ক্যাশ অন ডেলিভারি মানে কি? সেলারের দিক থেকে COD যেভাবে চলে
ক্যাশ অন ডেলিভারিতে কাস্টমারের টাকা কার হাত ঘুরে আপনার bKash বা ব্যাংকে আসে, কুরিয়ার কত কাটে, কাস্টমার পার্সেল না নিলে কী হয়, আর কখন অগ্রিম চাইবেন, সেলারের দিক থেকে টাকার হিসাবসহ।

এই লেখায় যা আছে
ক্যাশ অন ডেলিভারি মানে কি, এক কথায় বললে, কাস্টমার অর্ডার দেওয়ার সময় কোনো টাকা দেন না, পার্সেল হাতে পেয়ে ডেলিভারিম্যানের হাতে টাকা দেন। ইংরেজিতে এর নাম Cash on Delivery, ছোট করে সবাই বলে COD। সেলারের দিক থেকে ব্যাপারটা একটু লম্বা। কাস্টমারের টাকা আগে যায় কুরিয়ারের কাছে, কুরিয়ার সেখান থেকে ডেলিভারি চার্জ আর ছোট একটা COD চার্জ কেটে রাখে, তারপর বাকি টাকা কয়েক দিনের মধ্যে আপনার bKash বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠায়। আর কাস্টমার পার্সেল না নিলে টাকা তো আসেই না, উল্টো ডেলিভারি চার্জটা সাধারণত আপনার ঘাড়ে পড়ে।
নতুন সেলাররা প্রায়ই ভাবেন, অর্ডার এলো মানেই বিক্রি হয়ে গেল। COD-তে কথাটা ঠিক না। নিচে দেখাচ্ছি টাকাটা কার কার হাত ঘুরে আপনার কাছে আসে, পথে কে কত রাখে, আর কোন অর্ডারে পুরো COD না দিয়ে অগ্রিম চাওয়াই বুদ্ধির কাজ।
ক্যাশ অন ডেলিভারি মানে কি?
একটা উদাহরণ দিয়ে বুঝি। ধরুন রংপুরের একজন কাস্টমার আপনার পেজ থেকে ১,২৫০ টাকার একটা পাঞ্জাবি অর্ডার দিলেন, সাথে ডেলিভারি চার্জ ১৩০ টাকা। ক্যাশ অন ডেলিভারিতে তিনি এখন এক টাকাও পাঠাবেন না। দুই-তিন দিন পর কুরিয়ারের ডেলিভারিম্যান তাঁর বাসায় গিয়ে পার্সেল দেবেন, আর তিনি তখন ১,৩৮০ টাকা হাতে হাতে দিয়ে দেবেন। কাস্টমারের দিক থেকে কাজ এখানেই শেষ হয়ে যায়।
আপনার দিকের কাজটা কিন্তু শুরু হয়েছে আরও আগে। পাঞ্জাবিটা আপনি নিজের টাকায় কিনেছেন, প্যাকেট করেছেন, তারপর কুরিয়ারের হাতে দিয়েছেন। কাস্টমার যতক্ষণ টাকা না দিচ্ছেন, ততক্ষণ পুরো ঝুঁকিটা আপনার। এজন্যই অনেকে COD-কে বলেন "আগে মাল, পরে টাকা"।
পেমেন্ট নেওয়ার আসলে তিনটা উপায় আছে, আর COD তার একটা। প্রথমটা পুরো COD, যেখানে প্রোডাক্টের দাম আর ডেলিভারি চার্জ দুটোই কাস্টমার দরজায় দেন। দ্বিতীয়টা আংশিক অগ্রিম, যেখানে কাস্টমার শুধু ডেলিভারি চার্জটা আগে bKash-এ পাঠান আর বাকি টাকা পার্সেল পেয়ে দেন। তৃতীয়টা পুরো অগ্রিম, যেখানে অর্ডারের সময়ই সব টাকা চলে আসে। বাংলাদেশের ফেসবুক ব্যবসায় বেশিরভাগ অর্ডার প্রথম উপায়ে চলে, আর ঝুঁকির অর্ডারে অনেক সেলার দ্বিতীয়টা চান।
বাস কাউন্টার বা পুরনো কুরিয়ার অফিসে অনেকে এই ব্যবস্থাকে "কন্ডিশনে পাঠানো" বলেন। নামটা আলাদা হলেও কাজ একই রকম। যিনি মাল নেবেন, তিনি টাকা দিলে তবেই মাল ছাড়া হয়, আর সেই টাকা পরে যিনি পাঠিয়েছেন তাঁর কাছে ফেরত যায়।
COD-তে টাকা কার হাত ঘুরে আপনার কাছে আসে?
