর একটা প্রশ্ন করে কথাটা অর্ডারের দিকে নিন। আর কোনো সমস্যা হলে আগে মেনে নিন কী ভুল হয়েছে, ব্যাখ্যা পরে। ফোনে হোক বা ইনবক্সে, বেশিরভাগ কাস্টমার রাগ করেন উত্তর না পেয়ে বা ঘোরানো উত্তর পেয়ে। আরেকটা বড় কারণ হলো, তাঁর মনে হয় দোষটা তাঁর ঘাড়েই চাপানো হচ্ছে।
প্রথম মেসেজ থেকে ডেলিভারির পরের খোঁজ পর্যন্ত আটটা মুহূর্ত আছে, যেখানে আপনি কীভাবে কথা বলছেন তার ওপর অর্ডার আসা বা চলে যাওয়া নির্ভর করে। নিচে প্রতিটার জন্য রেডি লাইন দিলাম। লাইনগুলো উদাহরণ, মুখস্থ করার স্ক্রিপ্ট না। নিজের দোকানের নাম, প্রোডাক্ট আর নিজের মুখের ভাষা বসিয়ে নিন।
কাস্টমারের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয়, প্রথম মেসেজে কী লিখবেন?
প্রথম মেসেজটাই ঠিক করে দেয় কাস্টমার আপনার সাথে কথা চালাবেন কি না। যিনি পোস্টে "price?" লিখেছেন, তিনি প্রায়ই আরও দুই-তিনটা পেজে একই প্রশ্ন করেছেন। যে পেজ আগে আর পরিষ্কার উত্তর দেয়, অর্ডারটা সাধারণত সেখানেই যায়। তাই প্রথম মেসেজে একটা ছোট সালাম দিন, তাঁর প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিন, আর শেষে একটা সহজ প্রশ্ন করুন।
ধরুন কেউ একটা পাঞ্জাবির পোস্টে দাম জানতে চেয়েছেন। এভাবে লিখুন।
"আসসালামু আলাইকুম ভাই, [দোকানের নাম]-এ মেসেজ দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। এই পাঞ্জাবিটার দাম ১,২৫০ টাকা, ঢাকার ভেতরে ডেলিভারি চার্জ [চার্জ] টাকা। আপনার কোন সাইজ লাগবে, M, L না XL?"
শেষের প্রশ্নটাই আসল কাজ করে। শুধু দাম বলে থেমে গেলে কাস্টমার "আচ্ছা" লিখে চলে যান, কারণ উত্তর দেওয়ার মতো কিছু তাঁর হাতে থাকে না। সাইজ জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তর দেন, আর সেই উত্তর দিতে দিতেই অর্ডারের অর্ধেক কাজ হয়ে যায়।
কমেন্টে কেউ দাম জানতে চাইলে শুধু "ইনবক্স চেক করুন" লিখবেন না। কমেন্টেই দামটা লিখে দিন, আর ইনবক্সে বাকি কথা পাঠান। দাম লুকিয়ে রাখলে মানুষ ভাবেন আপনি মানুষ দেখে দাম বলেন। আর ওই কমেন্ট যাঁরা পরে পড়েন, তাঁরাও দামটা জেনে যান, আলাদা করে আর জিজ্ঞেস করতে হয় না।
কাস্টমার যে ভাষায় লিখেছেন, সেই ভাষাতেই উত্তর দিন। কেউ ইংরেজি অক্ষরে বাংলা লিখলে আপনিও সেভাবে লিখুন, কারণ তিনি হয়তো ফোনে বাংলা টাইপ করেন না। সম্বোধন নিয়ে একটা ছোট নিয়ম রাখুন। নাম বা প্রোফাইল দেখে পুরুষ না মহিলা বুঝতে না পারলে আন্দাজ করবেন না, সম্বোধন ছাড়াই "জি" দিয়ে শুরু করুন। ভুল সম্বোধনে অনেকে বিরক্ত হন, সম্বোধন না থাকলে কেউ কিছু মনে করেন না।

দাম জিজ্ঞেস করলে কী বলবেন?