কাস্টমারের দেওয়া টাকা সরাসরি আপনার পকেটে আসে না। মাঝখানে কয়েকটা ধাপ আছে, আর প্রতিটা ধাপে একটু করে সময় যায়। সাধারণত টাকার রাস্তাটা এরকম।
- কাস্টমার অর্ডার দিলেন, আপনি ফোনে কনফার্ম করলেন।
- কুরিয়ারের প্যানেলে পার্সেল এন্ট্রি দিলেন, আর COD-র ঘরে লিখলেন ডেলিভারিম্যান কাস্টমারের কাছ থেকে কত টাকা তুলবেন।
- কুরিয়ার আপনার কাছ থেকে পার্সেল পিকআপ করে নিজেদের হাবে নিল, তারপর কাস্টমারের এলাকার হাবে পাঠাল।
- ডেলিভারিম্যান পার্সেল দিলেন, কাস্টমার তাঁর হাতে টাকা দিলেন।
- ডেলিভারিম্যান দিনের শেষে তোলা টাকা হাবে জমা দিলেন, আর কুরিয়ার নিজেদের সিস্টেমে প্রতিটা পার্সেলের টাকা মেলাল।
- মেলানো হলে কুরিয়ার নিজের চার্জ কেটে বাকি টাকা আপনার প্যানেলের ব্যালান্সে দেখাল।
- আপনি টাকাটা নিলেন bKash, Nagad, Rocket বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে।
এই রাস্তায় দুটো কথা নতুনরা প্রায়ই মিস করেন। প্রথম কথা, Steadfast-এর টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনসে লেখা আছে, পেমেন্টের রিকোয়েস্ট মার্চেন্টকেই প্যানেল থেকে দিতে হয়। মানে আপনি রিকোয়েস্ট না দিলে টাকা প্যানেলেই পড়ে থাকবে। দ্বিতীয় কথা, কুরিয়ারের ওয়েবসাইটে "পরের দিন পেমেন্ট" লেখা থাকলে সেটা ডেলিভারির পরের দিন বোঝায়, পার্সেল কুরিয়ারে দেওয়ার পরের দিন না। ঢাকা থেকে দিনাজপুরের পার্সেলে ডেলিভারিতেই দুই-তিন দিন যায়, আর Pathao-র কুরিয়ার পেজে লেখা আছে, ঢাকার বাইরে শুক্রবার ওদের কাজ বন্ধ থাকে।

এই কয়েক দিনের ফাঁকটাই COD ব্যবসার সবচেয়ে বড় চাপ। স্টক আর অ্যাডের টাকা আজই বেরিয়ে যায়, অথচ বিক্রির টাকা আসে পরের সপ্তাহে। কোন কুরিয়ারে কত দিনে টাকা আসে, এক মাসে কত টাকা আটকে থাকে আর হাতে কত রাখবেন, সেটা পুরো হিসাব করে দেখিয়েছি ক্যাশ অন ডেলিভারির ক্যাশ ফ্লো নিয়ে লেখায়।
কুরিয়ার COD-র জন্য কত টাকা কাটে?
কাস্টমারের দেওয়া টাকা থেকে কুরিয়ার দুটো জিনিস কেটে রাখে। একটা হলো ডেলিভারি চার্জ, যেটা পার্সেলের ওজন আর এলাকা দেখে ঠিক হয়। আরেকটা হলো COD চার্জ, যেটা কুরিয়ার নেয় টাকা তোলা আর সেই টাকা আপনার কাছে পৌঁছে দেওয়ার ঝুঁকির জন্য। Steadfast এর নাম দিয়েছে "Cash Handling & Risk Management" চার্জ।
বড় কুরিয়ারগুলোর COD চার্জ সাধারণত ১%-এর আশেপাশে থাকে। অক্টোবর ২০২৬-এ Steadfast-এর টার্মসে লেখা আছে, তোলা টাকা থেকে ডেলিভারি চার্জ বাদ দিয়ে বাকিটার ওপর ১% কাটা হয়। RedX-এর হোমপেজে লেখা, ঢাকার ভেতরে ০% আর ঢাকার বাইরে ১%। Pathao-র পেজে রেট টেবিলে ১% লেখা থাকলেও একই পেজের FAQ-তে ঢাকা মেট্রোর ভেতরে ০.৫% লেখা। চুক্তি করা মার্চেন্টের রেট আলাদাও হয়, তাই অ্যাকাউন্ট খোলার পর নিজের প্যানেলে যে রেট দেখায়, সেটাই আপনার আসল রেট। তিনটা কুরিয়ারের ডেলিভারি চার্জ, COD চার্জ আর ফেরতের চার্জ পাশাপাশি রেখে তুলনা করেছি কোন কুরিয়ার ভালো, সেই লেখায়।
এবার ওপরের পাঞ্জাবির অর্ডারটা ধরে Steadfast-এর নিয়মে হিসাব করি। কাস্টমার দিলেন ১,৩৮০ টাকা। কুরিয়ার প্রথমে ১৩০ টাকা ডেলিভারি চার্জ রাখল, থাকল ১,২৫০ টাকা। তার ১% মানে সাড়ে ১২ টাকা, গোল করে ধরুন ১৩ টাকা, গেল COD চার্জে। আপনার প্যানেলে জমা হলো ১,২৩৭ টাকা। Steadfast লিখেছে ওদের সব চার্জ ভ্যাট আর ট্যাক্স ছাড়া, তাই আসলে কাটা টাকা একটু বেশিও হতে পারে। আর ১৩০ টাকা ডেলিভারি চার্জটা এখানে উদাহরণের জন্য ধরা, আপনার এলাকা আর পার্সেলের ওজনে এটা কম-বেশি হবে।

কুরিয়ারের প্যানেলে COD-র টাকা কত লিখবেন?
এই ছোট ঘরটা নিয়ে অনেক ভুল হয়, আর প্রতিটা ভুলে টাকা যায়। পার্সেল এন্ট্রির সময় COD-র ঘরে যা লেখেন, ডেলিভারিম্যান কাস্টমারের কাছ থেকে ঠিক সেটাই চাইবেন। এর কম লিখলে বাকিটা আপনার লোকসান, আর বেশি লিখলে কাস্টমার দরজায় দাঁড়িয়ে রেগে যাবেন।
নিয়মটা আসলে সহজ। COD-র ঘরে লিখবেন কাস্টমারের কাছ থেকে দরজায় যত টাকা নিতে হবে, ঠিক তত। পুরো COD-র অর্ডারে সেটা প্রোডাক্টের দাম আর ডেলিভারি চার্জ যোগ করে, মানে ওপরের উদাহরণে ১,৩৮০ টাকা। কাস্টমার যদি ১৩০ টাকা ডেলিভারি চার্জ আগে bKash-এ পাঠিয়ে থাকেন, তাহলে লিখবেন শুধু ১,২৫০ টাকা। আর পুরো টাকা অগ্রিম এলে লিখবেন ০।
শেষেরটা নিয়ে Steadfast-এর টার্মসে একটা কাজের কথা আছে। মার্চেন্টকে আগেই পুরো টাকা দেওয়া পার্সেলে COD-র ঘরে ০ থাকলে সেটা Non-COD পার্সেল হিসেবে ধরা হয়। তখন কাস্টমারের ফোনে একটা OTP যায়, আর কাস্টমার সেই OTP ডেলিভারিম্যানকে বললে তবেই পার্সেলটা ডেলিভারি হয়েছে বলে ধরা হয়। এতে অগ্রিম দেওয়া কাস্টমারের পার্সেল ভুল মানুষের হাতে যাওয়ার ভয় কমে।