দাম বলার সময় সবচেয়ে বড় ভুল হলো শুধু প্রোডাক্টের দাম বলা, ডেলিভারি চার্জ পরে বলা। কাস্টমার মাথায় ১,২৫০ টাকা নিয়ে বসে থাকেন। তারপর দরজায় ডেলিভারিম্যান ১,৩৮০ টাকা চাইলে মনে হয় ঠকানো হচ্ছে, আর অনেকে তখনই পার্সেল ফেরত দেন। তাই প্রথমবারেই মোট টাকাটা বলুন।
"জি ভাই, পাঞ্জাবি ১,২৫০ টাকা। ডেলিভারি চার্জ ঢাকার ভেতরে [চার্জ] টাকা আর ঢাকার বাইরে [চার্জ] টাকা, সব টাকা পার্সেল হাতে পেয়ে দেবেন। আপনি কোন জেলায় আছেন? বললে মোট কত হবে সেটা বলে দিচ্ছি।"
জেলা জিজ্ঞেস করার কারণ আছে। জেলা জানলে আপনি মোট টাকাটা এক অঙ্কে বলতে পারেন, যেমন "তাহলে মোট ১,৩৮০ টাকা"। আর প্রশ্নটা শুনে কাস্টমার বুঝে যান আপনি অর্ডার নিতে তৈরি, তাই উত্তরের সাথে অনেকে ঠিকানাটাও লিখে দেন।
একই প্রোডাক্টের কয়েকটা সাইজ বা দাম থাকলে পুরো লিস্ট পাঠাবেন না। সবচেয়ে বেশি চলা দুটো অপশন বলুন, তারপর জিজ্ঞেস করুন কোনটা লাগবে। যেমন, "মধু আধা কেজি ৪৮০ টাকা আর এক কেজি ৮৫০ টাকা। বাসায় কয়জন খাবেন, সেটা বললে কোনটা নেবেন সেটা বলে দিতে পারি।" দুটোর বেশি অপশন একসাথে শুনলে মানুষ বেছে নিতে পারেন না, শেষে বলেন "পরে জানাব"।
দাম শুধু ছবিতে লিখে পাঠাবেন না। ছবি অনেকের ফোনে দেরিতে খোলে, আর পরে চ্যাট খুঁজতে গেলে লেখা দামটাই খুঁজে পাওয়া যায়। ছবির সাথে এক লাইনে দামটা লিখে দিন।
"দাম বেশি" বললে কী বলবেন?
এই কথাটা শুনলেই অনেক সেলার সাথে সাথে ৫০ বা ১০০ টাকা কমিয়ে দেন। এটা প্রায় সবসময় ভুল। প্রথম কথাতেই দাম কমালে কাস্টমার শেখেন যে আপনার দাম দর-কষাকষির জিনিস। আর কমেন্টে বা পরিচিতদের মধ্যে কথাটা ছড়ালে পরের কাস্টমাররাও একই কথা বলেন।
টাকায় দেখলে ক্ষতিটা বোঝা যায়। এটা একটা উদাহরণ, কোনো দোকানের আসল হিসাব না। ধরুন একটা থ্রি-পিস ১,৪৫০ টাকায় বেচেন, আর কেনা দাম, প্যাকেট আর অ্যাড বাদ দিলে হাতে থাকে ৩৫০ টাকা। ১৫০ টাকা ছাড় দিলে থাকে ২০০ টাকা। মানে একটা বাক্য বলতেই ৩৫০ টাকার লাভ থেকে প্রায় ৪৩% চলে গেল।
তাই সাথে সাথে দাম না কমিয়ে আগে কাস্টমারের কথাটা মেনে নিন, তারপর দামের কারণটা সত্যি কথায় বলুন।
"জি আপা, বুঝতে পারছি, বাজারে এর চেয়ে কম দামেও থ্রি-পিস পাওয়া যায়। আমাদেরটা সুতি কাপড়, ধোয়ার পরে রং ওঠে না, আর জামার কাপড় পুরো আড়াই গজ। কম দামেরগুলোতে সাধারণত কাপড় কম থাকে। আপনি চাইলে কাপড়ের কাছ থেকে তোলা ছবি পাঠাই, দেখে নেন।"
খেয়াল করুন, এই উত্তরে আপনি কাস্টমারের কথাটা উড়িয়ে দেননি, মেনে নিয়ে দামের পেছনের কারণটা দেখিয়েছেন। আর শেষে ছবি পাঠানোর কথা বলে কথাটা চালু রেখেছেন, তাই কাস্টমারের হাতে উত্তর দেওয়ার মতো কিছু থাকে। আপনার প্রোডাক্টের সত্যিকারের পার্থক্যটা কী, সেটা আগে থেকে দুই লাইনে লিখে রাখুন। যা সত্যি না, যেমন "একদম অরিজিনাল ইমপোর্টেড" অথচ লোকাল, সেটা কখনো বলবেন না। পার্সেল খুলে মিল না পেলে সেই কাস্টমার শুধু ফেরতই দেন না, পেজে লিখেও দেন।