সবচেয়ে বেশি যে ভুলটা হয়, সেটা হলো ডেলিভারি চার্জ যোগ করতে ভুলে যাওয়া। কাস্টমারকে বললেন "সব মিলিয়ে ১,৩৮০ টাকা", কিন্তু প্যানেলে লিখলেন ১,২৫০। ডেলিভারিম্যান ১,২৫০ টাকাই তুলবেন, আর কুরিয়ার সেখান থেকেই নিজের ১৩০ টাকা কেটে রাখবে। মানে ডেলিভারি চার্জটা আপনি নিজের পকেট থেকে দিলেন। দিনে দুই-তিনটা এমন ভুল হলে মাসে কয়েক হাজার টাকা চলে যায়, আর কেউ টেরও পায় না।
উল্টো ভুলটাও হয়। কনফার্মের ফোনে কাস্টমারকে ৫০ টাকা ছাড় দিলেন, কিন্তু প্যানেলে পুরনো দামটাই রয়ে গেল। দরজায় বেশি টাকা চাইলে কাস্টমার ভাবেন তাঁকে ঠকানো হচ্ছে, আর অনেকে তখন পার্সেলই ফেরত দেন। Steadfast-এর টার্মসে লেখা আছে, মার্চেন্টের অনুমতি নিয়ে দরজায় টাকার অঙ্ক চেঞ্জ করা যায়। তাই এমন হলে রাইডার ফোন দিলে সাথে সাথে ধরুন আর ঠিক অঙ্কটা বলে দিন। একাধিক প্রোডাক্টের পার্সেলে কাস্টমার যদি একটা রাখেন আর বাকিটা ফেরত দেন, Steadfast সেটা আপনার অনুমতি সাপেক্ষে "Partially Delivered" হিসেবে দেখায়।
কাস্টমার পার্সেল না নিলে কী হয়?
COD-র সবচেয়ে বড় ঝুঁকি এটাই। কাস্টমার দরজায় এসে বললেন "এখন নিব না", বা ফোনই ধরলেন না। তখন কুরিয়ার আপনার সাথে কথা বলে পার্সেলটা বাতিল করে, আর আপনার অনুমতি পেলে সেটা আপনার কাছে ফেরত পাঠায়। Steadfast-এর টার্মসে ঠিক এভাবেই লেখা আছে। কাস্টমার নিতে না চাইলে বা তাঁকে ফোনে না পেলে মার্চেন্টের সাথে কথা বলে বাতিলের রিকোয়েস্ট দেওয়া হয়, আর মার্চেন্ট সেটা অ্যাপ্রুভ করলে পার্সেল ফেরত যায়।
এবার টাকার দিকটা দেখুন। কুরিয়ার পার্সেলটা নিয়ে গেছে, আবার ফিরিয়েও এনেছে, তাই চার্জ নেবেই। Steadfast-এর টার্মসে লেখা, ডেলিভারি হোক বা বাতিল, ডেলিভারি চার্জ মার্চেন্টকে দিতে হবে, তবে ফেরতের জন্য আলাদা কোনো চার্জ নেই। Pathao-র কুরিয়ার পেজে লেখা, ঢাকার বাইরে থেকে ফেরত আসা পার্সেলে ডেলিভারি চার্জের সাথে তার ৫০% রিটার্ন চার্জ যোগ হয়, তবে ঢাকা মেট্রোর ভেতরের অর্ডারে রিটার্ন চার্জ নেই। মানে ১৩০ টাকা ডেলিভারি চার্জের পার্সেল Steadfast-এ ফেরত এলে যায় ১৩০ টাকা, আর Pathao-তে যায় ১৯৫ টাকা।
এই টাকা আপনাকে আলাদা করে দিতে হয় না। কুরিয়ার আপনার ডেলিভারি হওয়া অন্য পার্সেলের তোলা টাকা থেকে এটা কেটে রাখে। ধরুন আজ আপনার পাঁচটা পার্সেল ডেলিভারি হলো আর একটা ফেরত এলো। প্যানেলে তখন পাঁচটার টাকা থেকে ফেরত পার্সেলের চার্জটাও বাদ গিয়ে ব্যালান্স দেখাবে। এজন্যই অনেক সময় প্যানেলের ব্যালান্স দেখে মনে হয় টাকা কম এসেছে, অথচ আসলে ফেরতের চার্জটা ওখান থেকেই কাটা হয়েছে।
কুরিয়ারের চার্জের সাথে আরও যোগ হয় প্যাকেটের খরচ আর যে অ্যাড থেকে অর্ডারটা এসেছিল, তার টাকা। ধরুন একটা ডেলিভারি হওয়া অর্ডারে আপনার লাভ থাকে ৩০০ টাকা, আর একটা ফেরতে সব মিলিয়ে ৩০০ টাকার মতোই যায়। তাহলে দশটা অর্ডারে দুইটা ফেরত এলে আপনি আসলে আটটা না, ছয়টা অর্ডারের লাভ পেলেন। আর ফেরত আসা মাল কয়েক দিন রাস্তায় থাকে, সেই সময় ওটা আবার বিক্রিও করা যায় না। একটা ফেরতে কোন খাতে কত যায় আর ফেরত কমানোর কাজগুলো ধাপে ধাপে লেখা আছে ফেক অর্ডার আর রিটার্ন কমানোর ১২টা উপায়ে।
বাংলাদেশে মানুষ COD কেন বেশি চায়?
কারণটা মূলত ভরসা। অচেনা একটা ফেসবুক পেজকে আগে টাকা পাঠাতে মানুষ ভয় পান। ছবির সাথে জিনিস মিলবে কি না, পেজটা টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যাবে কি না, এই চিন্তা প্রায় সবার মাথায় থাকে। হাতে পেয়ে টাকা দিলে এই ভয়টা থাকে না, তাই কাস্টমার সহজে অর্ডার দেন।
সংখ্যাটাও ছোট না। যুক্তরাষ্ট্রের International Trade Administration বাংলাদেশ নিয়ে যে Country Commercial Guide রাখে, তার ই-কমার্স অংশে (১৯ মার্চ ২০২৬-এ পাবলিশ করা) লেখা আছে, বাংলাদেশের ৯০ শতাংশের বেশি ই-কমার্স ইউজার ক্যাশ অন ডেলিভারি পছন্দ করেন। একই পেজে বলা আছে, দেশের বেশিরভাগ মানুষ এখনো নগদ টাকাতেই লেনদেন করেন। সংখ্যাটা ওদের লেখা, আমাদের মাপা না। তবে যেকোনো ফেসবুক সেলারকে জিজ্ঞেস করলে একই কথাই শুনবেন।
আরেকটা কারণ পুরনো ভয়। ২০২১ সালে কয়েকটা বড় অনলাইন কোম্পানিতে মানুষের অগ্রিম দেওয়া টাকা আটকে গিয়েছিল, আর সেই খবর প্রায় সবাই জানেন। সেই বছরের জুলাইয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় "ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১" জারি করে, যেখানে অগ্রিম টাকা নেওয়ার নিয়ম কড়া করা হয়। কাস্টমারের মনে সেই ভয় এখনো রয়ে গেছে।
তাই সেলার হিসেবে বাস্তব কথাটা হলো, COD এখনই কোথাও যাচ্ছে না। "অগ্রিম ছাড়া অর্ডার নিব না" বললে অনেক ভালো কাস্টমার অন্য পেজে চলে যাবেন। বুদ্ধির কাজ হলো COD রেখে তার ঝুঁকিটা সামলানো, আর শুধু যেখানে দরকার সেখানে অগ্রিম চাওয়া।
সেলারের জন্য COD-র সুবিধা আর অসুবিধা কী?