দাম না কমিয়েও কিছু দেওয়া যায়, যদি আপনার মার্জিনে কুলায়। ছোট সাইজ থাকলে সেটার কথা বলুন। কেউ দুটো নিলে ডেলিভারি চার্জ ছেড়ে দিতে পারেন, কারণ দুটো প্রোডাক্ট এক পার্সেলে গেলে আপনার কুরিয়ার খরচ একবারই লাগে। ছাড় দিলে সেটা সবার জন্য একই রাখুন, পোস্টে লিখে দিন। একজনকে চুপিচুপি কম দিলে অন্যজন জানতে পারলে দুজনকেই হারাবেন।
দুইবার বোঝানোর পরও যিনি "আরো কম" বলেন, তাঁকে ভালোভাবে ছেড়ে দিন। "আপা, এর চেয়ে কম দিলে কাপড়ের মান কমাতে হবে, সেটা আমি করতে চাই না। পরে কখনো দরকার হলে এই মেসেজেই নক দিয়েন।" এভাবে শেষ করলে অনেকে কয়েক দিন পরে নিজেই ফিরে আসেন। রাগ করে শেষ করলে আর কখনো আসেন না।
অর্ডার কনফার্মের ফোনে কী বলবেন?
কনফার্ম কলের কাজ হলো অর্ডারটা ঠিক আছে কি না মিলিয়ে নেওয়া, কাস্টমারকে জেরা করা না। মোট টাকাটা মুখে বলুন, ঠিকানার থানা আর জেলা পড়ে শোনান, আর বলুন কুরিয়ার থেকে ফোন আসবে। পুরো স্ক্রিপ্ট আর কোন লক্ষণে সাবধান হবেন, সেটা ফেক অর্ডার আর রিটার্ন কমানোর লেখায় বিস্তারিত আছে, এখানে শুধু কথার ধরনটা বলছি।
ফোনে কাস্টমারের গলায় দ্বিধা শুনলে চেপে ধরবেন না। বরং তাঁকে না বলার সুযোগ দিন।
"ভাই, একটা কথা বলি। এখন যদি নিতে না চান, এখনই বলে দিলে আমার কোনো সমস্যা নেই। পার্সেল পাঠানোর পরে ফেরত এলে আপনারও ঝামেলা, আমারও খরচ।"
শুনতে উল্টো মনে হলেও অনেক সেলার দেখেছেন, এই লাইন ফেরত কমায়। যিনি সত্যিই নেবেন, তিনি বলেন "না না, নেব", আর কথাটা মুখে বলার পরে পার্সেলও রাখেন। যিনি নেবেন না, তিনি এখানেই বলে দেন, আর আপনার একটা পার্সেলের যাওয়া-আসার চার্জ বেঁচে যায়।
ডেলিভারি দেরি হলে ফোনে কী বলবেন?
দেরিতে কাস্টমার যতটা রাগেন, তার চেয়ে বেশি রাগেন চুপ থাকায়। তিনি তিন দিন অপেক্ষা করে নিজে ফোন দিলেন, আর আপনি বললেন "দেখছি", এখানেই আস্থা ভাঙে। তাই নিয়মটা সহজ। কথা দেওয়া দিনে পার্সেল না পৌঁছালে কাস্টমার ফোন দেওয়ার আগেই আপনি ফোন দিন।
"আসসালামু আলাইকুম ভাই, [দোকানের নাম] থেকে বলছি। আপনার পাঞ্জাবিটা গতকাল পৌঁছানোর কথা ছিল, পৌঁছায়নি, এজন্য দুঃখিত। কুরিয়ারে খোঁজ নিয়েছি, পার্সেলটা এখন [শহর]-এ আছে, বৃহস্পতিবারের মধ্যে আপনার হাতে যাওয়ার কথা। বৃহস্পতিবার বিকেলেও না পৌঁছালে আমি নিজে আপনাকে ফোন দেব।"
খেয়াল করুন, ফোনটা শুরু হয়েছে দেরির দায় নিয়ে, আর শেষ হয়েছে নতুন একটা দিন দিয়ে। মাঝখানে পার্সেলটা এখন কোথায় সেটাও বলে দিয়েছেন, তাই কাস্টমারকে আর কিছু জিজ্ঞেস করতে হয় না। "কুরিয়ারের দোষ" কথাটা নেই, কারণ কাস্টমার কুরিয়ারকে টাকা দেননি, আপনাকে দিয়েছেন। নতুন দিন দেওয়ার সময় যেটা সত্যিই পারবেন সেটাই বলুন, দরকার হলে এক দিন বাড়িয়ে বলুন। "আজকেই পাবেন" বলে আবার না পৌঁছালে দ্বিতীয় ফোনটা প্রথমটার চেয়ে অনেক কঠিন হয়।
ইনবক্সে কেউ "আমার পার্সেল কই???" লিখলে লম্বা দুঃখের মেসেজ দেবেন না। আগে কাজের তথ্যটা দিন।
"জি ভাই, দেখছি। আপনার পার্সেল [কুরিয়ারের নাম]-এ আছে, ট্র্যাকিং লিংক [লিংক]। আজ [এলাকা]-এর হাবে পৌঁছেছে, কাল ডেলিভারিম্যান ফোন দেবেন। দেরির জন্য দুঃখিত।"
ঈদ বা কোনো অনুষ্ঠানের জিনিসে দেরি হলে আরেকটা কথা ভাবুন। ঈদের পরে পৌঁছানো ঈদের পাঞ্জাবি কাস্টমারের আর কাজে আসে না। তখন নিজে থেকেই জিজ্ঞেস করুন তিনি এখনো নেবেন কি না। জোর করে পাঠালে পার্সেল ফেরত আসবে, সাথে একজন কাস্টমারও হারাবেন।
কাস্টমার পুরো টাকা অগ্রিম দিয়ে থাকলে দেরির ব্যাপারটা আরও সাবধানে সামলান। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১ বলছে, পুরো দাম আগে নেওয়া থাকলে কাস্টমার একই শহরের হলে ৫ দিনের মধ্যে, আর অন্য শহর বা গ্রামের হলে ১০ দিনের মধ্যে ডেলিভারি দিতে হবে। দিতে না পারলে টাকাটা ফেরত দিতে হবে সেই মাধ্যমেই, যেটা দিয়ে কাস্টমার পেমেন্ট করেছিলেন, যেমন bKash-এ নিলে bKash-এ। ফেরতের জন্যও নির্দেশিকায় ১০ দিনের সময় বাঁধা আছে। তাই অগ্রিম নেওয়া অর্ডারে "দেখি কবে পারি" বলার সুযোগ নেই।
ভুল প্রোডাক্ট গেলে কী বলবেন?
ভুল সাইজ, ভুল রং বা ভাঙা প্রোডাক্ট পৌঁছালে কাস্টমারের প্রথম মেসেজটা সাধারণত রাগের হয়। এখানে প্রথম লাইনে "কিন্তু" রাখবেন না। "দুঃখিত, কিন্তু আমরা তো পাঠানোর আগে চেক করি" শুনলে কাস্টমার শোনেন শুধু শেষের অংশটা, মানে আপনি বলছেন তিনি মিথ্যা বলছেন।
"আপা, এটা আমাদের ভুল, সত্যিই দুঃখিত। কী এসেছে, তার একটা ছবি পাঠাবেন? দেখে আজই ঠিক সাইজটা পাঠানোর ব্যবস্থা করছি। আগেরটা ফেরত নেওয়া আর নতুনটা পাঠানোর চার্জ আমরা দেব, আপনার কোনো টাকা লাগবে না।"
ছবি চাওয়ার কারণটা কাস্টমারকে প্রমাণ দেখাতে বলা না। ছবি দেখে আপনি বোঝেন ভুলটা প্যাকিংয়ে হলো, সাপ্লায়ারের দিক থেকে, নাকি কুরিয়ারে। পরের বার একই ভুল না হওয়ার জন্য এটা দরকার। তাই ছবিটা চাইবেন অনুরোধের সুরে, সন্দেহের সুরে না।
ভুলটা আপনার দিক থেকে হলে চেঞ্জের দুই দিকের চার্জ আপনিই দিন। টাকাটা গায়ে লাগে, এটা ঠিক। কিন্তু এখানে কাস্টমারের কাছে চার্জ চাইলে তিনি ভাবেন আপনার ভুলের শাস্তি তিনি পাচ্ছেন। এমন কাস্টমার সাধারণত আর কেনেন না, আর কমেন্টে লিখে যান। আর যদি কাস্টমার নিজেই ভুল সাইজ বলে থাকেন, তাহলেও ঝগড়া না করে চ্যাটটা দেখিয়ে নরম করে বলুন, "আপা, অর্ডারে L লেখা ছিল, স্ক্রিনশট দিলাম। সমস্যা নেই, চেঞ্জ করে দিচ্ছি, শুধু এবারের ডেলিভারি চার্জটা লাগবে।"
কাস্টমার দরজায় পার্সেল নিতে না চাইলে কী বলবেন?