সুবিধাটা প্রথমেই বলি। COD দিলে অর্ডার বেশি আসে, কারণ কাস্টমারকে আপনাকে আগে থেকে বিশ্বাস করতে হয় না। নতুন পেজ, যার এখনো রিভিউ কম, তার জন্য এটা অনেক বড় সাহায্য। আর টাকা তোলার কাজটা কুরিয়ার করে দেয়, আপনাকে প্রতিটা কাস্টমারের কাছ থেকে আলাদা করে bKash মেলাতে হয় না।
অসুবিধাগুলোর প্রায় সবই টাকা আর সময়ের। ফেরত এলে পুরো ক্ষতিটা আপনার, আর ডেলিভারি হলেও টাকা হাতে আসে কয়েক দিন পরে। প্রতিটা পার্সেলে COD চার্জও কাটে। এর ওপর আছে ফেক অর্ডার, যেখানে কেউ মজা করে বা অন্যের নম্বরে অর্ডার দিয়ে রাখেন। নিচের টেবিলে পুরো COD আর পুরো অগ্রিম পাশাপাশি দেখুন।
| বিষয় | পুরো ক্যাশ অন ডেলিভারি | পুরো অগ্রিম |
|---|---|---|
| অর্ডার কত আসে | বেশি, কাস্টমার সহজে রাজি হন | কম, অনেকে অগ্রিম দিতে চান না |
| ফেরতের ঝুঁকি | পুরোটা সেলারের | প্রায় নেই |
| টাকা কবে হাতে | ডেলিভারির পরে, কুরিয়ার ঘুরে | অর্ডারের সময়ই |
| বাড়তি চার্জ | কুরিয়ারের COD চার্জ | bKash বা পেমেন্ট গেটওয়ের চার্জ |
টেবিল দেখে মনে হতে পারে অগ্রিমই ভালো। কিন্তু অর্ডারই যদি অর্ধেক হয়ে যায়, তাহলে ফেরত কমার লাভটা তাতেই খেয়ে যায়। এজন্য বেশিরভাগ সেলার মাঝের রাস্তাটা নেন। সাধারণ অর্ডারে তাঁরা পুরো COD রাখেন, আর ঝুঁকির অর্ডারে শুধু ডেলিভারি চার্জটা অগ্রিম চান।
কখন পুরো COD না দিয়ে অগ্রিম চাইবেন?
সব অর্ডারে এক নিয়ম চালাবেন না। বেশিরভাগ অর্ডার COD-তেই ঠিকঠাক যায়, ঝামেলা করে অল্প কয়েকটা। কাজ হলো সেই অল্প কয়েকটাকে আগে চিনে ফেলা। নিচের ক্ষেত্রগুলোতে অন্তত ডেলিভারি চার্জটা অগ্রিম চাওয়ার কথা ভাবুন।
- কাস্টমারের নম্বরের রেকর্ড খারাপ হলে। এই নম্বর থেকে আগে বিভিন্ন দোকানের পার্সেল বারবার ফেরত গেছে, এমন দেখলে সাবধান হোন। নম্বর দিয়ে কুরিয়ারের আগের রেকর্ড দেখতে আমাদের ফ্রি ফ্রড চেকার কাজে লাগাতে পারেন।
- প্রোডাক্টের দাম বেশি হলে। ধরুন দাম ৩,০০০ টাকার বেশি, আর ফেরত এলে রাস্তায় জিনিসটা নষ্ট বা পুরনো হয়ে যাওয়ার ভয় আছে। এমন অর্ডারে একটা ফেরতেই ক্ষতি অনেক বড় হয়।
- কাস্টমারের মাপে বানানো বা কাটা জিনিস হলে। এটা ফেরত এলে আর কারও কাছে বিক্রি করা যায় না। তবে এমন জিনিসে কত টাকা অগ্রিম নেওয়া যায়, তার একটা সরকারি সীমা আছে, সেটা নিচের বক্সে দেখে নিন।