অনেক সময় ডেলিভারিম্যান ফোন দিয়ে বলেন, কাস্টমার পার্সেল নিচ্ছেন না। এই মুহূর্তে দুই মিনিটের একটা ফোন একটা ফেরত বাঁচাতে পারে। ডেলিভারিম্যানকে বলুন একটু অপেক্ষা করতে, তারপর কাস্টমারকে ফোন দিন। আগে শুধু কারণটা জিজ্ঞেস করুন, শান্ত গলায়।
"আসসালামু আলাইকুম ভাই, [দোকানের নাম] থেকে বলছি। ডেলিভারিম্যান বললেন পার্সেলটা নিচ্ছেন না। কোনো সমস্যা হয়েছে? একটু বলবেন, যদি আমি ঠিক করতে পারি।"
কারণ শুনে উত্তরটা বদলাবে। "এত টাকা কেন" বললে মোট টাকাটা ভেঙে বলুন, প্রোডাক্ট কত আর চার্জ কত। "বাসায় নেই" বললে জিজ্ঞেস করুন কাল কখন থাকবেন, আর সেটা কুরিয়ারকে জানান। "ছবির সাথে মিলছে না" বললে জিজ্ঞেস করুন কোন জায়গাটা মিলছে না, আর আপনার নিয়মে চেঞ্জ করা যায় কি না বলুন। "আমি অর্ডারই করিনি" বললে তর্ক করবেন না, "আচ্ছা ভাই, দুঃখিত বিরক্ত করার জন্য" বলে রেখে দিন, আর নম্বরটা নোটে লিখে রাখুন।
ছোট একটা ছাড় দিয়ে পার্সেল বাঁচানো লাভের কি না, সেটা টাকায় দেখে নিন। এটাও একটা উদাহরণ, নিজের কুরিয়ারের চার্জ বসিয়ে মিলিয়ে নিন। ধরুন ঢাকার বাইরের একটা পার্সেলে যাওয়ার চার্জ ১৩০ টাকা। ফেরত এলে ধরুন আরও ৬৫ টাকা রিটার্ন চার্জ, আর নষ্ট প্যাকেটে ২০ টাকা। তাহলে একটা ফেরতে আপনার যায় ২১৫ টাকা, আর প্রোডাক্টটা এক সপ্তাহের মতো স্টকের বাইরে থাকে। কাস্টমার যদি বলেন ডেলিভারি চার্জটা বেশি লাগছে, আর আপনি ৫০ টাকা ছেড়ে দিয়ে পার্সেলটা রাখান, তাহলে আপনার খরচ ৫০ টাকা, ২১৫ টাকা না।
তবে এটা নিয়ম বানাবেন না। যিনি প্রতিবার দরজায় গিয়ে দর-কষাকষি করেন, তাঁর পরের অর্ডারে ডেলিভারি চার্জ অগ্রিম নিন। আর কোনো অবস্থাতেই হুমকি দেবেন না। "আপনার নম্বর সব কুরিয়ারে ব্লক করে দেব" বা "আপনার নামে কেস করব" বললে পার্সেল তো ফেরত আসবেই, সাথে ফোনের রেকর্ডিং বা স্ক্রিনশট ফেসবুকে ঘুরতে পারে।
ডেলিভারির পরে কী বলবেন?
পার্সেল ডেলিভারি হলে সেদিনই একটা ছোট মেসেজ দিন। এতে বিক্রির কোনো কথা থাকবে না, শুধু ধন্যবাদ আর সমস্যা হলে কোথায় জানাবেন।
"ভাই, পার্সেলটা পেয়েছেন জেনে ভালো লাগল, অনেক ধন্যবাদ। পরে কোনো সমস্যা দেখলে এই নম্বরে বা পেজে জানাবেন, আমরা ঠিক করে দেব।"
এই মেসেজের কাজ দুটো। সমস্যা থাকলে কাস্টমার রাগ জমিয়ে কমেন্টে না লিখে আগে আপনাকে বলেন। আর ভালো লাগলে তিনি মনে রাখেন দোকানটা টাকা নেওয়ার পরেও খোঁজ নেয়। পছন্দ হয়েছে বললে বলুন, "পেজে দুই লাইন লিখে দিলে খুব খুশি হব।" কয়টা স্টার দিতে হবে সেটা বলবেন না, মানুষ নিজের মতো লিখলেই রিভিউটা বিশ্বাসযোগ্য হয়।
এক সপ্তাহের মতো পরে প্রোডাক্টটা কেমন লাগল জানতে একটা ফোন, আর জিনিসটা শেষ হওয়ার আগে আরেকটা, এই দুটো ফোনই আবার বিক্রির আসল রাস্তা। কোন কাস্টমারকে কবে ফোন দেবেন আর ফোনে পুরো কী বলবেন, সেটা আলাদা করে লিখেছি পুরনো কাস্টমারকে আবার বিক্রি করার লেখায়।
যে কথাগুলো কখনো বলবেন না
কিছু কথা একবার বললেই কাস্টমার চলে যান, আর ফিরে আসেন না। এগুলোর বেশিরভাগ রাগের মাথায় বা ক্লান্ত অবস্থায় মুখ থেকে বের হয়। তাই আগে থেকে চিনে রাখুন।
- "ইনবক্স চেক করুন", উত্তর না দিয়ে। কাস্টমার প্রশ্ন করেছেন, আপনি তাঁকে আরেকটা কাজ দিলেন। অনেকে ইনবক্সে যান না, অন্য পেজে চলে যান।
- "এটা কুরিয়ারের দোষ, আমাদের কিছু করার নেই।" কাস্টমারের চোখে কুরিয়ার আপনার লোক। দোষ যারই হোক, সমাধানটা আপনাকেই দিতে হবে।
- "অন্য সবাই তো নিচ্ছে, আপনার সমস্যা কী?" এতে কাস্টমারকে বোকা বলা হয়। তিনি তর্কে হারলেও অর্ডারটা দেবেন না।
- "অর্ডার করেছেন, এখন নিতেই হবে।" আইনের ভয় দেখিয়ে পার্সেল রাখানো যায় না, শুধু শত্রু বানানো যায়।
- কাস্টমারের শরীর নিয়ে মন্তব্য। "আপনার তো XL লাগবে মনে হয়" বা "আপনার স্কিন তো কালো, এটাই লাগবে" কথাগুলো অপমানের মতো শোনায়। মাপ জিজ্ঞেস করুন, অনুমান করবেন না।
- "আপনার রেকর্ড খারাপ।" ফ্রড চেকে নম্বরের রেকর্ড খারাপ দেখালেও মুখে বলবেন না, শুনলে মানুষ অপমানিত হন। শুধু বলুন, "আপনার এলাকায় আমরা ডেলিভারি চার্জটা আগে নিই।"
- মিথ্যা তাড়া। "আর মাত্র ২টা আছে" বললে তখনই বলুন যখন সত্যিই ২টা আছে। একবার ধরা পড়লে আপনার পরের সব কথাই কাস্টমার অবিশ্বাস করেন।
সময়ের একটা নিয়মও রাখুন। রাত ১০টার পরে অফার বা ফলোআপের ফোন দেবেন না, শুধু কাস্টমার নিজে মেসেজ দিলে উত্তর দিন। আর রাজনীতি, ধর্ম বা অন্য পেজের নিন্দা নিয়ে কোনো কথায় ঢুকবেন না, কাস্টমার নিজে তুললেও না।
একাধিক মানুষ রিপ্লাই দিলে একই ভাষা রাখবেন কীভাবে?