অগ্রিম চাওয়ার সময় কাস্টমারকে দোষ দেবেন না। "আপনার রেকর্ড খারাপ" বললে কাস্টমার রেগে যান, কারণ তিনি হয়তো জানেনই না এমন রেকর্ড আছে। নরম করে বলুন যে তাঁর এলাকায় আপনারা ডেলিভারি চার্জটা আগে নেন, বাকিটা পার্সেল হাতে পেয়ে দিলেই হবে। যিনি সত্যিই প্রোডাক্টটা নিতে চান, তিনি সাধারণত টাকাটা পাঠিয়ে দেন। আর যিনি পাঠান না, তাঁর পার্সেল পাঠালে সেটা ফেরত আসার সম্ভাবনাই বেশি ছিল। কনফার্ম কলে কোন লক্ষণ দেখলে থামবেন আর অগ্রিমের মেসেজটা ঠিক কীভাবে লিখবেন, সেটা ওপরে লিংক দেওয়া ফেক অর্ডারের লেখায় তৃতীয় উপায়ে আছে।
পুরো টাকা অগ্রিম নেওয়ার আগে একটা সরকারি নিয়ম জেনে রাখা দরকার।
এই আলোচনার একটা সীমাও বলে রাখি। আপনি যদি শুধু ঢাকার ভেতরে কম দামের জিনিস বিক্রি করেন আর ফেরত খুব কম আসে, তাহলে অগ্রিম নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই। তখন পুরো COD-ই আপনার জন্য সবচেয়ে বেশি অর্ডার আনবে। অগ্রিমের হিসাবটা জরুরি হয় তখন, যখন ঢাকার বাইরে বিক্রি বাড়ে আর মাস শেষে ফেরতের চার্জ চোখে লাগতে শুরু করে।
COD-র এই কাজগুলো খাতায় আর কুরিয়ারের প্যানেলে আলাদা আলাদা করলে ভুল হওয়ার সুযোগ বেশি থাকে। WinningSeller-এ Steadfast, Pathao, RedX সহ ৬টা কুরিয়ারে এক ক্লিকে পার্সেল এন্ট্রি যায়, আর পার্সেলের স্ট্যাটাস নিজে থেকেই আপডেট হয়। নতুন অর্ডার এলে নম্বর দিয়ে ফ্রড চেক করা যায়। ঝুঁকির অর্ডারে bKash বা SSLCommerz দিয়ে শুধু ডেলিভারি চার্জ বা পুরো টাকা অগ্রিম নেওয়ার অপশনও আছে। নিজের কয়েকটা অর্ডার দিয়ে একবার চালিয়ে দেখতে পারেন (প্রথম মাস মাত্র ৯৯ টাকা, তারপর রেগুলার দাম)।
সাধারণ প্রশ্ন
ক্যাশ অন ডেলিভারি মানে কি?
ক্যাশ অন ডেলিভারি মানে কাস্টমার অর্ডারের সময় কোনো টাকা দেন না, পার্সেল হাতে পেয়ে ডেলিভারিম্যানকে টাকা দেন। ছোট করে একে COD বলে। সেলারের দিক থেকে এর মানে হলো, টাকাটা আগে কুরিয়ার তোলে, তারপর নিজের চার্জ কেটে বাকিটা আপনাকে পাঠায়।
COD-র টাকা সেলার কবে পায়?
কুরিয়ার আর এলাকা ভেদে সময় আলাদা হয়। Steadfast আর RedX নিজেদের ওয়েবসাইটে ডেলিভারির পরের দিন পেমেন্টের কথা লিখেছে, তবে Steadfast-এ পেমেন্টের রিকোয়েস্টটা আপনাকেই প্যানেল থেকে দিতে হয়। ঢাকার বাইরের পার্সেলে ডেলিভারিতেই কয়েক দিন যায়, তাই অর্ডার থেকে টাকা হাতে আসতে এক সপ্তাহ বা তার বেশিও লাগতে পারে।
কুরিয়ারের COD চার্জ কত?
অক্টোবর ২০২৬-এ Steadfast-এর টার্মসে লেখা আছে, ডেলিভারি চার্জ বাদ দিয়ে বাকি টাকার ওপর ১%। RedX-এর হোমপেজে ঢাকার ভেতরে ০% আর বাইরে ১% লেখা। Pathao-র রেট টেবিলে ১% লেখা, আর একই পেজের FAQ-তে ঢাকা মেট্রোর ভেতরে ০.৫%। চুক্তি করা মার্চেন্টের রেট আলাদা হতে পারে, তাই নিজের প্যানেলে দেখে নিন।
কাস্টমার পার্সেল না নিলে ডেলিভারি চার্জ কে দেয়?
সাধারণত সেলার দেন। Steadfast-এর টার্মসে লেখা, পার্সেল ডেলিভারি হোক বা বাতিল, ডেলিভারি চার্জ মার্চেন্টকে দিতে হয়। Pathao-তে ঢাকার বাইরে থেকে ফেরত এলে ডেলিভারি চার্জের সাথে তার ৫০% রিটার্ন চার্জও যোগ হয়। এই টাকা কুরিয়ার আপনার অন্য পার্সেলের তোলা টাকা থেকে কেটে রাখে।
ক্যাশ অন ডেলিভারি আর অগ্রিম পেমেন্টের পার্থক্য কী?
ক্যাশ অন ডেলিভারিতে কাস্টমার পার্সেল পেয়ে টাকা দেন, আর অগ্রিমে অর্ডারের সময়ই bKash, কার্ড বা অন্য কোনোভাবে টাকা পাঠান। COD-তে অর্ডার বেশি আসে, কিন্তু ফেরতের ঝুঁকি আর কুরিয়ারের COD চার্জ সেলারের ঘাড়ে পড়ে। অগ্রিমে ফেরত প্রায় থাকে না, তবে অনেক কাস্টমার অগ্রিম দিতে রাজি হন না।
টাকা দেওয়ার আগে কাস্টমার কি পার্সেল খুলে দেখতে পারেন?
এটা কুরিয়ারের নিয়ম আর আপনার নিজের নিয়মের ওপর নির্ভর করে, সব জায়গায় এক রকম না। আপনি কী চান, সেটা অর্ডার কনফার্মের ফোনেই কাস্টমারকে বলে দিন আর পার্সেলের নোটে লিখে দিন। কুরিয়ারে মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলার সময় ওদের নিয়মটাও একবার জিজ্ঞেস করে নিন।
আরও পড়ুন
হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল না গ্রুপ? পুরনো কাস্টমারকে নতুন মালের খবর দিন
নতুন কালেকশনের খবর পুরনো কাস্টমারকে দিতে চান, কিন্তু চ্যানেল খুলবেন, গ্রুপ, না স্ট্যাটাস? কে কার নম্বর দেখে, কে উত্তর দিতে পারে, চ্যানেল খোলার ধাপ, কী পোস্ট দেবেন, গ্রুপের নিয়ম আর ঝুঁকি, আর এক মাসে কোনটায় কত সময় যায়, হিসাবসহ।
শার্ট, প্যান্ট আর টি-শার্টের সাইজ চার্ট বানাবেন যেভাবে, ফেরত কমবে
সাপ্লায়ারের ট্যাগে M লেখা, অথচ কাস্টমার বলেন টাইট। টি-শার্ট, শার্ট আর প্যান্ট টেবিলে বিছিয়ে ফিতা দিয়ে মাপার নিয়ম, ইঞ্চিতে নিজের সাইজ চার্ট বানানো, কাস্টমারকে নিজের শার্ট মেপে সাইজ বাছতে শেখানো, আর একটা ভুল সাইজে কত টাকা যায়, হিসাবসহ।
প্রোডাক্ট ক্যাটালগ ও প্রাইস লিস্ট বানানোর নিয়ম, পাইকার আর অফিসের জন্য
পাইকার, রিসেলার বা অফিসের লোক বলছেন "ক্যাটালগ আর রেট দেন"? প্রতিটা প্রোডাক্টে কী লিখবেন, খুচরা আর পাইকারি দাম কেন আলাদা ফাইলে, পরিমাণ ধরে দামের ধাপ টাকায়, PDF না লিংক, আর দাম বদলালে পুরনো কপি থামাবেন কীভাবে।