দোকান একটু বড় হলে আপনি একা ইনবক্স আর ফোন সামলাতে পারবেন না। তখন একজন ছোট ভাই বা স্টাফ রিপ্লাই দেওয়া শুরু করেন। সমস্যা হয় যখন একই কাস্টমার সকালে একজনের কাছে এক দাম শোনেন, বিকেলে আরেকজনের কাছে আরেক দাম। তখন কাস্টমার ভাবেন দোকানটা গোছানো না, অথবা কেউ মিথ্যা বলছে।
প্রথম কাজ হলো রেডি লাইনগুলো এক জায়গায় লিখে ফেলা। এই লেখার আটটা মুহূর্তের লাইন নিজের ভাষায় বদলে একটা Google Doc বা খাতায় রাখুন। তারপর যে লাইনগুলো দিনে বারবার লাগে, সেগুলো ফেসবুক পেজের saved replies (Meta Business Suite-এর ইনবক্সে পাবেন) আর WhatsApp Business-এর কুইক রিপ্লাইতে সেভ করুন। তাহলে কাউকে তাড়াহুড়োয় নতুন করে টাইপ করতে হয় না, আর ভুল দামও লেখা হয় না। অর্ডারের তথ্য একবারে নেওয়ার মেসেজ আর কনফার্মেশন মেসেজ কীভাবে লিখবেন, সেটা হোয়াটসঅ্যাপে অর্ডার নেওয়ার নিয়মের লেখায় টেমপ্লেটসহ আছে।

দ্বিতীয় কাজ হলো কে কী সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন, সেটা ঠিক করে দেওয়া। যেমন ধরুন, ডেলিভারি চার্জ ছাড় বা ৫০ টাকার বেশি ছাড় শুধু মালিক দেবেন। রিফান্ডের সিদ্ধান্তও নেবেন শুধু মালিক। এসব কথা উঠলে বাকিরা বলবেন, "ভাই, এটা আমি আমাদের ম্যানেজারের সাথে কথা বলে এক ঘণ্টার মধ্যে জানাচ্ছি।" এই নিয়ম না থাকলে নরম মনের স্টাফ সবাইকে ছাড় দেন, আর কড়া মনের স্টাফ কাউকেই দেন না।
তৃতীয় কাজ হলো কাস্টমারকে দেওয়া প্রতিটা কথা লিখে রাখা। "বৃহস্পতিবার ফোন দেব" বা "চেঞ্জের চার্জ আমরা দেব", এমন কথা দিলে অর্ডারের নোটে লিখুন। পরের জন রিপ্লাই দেওয়ার আগে নোটটা পড়ে নেবেন। একই কথা দুজনকে দুবার বোঝাতে হলে কাস্টমার খুব বিরক্ত হন, আর ভাবেন দোকানে কেউ কারও খবর রাখে না।
শেষে সপ্তাহে একবার পনেরো মিনিট বসুন। সেই সপ্তাহের দশটা চ্যাট বা ফোনের নোট একসাথে পড়ুন। কোথায় কাস্টমার রেগে গেলেন, কোন লাইনে অর্ডার এলো, সেটা দেখে খাতার লাইনগুলো ঠিক করুন। এভাবে কয়েক সপ্তাহ চালালে আপনার দোকানের নিজস্ব একটা ভাষা দাঁড়িয়ে যায়, যেটা যে-ই রিপ্লাই দিক, একই শোনায়।
ফোনের কাজটা খাতা থেকে সিস্টেমে নিতে চাইলে WinningSeller-এর ফলোআপ কল সিস্টেম আর কল সেন্টার টিম এই জায়গাটাই সামলায়। নতুন অর্ডারের কনফার্ম কল আর পুরনো কাস্টমারের ফোন একটা লিস্টে আসে। একজন কোনো কাস্টমারকে ধরলে আরেকজন একই সময়ে তাঁকে ফোন দিতে পারেন না, আর কাস্টমার "পরে ফোন দিয়েন" বললে সেই সময়টা যিনি ফোন দিয়েছিলেন তাঁর কাজের লিস্টে উঠে যায়। কে কী দেখতে আর করতে পারবেন, সেটা টিম রোল দিয়ে ঠিক করা যায়। অর্ডার, কুরিয়ার আর টিমের বাকি কাজগুলো কীভাবে চলে, সেটা WinningSeller-এর সব ফিচারের পেজে দেখে নিতে পারেন।
সাধারণ প্রশ্ন
কাস্টমারের সাথে কথা বলার সবচেয়ে জরুরি নিয়ম কী?
প্রশ্নের সোজা উত্তর আগে দিন, তারপর একটা প্রশ্ন করে কথাটা সামনে নিন। দাম জানতে চাইলে দাম বলুন, পার্সেল কোথায় জানতে চাইলে কোথায় আছে বলুন। ঘুরিয়ে উত্তর দিলে বা চুপ থাকলে কাস্টমার ধরে নেন কিছু লুকানো হচ্ছে, আর রাগটা সেখান থেকেই শুরু হয়।
কাস্টমারকে ভাই-আপা বলব, নাকি স্যার-ম্যাডাম?
ফেসবুকে কেনাকাটায় বেশিরভাগ কাস্টমার ভাই বা আপা শুনতেই অভ্যস্ত, আর এটা আপন শোনায়। নাম বা প্রোফাইল দেখে পুরুষ না মহিলা বুঝতে না পারলে আন্দাজ করবেন না, সম্বোধন ছাড়াই "জি" দিয়ে উত্তর শুরু করুন। ভুল সম্বোধন অনেককে বিরক্ত করে, সম্বোধন না থাকলে কেউ কিছু মনে করেন না।
ইনবক্সে কত তাড়াতাড়ি রিপ্লাই দেওয়া উচিত?
যত তাড়াতাড়ি পারেন, কারণ যিনি দাম জানতে চেয়েছেন তিনি প্রায়ই আরও দুই-তিনটা পেজে একই প্রশ্ন করেছেন। অ্যাড চলার সময়টায় অন্তত একজন মানুষ ইনবক্সের সামনে রাখুন। রাতে বা বন্ধের দিনে দেরি হলে পরদিন সকালে প্রথম কাজ হিসেবে উত্তর দিন, আর দেরির জন্য এক লাইনে দুঃখিত বলুন।
রাগী কাস্টমারকে কীভাবে শান্ত করবেন?
আগে পুরো কথা শুনুন, মাঝখানে কোনো ব্যাখ্যা দেবেন না। তারপর এক লাইনে মেনে নিন কী ভুল হয়েছে, আর কবে কী করবেন সেটা দিন-তারিখসহ বলুন। "কিন্তু আমাদের তো দোষ নেই" দিয়ে শুরু করলে রাগ আরও বাড়ে।
কাস্টমার দাম কমাতে বললে কি কমিয়ে দেব?
সাথে সাথে কমাবেন না। আগে দামটা কেন এমন, সেটা সত্যি কথায় বলুন, আর দরকার হলে ছোট সাইজ বা ফ্রি ডেলিভারির কথা বলুন। প্রথম কথাতেই দাম কমালে কাস্টমার শেখেন যে আপনার দাম দর-কষাকষির জিনিস, আর পরের কাস্টমাররাও একই কথা বলেন।
ভুল প্রোডাক্ট গেলে চেঞ্জ করার ডেলিভারি চার্জ কে দেবে?
ভুলটা আপনার দিক থেকে হলে দুই দিকের চার্জই আপনার দেওয়া উচিত। কাস্টমারের কাছে টাকা চাইলে তিনি ভুলের শাস্তি পাচ্ছেন বলে মনে করেন, আর পরে আর কেনেন না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১-এ বলা আছে, অভিযোগ পাওয়ার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সমাধানের ব্যবস্থা করে কাস্টমারকে জানাতে হবে।
আরও পড়ুন
হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল না গ্রুপ? পুরনো কাস্টমারকে নতুন মালের খবর দিন
নতুন কালেকশনের খবর পুরনো কাস্টমারকে দিতে চান, কিন্তু চ্যানেল খুলবেন, গ্রুপ, না স্ট্যাটাস? কে কার নম্বর দেখে, কে উত্তর দিতে পারে, চ্যানেল খোলার ধাপ, কী পোস্ট দেবেন, গ্রুপের নিয়ম আর ঝুঁকি, আর এক মাসে কোনটায় কত সময় যায়, হিসাবসহ।
শার্ট, প্যান্ট আর টি-শার্টের সাইজ চার্ট বানাবেন যেভাবে, ফেরত কমবে
সাপ্লায়ারের ট্যাগে M লেখা, অথচ কাস্টমার বলেন টাইট। টি-শার্ট, শার্ট আর প্যান্ট টেবিলে বিছিয়ে ফিতা দিয়ে মাপার নিয়ম, ইঞ্চিতে নিজের সাইজ চার্ট বানানো, কাস্টমারকে নিজের শার্ট মেপে সাইজ বাছতে শেখানো, আর একটা ভুল সাইজে কত টাকা যায়, হিসাবসহ।
প্রোডাক্ট ক্যাটালগ ও প্রাইস লিস্ট বানানোর নিয়ম, পাইকার আর অফিসের জন্য
পাইকার, রিসেলার বা অফিসের লোক বলছেন "ক্যাটালগ আর রেট দেন"? প্রতিটা প্রোডাক্টে কী লিখবেন, খুচরা আর পাইকারি দাম কেন আলাদা ফাইলে, পরিমাণ ধরে দামের ধাপ টাকায়, PDF না লিংক, আর দাম বদলালে পুরনো কপি থামাবেন কীভাবে।


